প্রথম বর্ষের ছাত্রকে যেভাবে পিটিয়ে শিবির বানাতে চেয়েছিল ছাত্রলীগ

বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে ছাত্রলীগের অনুষ্ঠান ছিল। সে অনুষ্ঠানে প্রথম বর্ষের কিছু ছাত্র টিউশনি, ক্লাস ও ব্যক্তিগত কাজ থাকায় যোগ দিতে পারেনি। এ কারণে সেদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে প্রথম বর্ষের সব ছাত্রকে গেস্টরুমে ডাকে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

যারা যারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল না, তাদের রাতে রুমে ঘুমাতে নিষেধ করে দেওয়া হয় এবং তাদের রুমমেটদেরও বলে দেওয়া হয় তারা যাতে রুমে ঢুকতে না পারে। 

কিন্তু বড় ভাইদের নিষেধ অমান্য করে তাদের রুমেই ঘুমাতে দেয় সহপাঠীরা।

আর এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শনিবার রাতে হলের ২১২ নম্বর রুমে  প্রথম বর্ষের ২৫ ছাত্রকে লোহার রড, বাঁশ, স্ট্যাম্প দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে আহত করা হয়। 

তাদের একজন সমাজবিজ্ঞানের মনিরুল ইসলাম। ছাত্রলীগের মারধর সহ্য করতে না পেরে তিনি গালি দিয়ে ওঠেন। এপর তার ওপর নেমে আসে নির্মম অত্যাচার। তাকে শিবির প্রমাণের নানা চেষ্টা করে ছাত্রলীগ।

প্রথম বর্ষের কয়েজন শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগের কর্মী, প্রত্যক্ষদর্শী ও মনিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে।  

জানা গেছে শনিবারের মারধরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিতীয় বর্ষের সাইকোলজি বিভাগের রনি, স্বাস্থ্য অর্থনীতির রুবেল, পপুলেশন সায়েন্সের মাহমুদ, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসের সাফওয়ান ও এরাবিকের মাহমুদসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।

প্রথম বর্ষের ছাত্ররা জানান, মারধরকারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনের অনুসারী। এ সময় নির্যাতনের মাত্রা সহ্য করতে না পেরে মনিরুল ইসলাম ছাত্রলীগ নেতাদের গালি দিয়ে ফেলে। এরপর তাকে আলাদা করে আরো কিছুক্ষণ আটকে নির্যাতন করা হয়।

অন্যদিকে, ঠিক এ সময় সাংবাদিকরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে চলে আসায় দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা রড, স্ট্যাম্প নিয়ে দ্রুত সরে যায়। তারা মনির ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেরকে বঙ্গবন্ধু হলের দিকে নিয়ে গিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা আটকে রেখে সাংবাদিকদের সামনে কিছু স্বীকার না করতে বিভিন্ন হুমকি দেয়।

এরপর সাংবাদিকরা ও জিয়া হল প্রাধ্যক্ষ তাদের দুজনকে রাত ২:৩০টার দিকে খুঁজে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা ভয়ে সবকিছু অস্বীকার করে।

এ ব্যাপারে জিয়া হলের প্রথম বর্ষের এক ছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রলীগের নেতারা আমাদের গেস্টরুমে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে। এর মধ্যে রনি, রুবেল, মাহমুদ ও সাফওয়ান নিয়মিত আমাদের গায়ে হাত তোলে। শনিবার তারা আমাদের সবাইকে রড, বাঁশ, স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়েছে।

তিনি বলেন, মনির তাদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গালি দিয়ে ফেলায় তাকে মেরে গুরুতরভাবে আহত করা হয়।

২য় বর্ষের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২১২ নম্বর রুমে যারা বুধবারের প্রোগ্রাম করেনি তাদের ওই রাতে দেখা করতে বলি। কিন্তু মনির দেখা না করে রুমে ঘুমিয়ে যায়। আর দেখা না করার পরও বুধবার রাতে তার বন্ধুরা তাকে রুমে ঘুমাতে দেয়। এ কারণে ২০/২৫ প্রথম বর্ষের ছাত্রকে শনিবার রাতে ২১২ নম্বর রুমে মারা হয়।

মনিরুল ইসলামকে মারধর বিষয়ে তিনি বলেন,  মনির রাগে গালি দেওয়ার পর ২য় বর্ষের কয়েকজন এলোপাতাড়ি মারতে শুরু করে। তারা মনিরকে পা ধরে মাফ চাইতে বলে। মনির মাফ না চাইলে তাকে আবার বিছানায় ফেলে ১০/১২ জন একসঙ্গে মারতে থাকে। তারা তাকে বলে সে যেন স্বীকার করে নেয় সে শিবির করে। কয়েকজন তার মোবাইল নিয়ে মেসেঞ্জার, ফেসবুক চেক করে। কিছু পাওয়া না গেলে একজন তার ফেসবুক ওয়াল থেকে শিবিরের পেজ ‘বাঁশের কেল্লা’য় লাইক দিয়ে রাখে।

তিনি জানান, এরপর তাকে ৩য় বর্ষের রুম ২০৬ এ নিয়ে যাওয়া হয়। তখন বড়ভাইরাও শিবির করে  এটা স্বীকার করে নিতে বলে। স্বীকার করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলেও জানায় ছাত্রলীগ নেতারা। তবে তখন সাংবাদিকরা উপস্থিত হলে তাকে হল থেকে বের করে পাশের বঙ্গবন্ধু হলে নিয়ে যাওয়া হয়। সাংবাদিকদের কিছু না বলতে হুমকি ও প্রলোভন দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু হলের এক ছাত্র বলেন, এ সময় তাকে ২য় বর্ষেরই কয়েকজন হলে সিট দিয়ে দেওয়া, বড় ভাইরা ভালো চোখে দেখবে, আর কোনো সমস্যা হবে না বলে প্রলোভন দিতে থাকে। আর সবকিছু বলে দিলে তার আরো খারাপ হবে বলে হুমকি দেয়। এরপর তারা তাকে হলে জিয়া হলে নিয়ে যাওয়া হয়।

জিয়া হল অফিসে ডাকসুর সমাজসেবাবিষয়ক সম্পাদক আখতার হোসেন বলেন, আমরা সবাই দেখছি এই ছেলে নেতাদের সামনে ভয়ে কথা বলছে না। তাকে আলাদাভাবে ডেকে কথা বলার জন্য হল প্রাধ্যক্ষকে অনুরোধ জানান।

এ বিষয়ে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ছাত্রলীগ সব সময় ছাত্রদের নির্যাতন করেছে। ছাত্রলীগ ডাকসু নির্বাচনের সময় বলেছিল, গেস্টরুম ছাত্র নির্যাতন করা হবে না। কিন্তু তারা তাদের চরিত্র বদলায়নি।

মনিরুল ইসলাম এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি।

জানতে চাইলে জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, একটা ঘটনা যেহেতু হয়েছে। আমরা তার সঙ্গে কথা বলব। তদন্ত কমিটি গঠন করব।