সেমিফাইনাল আশা শেষ হয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের গুরুত্ব নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এই ম্যাচের গুরুত্ব কী, ম্যাচটা হেরে যাওয়ার পর সবাই বুঝতে পারছে। বাংলাদেশ ১০ দলের বিশ্বকাপে আছে সপ্তম স্থানে। সেটা শ্রীলঙ্কারও নিচে। আজ (শনিবার) দক্ষিণ আফ্রিকা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিলে তো আটে শেষ করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে একটা সুযোগ ছিল বিশ্বকাপের চারটি ম্যাচ জিতে পঞ্চম স্থানে থেকে শেষ করার। সেই সুযোগটি আমরা নষ্ট করেছি।
সেটা হলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সেরা পারফরমেন্সই হতো। কিন্তু এখন আমরা শেষ করছি যেখান থেকে শুরু করেছিল। ২০০৭ সালে নবীন একটা দল নিয়ে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ, পেয়েছিল ৩ জয়। ২০১১ তে দেশের মাটিতেও জিতেছিল ৩ ম্যাচ। গতবার প্রস্তুতি ম্যাচগুলো খারাপ খেলায় প্রত্যাশা কম ছিল, তারপরও জিতেছিল ৩ ম্যাচ। এবার প্রত্যাশাটা ছিল সেমিফাইনাল খেলার। কারণ এই দলের ছয় থেকে সাতজন ক্রিকেটার আছে যারা প্রায় ১০-১২ বছর ধরে একসঙ্গে খেলছে। কিন্তু এই বিশ্বকাপেও বাংলাদেশ ৩টা ম্যাচ জিতল। এত অভিজ্ঞতা নিয়ে খেলার সুযোগ কিন্তু সহজে আর আসবে না পরের আসরগুলোতে। ২০২৩ বিশ্বকাপে এই দলের সিনিয়র যারা আছে, তাদের কেউ কেউ হয়তো খেলবে, কিন্তু তাদের বয়স হয়ে যাবে ৩৫-৩৬। বয়স তো আছেই, ফিটনেস এবং ফর্ম ধরে রাখারও বিষয় আছে। আশা করি তারা ফর্মে থাকবে। কিন্তু নাও থাকতে পারে। তখন কারা দায়িত্ব নেবে দলের। সাকিবের মতো খেলোয়াড় কিন্তু বলে কয়ে তৈরি করা যায় না। এরকম খেলোয়াড় এক-দু’দশকে একজন করে তৈরি হয়ে আসে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ নিজেদের উন্নতিটা বোঝার সেরা সুযোগটাই এবার পেয়েছিল। কিন্তু কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলো। ভবিষ্যতে কারা দায়িত্ব নেবেÑ এটা এখন একটা বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের জন্য ২০২৩ বিশ্বকাপ কেমন হবে, সেটা নিয়ে এখন থেকেই ভাবনা-চিন্তা শুরু করতে হবে। আমাদের দুর্বলতাগুলো বের করা উচিত। বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে তৃতীয়, দ্বিতীয়, প্রথম বিভাগে নজর দিতে হবে। কেবল ক্রিকেটারের দিকে তাকালে হবে না, মাঠ হতে হবে সেই মানের। সেই সঙ্গে নিচু পর্যায় থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত আম্পায়ারিংয়ের মান ভালো করতে হবে। আমাদের ভালো মানের মাঠের খুব অভাব। ১৬ কোটি মানুষের দেশে ভালো মানের লেগস্পিনার উঠে না আসায় অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করে। কিন্তু ঘরোয়া পর্যায়ে যেভাবে ক্রিকেটের চর্চা হয়, সেভাবে কখনোই ভালো লেগ স্পিনার, ভালো পেসার উঠে আসবে না। লেগ স্পিনার, ভালো মানের পেসার তৈরি করতে হলে যে সব ক্ষেত্র প্রস্তুত রাখতে হয়, সেগুলো বাংলাদেশে নেই। এখানে দু’দিন, তিনদিনের খেলার প্রচলন করতে হবে। লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেট নিচের পর্যায় এবং বয়সভিত্তিক পর্যায়ে হয় না বললেই চলে। তাছাড়া ছোট মাঠে লেগ স্পিনার বল করলে তারা ওভারে একটা দু’টো শর্ট পিচ, ফুলটস দিতে পারে। তখন দেখা যায় ১-২ ওভার করানোর পর অধিনায়ক কিংবা কোচ একজন লেগিকে দিয়ে আর বোলিং করাতে চায় না। তাছাড়া যে ধরনের উইকেটে খেলা হয় সেখানে পেসারদের জন্য কিছুই থাকে না। ফলে দেখা যায় একটি দলে একজনের বেশি পেসারের খেলার সুযোগ হয় না। অনুপাতে, ৫-৬ জন স্পিনার খেলে।
এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বাজে বোলিং অ্যাটাক বাংলাদেশের। এতদিন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ছিল। ২-১টা উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি কিছুটা হিসেবি বোলিং করত বলে পেস বোলিংয়ের দুর্বলতা চোখে পড়েনি। নতুন বলে মোটামুটি চলত। মাশরাফী ইংল্যান্ডে ব্যর্থ হওয়ায় দুর্বলতাটা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। মোস্তাফিজুর রহমান পরপর দু’ম্যাচে ৫ উইকেট করে পেয়েছে। সবাই তাকে বাহবা দিয়েছে। কিন্তু ও দু’ম্যাচেই ছিল খরুচে। মোস্তাফিজ এবং সাইফউদ্দিনকে কেবল উইকেট পাওয়ার জন্যই বোলিং করতে দেখলাম, রান কম দেওয়ার প্রতি ওদের নজর নেই। এটা এখন পানির মতো পরিষ্কার যে আমাদের পেস বোলিংটা অন্য যে কারও তুলনায় নিম্নমানের। সেটা নতুন বলে হোক, কিংবা ডেথ ওভারে। নতুন বলে বাংলাদেশের বোলাররা প্রতিপক্ষকে কোনো চ্যালেঞ্জই জানাতে পারেনি। আর ডেথ বলে বেহিসাবি রান দিয়েছে। পেস বোলিংয়ে অনেক গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে ২০২৩ বিশ্বকাপেও বিপদে পড়তে হবে। এর জন্য ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন উইকেট করা উচিত যেখানে পেস বোলারদের জন্য কিছু থাকবে। বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও দেখা যায় একাদশগুলো হয় একজন পেসার নিয়ে। এটা করা হয় উইকেটের চরিত্রের কারণে। সেই সঙ্গে আগেও বলেছি, একটা পেস অ্যাকাডেমি খুব প্রয়োজন।
বিশ্বকাপের আগে বলা হচ্ছিল বাংলাদেশ বড় দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। কিন্তু সেটা হয়নি। উল্টো শ্রীলঙ্কা ঠিকই বড় দলকে হারিয়েছে। ওদের ফিল্ডিং ও বোলিং ভালো হয়েছে বলেই তারা ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল। কালকে (শুক্রবার)বোলিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংও ছিল খুবই নিম্নমানের। কালকের ম্যাচ দেখার পর এখন বাংলাদেশ বাকি ৯ দলের কাউকে বলে কয়ে হারাতে পারবে সেটা এখন আর বলার সুযোগ নেই। ফিল্ডিংটা পুরোপুরি খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও জেদের ওপর নির্ভর করে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেগুলো কম লক্ষ করেছি। বাউন্ডারি ঠেকিয়ে রান বাঁচানোর প্রবণতাও কম ছিল।
ব্যাটিংতো পুরোটাই ছিল সাকিব নির্ভর। ও একাই টেনে গেছে গোটা বিশ্বকাপ। ও ক্লিক না করলে হয়তো ফলাফল আরও খারাপ হতো। মুশফিক কিছু ভালো ব্যাটিং করেছিল, কিন্তু সেটা প্রত্যাশার অনেক নিচে। অন্য দলগুলোর দিকে চোখ রাখলে দেখা যায় প্রায় প্রতিটি দলেই তাদের ওপেনাররা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু আমাদের দু’ওপেনার সেভাবে কিছুই করতে পারেনি। তামিম-সৌম্য প্রায় প্রতিটি ম্যাচে সেট হয়ে উইকেট বিলিয়ে দেওয়ায় ভালো একটা শুরু কখনোই দেখিনি। সাকিব থাকায় হয়তো তাদের ব্যর্থতাগুলো একটু ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। আর ইনজুরি নিয়ে মাহমুদুল্লাহ পুরো বিশ্বকাপটা খেলেছে। যেটা আমি মনে করি না ভালো সিদ্ধান্ত ছিল দলের। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের এবারের বিশ্বকাপে প্রাপ্তি আগেরবারের চেয়ে আমার চোখে কম।