দেশের বিভিন্ন রুটের চলন্ত ট্রেনগুলোর ছাদে মাঝেমধ্যেই ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। যদিও রেলের আইন অনুযায়ী ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কিন্তু এরপরও ট্রেনের ছাদবোঝাই হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৬ মাসে চলন্ত ট্রেনের ছাদে ৮টি ছিনতাইয়ের ঘটনা জাতীয় পত্রিকাগুলোতে প্রকাশ হলেও এ নিয়ে মামলা হয়েছে মাত্র ২টি। এর বাইরে আরও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও গণমাধ্যমে প্রকাশ না হওয়ায় সেই সংখ্যা থাকছে হিসাবের বাইরে। রেলওয়ে পুলিশ বলছে, মামলা না হলে তাদের কিছুই করার নেই। অন্যদিকে চলন্ত ট্রেনে ছিনতাইয়ের ঘটনা বৃদ্ধি নিয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ও চিন্তিত বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন।
চলন্ত ট্রেনে ছুরিকাঘাত করে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি গামছা পার্টি, অজ্ঞান পার্টি, টানা পার্টি, ঝুলন্ত ছিনতাই পার্টি ও পকেটমারসহ বিচিত্র সব নামের সংঘবদ্ধ কিছু চক্রের দৌরাত্ম্য সাম্প্রতিক সময়ে এতটাই বেড়েছে যে, তাদের কাছে অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও। তবে দেশের রেলপথগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও এলাকা। গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলন্ত ট্রেনে অধিকাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে এই এলাকায়। ঢাকামুখী যাত্রাপথে বিমানবন্দর স্টেশন ছাড়ার পর তেজগাঁও এলাকায় আসতেই এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে।
গত ১০ জানুয়ারি তেজগাঁও এলাকায় চলন্ত ট্রেনের ছাদে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে মনির (২৫) ও সাব্বির (১৯) নামে দুজন আহত হন। এরই কয়েক দিন পর ১৩ জানুয়ারি কর্মস্থলে ফেরার ট্রেনের ছাদে ছুরিকাঘাতের শিকার হন সাব্বির হোসেন নামে এক যুবক। গত ২৬ জানুয়ারি রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় চলন্ত ট্রেনে ছিনতাইকারীরা ছুরিকাঘাতের পর নিয়ামুল হোসেন (১৯) নামে এক তরুণকে ছাদ থেকে ফেলে দেয়। তবে এ ঘটনায় ভাগ্যক্রমে প্রাণে বাঁচেন তিনি। গত ১৫ মার্চ সন্ধ্যায়ও রাজধানীর মহাখালীর আমতলী এলাকায় ছুরিকাঘাতের পর এক যুবককে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়। এছাড়া গত ১৬ মে রাজধানীতে চলন্ত ট্রেনের ছাদে দুই যুবককে ছুরিকাঘাত করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। আহতরা হলেন সাকিব (২২) ও রাকিব (২৩)। ২৬ মে চলন্ত ট্রেনের ছাদে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে রাজীব মিয়া (২২) নামে এক আনসার সদস্য আহত হন। সন্ধ্যায় রাজধানীর তেজগাঁও রেলওয়ে স্টেশনের কাছের কাঁচাবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ২৮ জুন টঙ্গীতে চলন্ত ট্রেনের ছাদে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে মেহেদী হাসান পরশ (১৭) নামে এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। ১৩ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর স্টেশন এলাকায় চলন্ত ট্রেনের ছাদে জাকিরুল ইসলাম (২১) নামে এক পোশাককর্মী ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতের শিকার হন।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, ট্রেনের ছাদে চড়ার শাস্তি মাত্র ২০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড। ব্রিটিশ আমলের ওই আইনের লঘুদণ্ডের কারণেই ট্রেনের ছাদে ওঠা বন্ধ হচ্ছে না। তারা জানান, সাধারণত স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে যাওয়া মানুষজন ট্রেনের ছাদে ওঠার ঝুঁকি বেশি নিয়ে থাকেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লাগাতার অভিযান চালিয়েও চলন্ত ট্রেনের ছাদে ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং দিন দিন এ ধরনের হামলার ঘটনা বেড়েই চলেছে। আর শুধু রাতের অন্ধকারেই নয়, ভয়ংকর এসব চক্রের সদস্যরা দিনের বেলায়ও যাত্রীরা কিছু ঠাহর করার আগেই তাদের গলায় গামছা, মাফলার অথবা বেল্ট পেঁচিয়ে ডাকাতি-ছিনতাই করছে। কেউ বাধা দিলে তাদের নির্দয়ভাবে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে চলন্ত ট্রেন থেকে।
এদিকে শুধুমাত্র ট্রেনের ছাদেই নয়, চলন্ত ট্রেনের ভেতরেও নিত্যনতুন কায়দায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, এসব ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য যাত্রীবেশে চলন্ত ট্রেনের ছাদে অবস্থান করে। পরে মওকা বুঝে হঠাৎ তাদের মধ্যে দুজন এক সঙ্গীকে দুই পা ওপর দিকে ধরে মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেয়। হঠাৎ দেখায় মনে হবে তাকে ট্রেনের ছাদ থেকে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু ঝুলে থাকা যুবকটি ট্রেনের খোলা জানালা বরাবর হঠাৎ ছোঁ মেরে ভেতর থেকে কেড়ে নেয় যাত্রীদের হাতে থাকা ব্যাগ, মোবাইল ফোন ও গলার চেইনসহ অন্যান্য মালামাল।
চলন্ত ট্রেনে ছিনতাইকারীদের দাপট বাড়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসির দায়িত্বে থাকা এসআই রুশো বণিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেলওয়ের জনবলের অপ্রতুলতা আছে, কিন্তু তারপরও সীমিত জনবল দিয়ে আমরা এসব রোধ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
ছিনতাইকারীদের ধরন সম্পর্কে এই নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘এদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত ও ভবঘুরে। কেউ কেউ আবার মাদকাসক্ত।’
তেজগাঁও এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে রুশো বণিক বলেন, ‘এখানে আমাদের কোনো পুলিশ ফাঁড়ি নেই। এটা একটা কারণ হতে পারে।’
ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও মামলা না হওয়ার কারণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় সামান্য আঘাতের কারণে অনেকেই মামলা করেন না।’
অন্যদিকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, চলন্ত ট্রেনে ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ার বিষয়টি নিয়ে তারাও চিন্তিত। তিনি বলেন, ‘আমাদের মাসিক সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়া ছদ্মবেশে ট্রেনের ছাদে উঠে এসব ছিনতাইকারীকে ধরার জন্য আমরা রেল পুলিশকে নির্দেশনা দিয়েছি। কিন্তু তারা এখনো সফল হয়নি। তবে আমরা এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’