বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমনটা আর কেউ পারেননি। এমনকি ব্যাটিং জিনিয়াস শচীন টেন্ডুলকারও নন। কিন্তু সেই অসাধ্যই সাধন করেছেন আরেক ভারতীয় ব্যাটসম্যান। বিশ্বকাপের এক আসরে পাঁচ-পাঁচটি সেঞ্চুরি করলেন রোহিত শর্মা। লিগ পর্বের আট খেলায় পাঁচ সেঞ্চুরি! কল্পনাকেই যেন হার মানাচ্ছেন ডানহাতি এই আগ্রাসী ব্যাটসম্যান, যার পরিচয় ভারতীয়রা দিয়েছেন ‘হিটম্যান’ হিসেবে। ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’ কলকাতা পুলিশের এই টুইট বার্তা যোগ্য অভিধা রোহিত শর্মার জন্য।
অথচ অনন্য এই রেকর্ডের মালিক হওয়ার পরও যেন তৃষ্ণা মিটছে না রোহিতের। মিটবেই বা কী করে? তিনি যে ধনুভাঙা পণ করে এসেছেন ইংল্যান্ডে। কাপ নিয়ে দেশে ফিরতে পারলে তবেই ব্যক্তিগত সব রেকর্ড-টেকর্ড সার্থক হবে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর সে কথাই বললেন ভারত ওপেনার। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল রেকর্ড কি নাÑ ম্যাচ শেষে জানতে চাইলে না সূচক মাথা নাড়িয়ে রোহিত বলেন, ‘মোটেই না। যদি আমরা শিরোপা জিততে পারি তবেই বলব যে এসবের গুরুত্ব আছে।’ দলের প্রতি কতটা নিবেদিতপ্রাণ হলে এভাবে বলতে পারেন একজন!
অথচ, এই রোহিত শর্মাই আইপিএলে একেবারেই রান পাননি। অধিনায়ক হিসেবে দলকে শিরোপা জেতালেও ব্যাট হাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হন। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বকাপে নামার আগে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছিলেন রোহিত। ভারতীয় দলের সহঅধিনায়কের সেই হতাশাকে দূর করেছেন কে জানেন? আর কেউ নন, ভারতের ২০০৭ (টি-টুয়েন্টি) ও ২০১১ (ওয়ানডে) বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক যুবরাজ সিং। ‘যুবরাজ আমার দাদার মতো, মাঝে মধ্যেই কথা হয় ওর সঙ্গে। বিশ্বকাপের আগে আমি রান পাচ্ছিলাম না। আমরা তখন খেলা নিয়ে কথা বলতাম। যুবি বলেছিল, ঠিক সময়ে আমি রান পাব। এখন বুঝতে পারছি, ও বিশ্বকাপের কথাই বলছিল’Ñ জানান রোহিত। যোগ করেন, ‘যুবরাজ নিজেও ২০১১ বিশ্বকাপের আগে একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। ও ঠিকঠাক খেলতে পারছিল না। নিয়মিত রানও পাচ্ছিল না। কিন্তু, সে সময় মানসিকতা ঠিক রেখেই সাফল্য পায়। আমাকেও একই পরমার্শ দিয়েছে যুবি। আমিও সেটাই মেনে চলছি।’
এতদিন বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরির রেকর্ডটি একার ছিল শচীন টেন্ডুলকারের (ছয়টি)। শনিবার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হেডিলিংতে সেই রেকর্ড ছোঁয়ার পাশাপাশি লঙ্কান কিংবদন্তি কুমার সাঙ্গাকারার এক বিশ্বকাপে চার শতকের রেকর্ডটাকে পেছনে ফেলেছেন রোহিত। ২০১৫-তে একটি সেঞ্চুরির সঙ্গে এবার দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন অঙ্কের ম্যাজিকেল ফিগার ছুঁয়েছেন রোহিত। সব মিলিয়ে ৬৪৭ রান নিয়ে এই আসরের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রানের মালিক তিনি। শনিবারের আগপর্যন্ত এই স্থানটি ছিল সাকিব আল হাসানের দখলে (৬০৬)। শনিবার রোহিতের মতো অস্ট্রেলিয়া ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারও সেঞ্চুরি করে ৬৩৮ রান নিয়ে টপকে গেছেন সাকিবকে।
আঙিনার বিশ্বকাপে ২০১১ সালে সবশেষ শিরোপা জিতেছিল দলটি। গেলবার অস্ট্রেলিয়া সেটা ছিনিয়ে নেয়। এবার সুযোগটা শতভাগ কাজে লাগানোর কথাই বলেছেন ফর্মের তুঙ্গে থাকা এই ওপেনার, ‘এই শিরোপার জন্য আপনাকে অপেক্ষায় থাকতে হয় চার বছর। আমাদের অপেক্ষাটা আট বছরের। এখন আমাদের কাজ একটাই, লর্ডসে ম্যাচটা জিতে নেওয়া। তার আগে আমাদের সেমিফাইনালেও জেতা চাই। এর আগপর্যন্ত আপনি কত রান করলেন কিংবা কতগুলো সেঞ্চুরি হাঁকালেন সেগুলো মূল্যহীন একেবারে। শিরোপাই কেবল দিতে পারে তৃপ্তি।’
শেষ তিন ম্যাচে টানা সেঞ্চুরি করা রোহিতকে শনিবার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেভাবে উদযাপন করতে দেখা যায়নি হয়তো এ কারণেই। ওয়ানডে ক্রিকেটে বড় ইনিংস খেলতে সিদ্ধহস্ত রোহিত। রেকর্ড ২৬৪ রানের ইনিংসটি খেলা রোহিত এ পর্যন্ত তিনবার দুইশোর ওপর ইনিংস উপহার দিয়েছেন। এই বিশ্বকাপে অবশ্য এখনো দেড়শো পেরোনো হয়নি তার। ভারতীয় ওপেনার অবশ্য এসব রেকর্ড নিয়ে একদমই ভাবেন না, ‘আমি যখন খেলি তখন আমার মাথায় রেকর্ড বলতে কিছু থাকে না। চেষ্টা করি যতটা বেশি রান তুলতে পারি দলের জন্য। যেদিন আপনি ছন্দে থাকবেন, সেদিন দেখবেন এমনিতেই সবকিছু হয়ে যাবে।’ যোগ করেন, ‘আমার অতীত থেকে এটা শিখেছি যে, কখনই সেঞ্চুরির কথা ভেবে ব্যাট করতে যেতে হয় না। প্রতিটি দিনই নতুন। আমি প্রতিটি দিনই শুরু করতে চাই নতুনভাবে। ভাবতে চাই, আগে আমি কোনো ওয়ানডেই খেলিনি, কোনো সেঞ্চুরিও করিনি।’ রোহিত কৃতজ্ঞতা জানালেন তার সতীর্থদের কারণ তারা কেউই কোনো রেকর্ড নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করেন না, ‘সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হচ্ছে আমাদের ঘিরে দলে এবং দলের বাইরে যারা আছে, তারা কেউই কোনো ব্যক্তিগত রেকর্ড নিয়ে খুব বেশি আলোচনাই করে না। এমনকি আমার পরিবারের সদস্যরাও এটা নিয়ে কথা খুব একটা বলে না। যা আমাকে সবসময় নতুন করে শুরু করতে সহায়তা করে।’
২০১১-তে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ দলে সুযোগ মেলেনি রোহিতের। সেই আক্ষেপটা এখন আর খুব বেশি পোড়ায় না তাকে, ‘আট বছর কেটে গেছে। ২০১১-তে সুযোগ না পাওয়াটা ছিল হতাশার। কিন্তু সেটা আমি পেরিয়ে এসেছি। আমি খুব ভাগ্যবান যে এখন এই অবস্থানে আছি। তাই অতীতে কী হয়েছে তা নিয়ে একদমই ভাবি না। আমি বর্তমানেই থাকতে চাই। কারণ আমরা এখানে এসেছি একটা মিশন নিয়ে, যেটা এখনো শেষ হয়নি।’
লর্ডসের ব্যালকনিতে শিরোপা উৎসবে মাতাই যে এখন রোহিতদের একমাত্র মিশন। আর সেটা করতে পারলেই ব্যক্তি অর্জনগুলো হবে সার্থক। নয়তো, তার অমিয় ইনিংসগুলো রূপ নেবে আক্ষেপে।