ফেসঅ্যাপ নিয়ে বিভ্রান্তি

ছবি এডিট করে ‘বৃদ্ধ’ বানানোর প্রযুক্তি ফেসঅ্যাপ নিয়ে টেক-দুনিয়া রীতিমতো বিভক্ত হয়ে গেছে। কেউ বলছেন, এই অ্যাপ ব্যবহার করায় বেহাত হচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য, সব ছবি চলে যাচ্ছে রাশিয়ার কাছে। আবার কোনো কোনো প্রযুক্তিবিদ বলছেন, ফেসঅ্যাপ কর্র্তৃপক্ষ ব্যবহারকারীর তথ্যের অপব্যবহার করছে না। কয়েক দিনের ভেতর তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়া এই অ্যাপের রহস্য জানাচ্ছেন অমৃত মলঙ্গী

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে আইওএসের জন্য ফেসঅ্যাপ চালু হলেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে এই ২০১৯ সালে এসে। মানুষকে বৃদ্ধ হলে কেমন দেখাবে, এই ফিচারটি যোগ করার কারণে অ্যাপটি ভাইরাল হয়েছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অ্যাপ জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে মানুষের চিরন্তন একটি অভ্যাস কাজ করছে। আমরা সব সময় আমাদের ভবিষ্যৎ অবস্থা কিংবা পরিণতি নিয়ে কৌতূহলী থাকি। এই অ্যাপটি মজার ছলে সেই কৌতূহল খানিকটা পূরণ করছে।

অ্যাপটি কি আসলে ঝুঁকিপূর্ণ

বিশ্বের নামকরা কয়েকজন প্রযুক্তিবিদের কথায় বোঝা গেছে অ্যাপ কর্র্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে ব্যবহারকারীকে বিপদে ফেলতে পারে। সেটি অবশ্য যেকোনো অ্যাপ কোম্পানি পারে।

মার্কিন প্রযুক্তিবিদ জোশুয়া নোজ্জি কয়েক দিন টুইটারে এই অ্যাপটি সম্পর্কে একটি পোস্ট দেন। তিনি সেখানে দাবি করেন, নিজের ফোনের ফটো গ্যালারিতে অ্যাপটিকে অ্যাকসেস দেওয়ার পর এটি ধীরে ধীরে সব ছবির তালিকা প্রস্তুত শুরু করে।

জোশুয়া এরপর দ্রুত এয়ারপ্লেন মোড চালু করেন। তিনি মনে করছেন, অ্যাকসেস দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফেসঅ্যাপ তাদের সার্ভারে ব্যবহারকারীর সব ছবি আপলোড করে নেয়।

প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেকে গ্যালারিতে বিভিন্ন ব্যাংকিং হিসাবের স্ক্রিনশট রেখে দেন। থাকে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছবি। অ্যাপ দিয়ে এডিট করার সময় এসব ব্যক্তিগত ছবি এবং স্ক্রিনশট সরিয়ে ফেলা উচিত।

নিউ ইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই অ্যাপ দিয়ে ছবি এডিট করলেই ফোনের দখল চলে যাচ্ছে রাশিয়ার হাতে! কারণ এই অ্যাপটি ওয়্যারলেস ল্যাব নামের একটি রাশিয়ান কোম্পানি তৈরি করেছে।

সেন্ট পিটার্সবার্গে বেড়ে ওঠা ইয়ারোসøাভ গনচারভ এটির প্রধান ডেভেলপার। সেখানকার স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন তিনি। পড়াশোনা শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের জন্য চলে যান। সেখানে মাইক্রোসফট তাদের অফিসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়। বিল গেটসের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুই বছর কাজ করেন তিনি। নামকরা এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে করতে ছবি এডিটের বিশেষ অ্যাপ তৈরির চিন্তা মাথায় আসে তার।

বিশেষ ফিল্টারের মাধ্যমে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এইআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ছবি এডিট করার পর ফেসঅ্যাপ সেগুলো নিজেদের সার্ভারে রেখে দেয়। তাদের টার্ম অ্যান্ড কন্ডিশনে বলা আছে, এআই টুল ব্যবহার করে আপলোড করা ছবি পরিবর্তন, পুনরুৎপাদন এবং প্রকাশ করতে পারবে ফেসঅ্যাপ।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রযুক্তিবিদ জেমস হ্যাটলি বলছেন, ফেসঅ্যাপ আপনার নাম ব্যবহার করে এই ছবি অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। এমনকি বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছেও হয়তো বিক্রি করছে।

ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে আরও ভয়ংকর তথ্য দেওয়া হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এরিয়েল হকস্টস্ত সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, অ্যাপকে ফোন গ্যালারির অ্যাকসেস দেওয়ার পর আপনার পুরো অনলাইন কার্যক্রম হ্যাকড হয়ে যাচ্ছে। আপনি কোন ওয়েবসাইটে ঢুকছেন, কী দেখছেন সেটি তারা বিশেষ কুকিজ ব্যবহার করে জেনে যাচ্ছে। এমনকি অ্যাপটি ডিলিট করে দিলেও বিপদ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাচ্ছেন না।

ভাইস নিউজের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেসঅ্যাপ লগ ফাইলস, ডিভাইস আইডেনটিফায়াস, লোকেশন ডেটা এবং ইউজেস ডেটা সংগ্রহ করে।

এসব তথ্য অনলাইন বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে তারা জানার চেষ্টা করে আপনি কী পছন্দ করেন, কোন ওয়েবসাইটে ঢু মারেন। ফলাফল অনুযায়ী তারা আপনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিডে বিজ্ঞাপন পাঠায়।

বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস আবার ভিন্ন সুরে কথা বলছে। তাদের দাবি, ব্যবহারকারীর ছবি ফেসঅ্যাপ নিচ্ছে না এবং রাশিয়ায়ও পাঠাচ্ছে না। এই দাবির পক্ষে তারা ফরাসি প্রযুক্তিবিদ ব্যাপটিস্ট রবার্টের একটি ‘পরীক্ষা’র কথা তুলে ধরেছে।

মানুষের মুখের ছবি অ্যাপটি কোথায় পাঠাচ্ছে সেটি জানতে রবার্ট ফেসঅ্যাপ ডাউনলোড করেন। তিনি বলছেন, এই অ্যাপ শুধু ব্যবহারকারীর ‘সাবমিটেড ফটো’ নিচ্ছে। অর্থাৎ আপনি যে ছবিটি এডিট করছেন, সেটি সার্ভারে নিচ্ছে তারা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ছবি কোথায় যাচ্ছে?

ফোর্বস বলছে, ফেসঅ্যাপ যেসব সার্ভারে ছবি সংরক্ষণ করে তার অধিকাংশ আমেরিকায়। ‘ঋধপবঅঢ়ঢ়.রড়’ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামাজনভিত্তিক ডেটা সেন্টার ব্যবহার করছে। কিছু সার্ভার আরেকটি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলেও থাকছে। কিছু আছে আয়ারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর কিংবা অস্ট্রেলিয়ায়।

ফোর্বসের এই প্রতিবেদনেও কিছুটা বিভ্রান্তি রাখা হয়েছে। এক জায়গায় তারা বলছে, ডেভেলপার কোম্পানি যেহেতু রাশিয়ান তাই ছবিগুলো সেখানে দেখা যেতে পারে। আমাজন ডেটা সেন্টারের ছবির কপি রাশিয়ার কম্পিউটারেও রাখা যেতে পারে।

ফোর্বস বলছে, ফেসঅ্যাপের কর্মকর্তারা সার্ভারের ওই ছবিগুলোয় কতটুকু অ্যাকসেস পাচ্ছেন, সেটি পরিষ্কার নয়। সে ক্ষেত্রে রাশিয়ার গোয়েন্দা এবং পুলিশ বিভাগ প্রয়োজন হলে ফেসঅ্যাপের থেকে কোনো ছবি নিলেও নিতে পারে।

বিতর্কের মুখে ফেসঅ্যাপের অবস্থান

অ্যাপটির প্রতিষ্ঠাতা ইয়ারোসøাভ গনচারভ ফোর্বসের কাছে মুখ খুলেছেন। তার দাবি, ব্যবহারকারীর কোনো তথ্য রাশিয়ায় পাচার করা হচ্ছে না। অধিকাংশ ছবি ক্লাউডে প্রসেস করা হয়।

‘ব্যবহারকারী যে ছবিটি এডিটের জন্য নির্বাচন করেন, আমরা কেবল সেই ছবিটি আপলোড করি। ফোন থেকে অন্য কোনো ছবি আমরা ক্লাউডে নিই না। অধিকাংশ ছবি আপলোডের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ডিলিট করে দিই। কোনো তথ্যও তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করা হয় না।’

তিনি জানান, ব্যবহারকারী ইচ্ছা করলে সব ডেটা ডিলিট করার আবেদন করতে পারেন। সেটিংসে গিয়ে এটি করতে হয়।

এই দাবি কতটুকু সত্য

ফেইসবুকের মতো প্রতিষ্ঠান যেখানে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় করেছে, করছে; সেখানে ফেসঅ্যাপ প্রতিষ্ঠাতার এমন দাবি অনেকেই মানতে চাইছেন না। বিশেষ করে আমেরিকার সিনেটররা।

সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চক শুমার এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে শোরগোল শুরু করে দিয়েছেন। এফবিআই এবং ফেডারেল ট্রেড কমিশনকে ফেসঅ্যাপের বিরুদ্ধে তদন্তে নামতে চিঠি পাঠিয়েছেন।

তিনি মনে করছেন, এই অ্যাপ ব্যবহারের কারণে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।

ব্যবহারকারীর করণীয়

সব আলোচনার শেষ কথা যেকোনো অ্যাপ সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। যেসব তথ্য বেহাত হলে বিপদে পড়তে পারেন, তা ফোনে রেখে অ্যাপ ব্যবহার করা উচিত নয়। এমনকি ফেইসবুকও না।

সফটওয়্যার ডেভেলপার জোশুয়া নোজ্জি অ্যাপটি নিয়ে শুরুতে যে দাবি করেছিলেন, পরে তা সংশোধন করেন। তিনি বলেন, ‘ব্যবহারকারীর সব ছবি ফেসঅ্যাপ তাদের সার্ভারে নিচ্ছে; আমার এমন ধারণা ভুল। আমি বুঝতে পেরেছি তারা শুধু এডিট করা ছবিটি ব্যবহার করছে। আমি শুধু বলতে চাই, এসব অ্যাপ সবার সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। অ্যাপটি নিয়ে ভুল মন্তব্য করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।’