বাংলাদেশের গর্ব

২০১২ সালে দেশের সব সিটি করপোরেশনের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণে সেরা হয়েছে। তিনবার বর্ষাকালে গাছের চারা রোপণে হয়েছে দেশে প্রথম। ২০১৬ সাল থেকে মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর বায়ুকণার দূষণ ঠেকিয়ে আনতে দুনিয়াতেই সবচেয়ে এগিয়ে আছে ‘রাজশাহী সিটি করপোরেশন’। এমন উদাহরণ তারা কীভাবে হচ্ছেন? দেশের ও বিশে^র অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও বিশুদ্ধ বাতাসের শহরটি থেকে লিখেছেন আহসান হাবীব অপু।

ছবি তুলেছেন রাশেদুর রহমান রাসেল

খবর প্রকাশিত হয়েছে বিশ্ব খ্যাত ইংরেজি দৈনিক গার্ডিয়ানে। অনেক দেশের সংবাদ মাধ্যমে ছাপা হয়েছে রাজশাহী শহরের কীর্তি। আমাদের দৈনিকগুলোও নানা সময়ে প্রকাশ করেছে শহরটির সাফল্য। শতমুখে তাদের প্রশংসা কেন করছেন সারা দুনিয়ার মানুষ? খালি চোখে দেখা যায় না, এমন মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর, খুব ছোট ধুলো, ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানার মেশিনের ক্ষতিকর কণা, শহরবাসীর ফেলা ময়লা আবর্জনা ইত্যাদি বাতাসে ভেসে থাকে। ক্ষতিকর এই কণাগুলো সারা বিশে^র সব দেশের মধ্যে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি কমিয়ে এনেছে রাজশাহী শহর। জাতিসংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠান বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)’র প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে গল্পটি আরও খোলাসা করেছে গার্ডিয়ানÑ ‘২০১৪ সালে রাজশাহী শহরের বাতাসে ক্ষতিকর ভাসমান অতি ক্ষুদ্র ধুলিকণার (যাকে বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা ‘পিএম ১০’ নামে ডাকেন) ছিল প্রতি ঘনমিটারে ১৯৫ মাইক্রোগ্রাম। শহরটি আবহাওয়ার ধারাবাহিক যে উন্নতি কাজ করে চলেছে, সেটির ফলাফলে দুই বছর পর সেই ধুলিকণার পরিমাণ প্রতি ঘনমিটারে কমে এসে হয়েছে ৬৩.৯ মাইক্রোগ্রাম।’ বিশুদ্ধ বাতাসের গোছানো, সাজানো, আবর্জনা ছাড়া এই শহরের জন্য রাজশাহীর মানুষের যুদ্ধটি এখনো চলছে। ফলে তারা শহরের প্রতি ভালোবাসায় হচ্ছেন অনন্য।

কীভাবে হলো শুরু? ফিরে যেতে হবে বছর ১১ আগে। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো শহরের মেয়র নির্বাচিত হলেন এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। তখন থেকেই নিজের শহরকে আরও সুন্দর করতে, দুর্গন্ধময়, নোংরা, আবর্জনার শহরটিকে বদলে দিতে নানা ধরনের কাজ শুরু করলেন তিনি। নজরে পড়ল রাজশাহীর বাতাসের দূষণ কীভাবে কমানো যায়? গাছের সংখ্যা কম, মানুষের শহরের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও উদ্যোগ নগরপিতাকেই নিতে হয়। ফলে মেয়র হয়ে এসেই ‘জিরো সয়েল’ বা ‘খালি মাটিটুকুও নেই’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিলেন। শহরের সব ফুটপাত, পড়ে থাকা মাটিÑ সব জায়গাতেই গাছের চারা, ফুলের বাগান, ঘাস রোপণ করা হবেÑ এই হলো তার এ স্বপ্নের শহরের শিশু, বৃদ্ধ, পুরুষ নারীদের জন্য বাসযোগ্য করার, আরামদায়ক করার উদ্যোগের পেছনের প্রচেষ্টার মূলকথা। আবর্জনা ফেলার, সেগুলো পড়ে থাকার জায়গা তারা রাখবেন না। তাদের আরও একটি লক্ষ্য ছিল, খালি মাটি থাকলে সেটি প্রচ- গরমে ধুলো হয়ে যাবে, বাতাসে মিশে সেটিতে মিশে থাকা নোংরায় শহরের বাতাস দূষণের মাত্রা আরও বাড়াবে। এরপর কাজে নামলেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রাস্তার পাশে যেটুকু খালি জায়গাই তারা পেলেন, সেই বছর থেকে বাগান বিলাসের আদলে, ঘাস দিয়েÑ পরিকল্পনা করে সাজাতে লাগলেন। এই কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন করপোরেশনে প্রকৌশল বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক। তিনি কর্মীদের নিয়ে সবুজ এবং কার্বনডাই-অক্সাইড মুক্ত শহর তৈরির পরিকল্পনা করতে শুরু করলেন। তবে তিনি ও রাজশাহীর মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন দুজনেই স্বীকার করলেন, শহরের সবুজায়নে উদ্যোগটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে শিখিয়েছেন মিজানুর রহমান মিনু। তিনি শহরের প্রথম নির্বাচিত মেয়র, লিটনের মতোই প্রবল জনপ্রিয়। সবুজ রাজশাহী গড়ে তোলার জন্য তিনি গাছ রোপণের উদ্যোগটি নিয়েছিলেন। বিভিন্ন পাড়ায়, মহল্লায়, শহরের সীমানায় গাছ রোপণ করা শুরু করেছেন। পরের মেয়র আগের মেয়রের ভালো কাজটি নতুন প্রেরণায় শুরু করেছেন। বিভিন্ন আয়োজনে, অনুষ্ঠানে বা আলোচনা সভায় তিনি বলতে শুরু করলেন, গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান, রাজশাহী বাঁচান। এরপর থেকেই মানুষরা বাসাবাড়ির আশপাশে গাছের চারা রোপণ করতে শুরু করলেন। বৃক্ষপ্রেমীরা আরও আশাবাদী হলেন। কে কী গাছ কিনেছেন সে গল্প করতে লাগলেন। সেই থেকে বর্ষাকাল এলেই শহরে গাছের কচি চারাগুলো বাড়তে শুরু করে। ব্যক্তি, এমনকি প্রতিষ্ঠানও এখন বৃক্ষমেলা করে। গাছের বিক্রিও প্রচুর। নিজে কিনে বিত্তবান, সমাজসেবীরা চারা স্কুলে স্কুলে বিলিয়ে দেন। এ বছরও তারা আগের মতো ১২০টি বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের চারা উপহার দিয়েছেন। প্রতিবারের মতো স্কুলগুলোর প্রধান শিক্ষকদের বলেছেন, আপনার ছাত্রছাত্রীদের কত চারা প্রয়োজন? তারা জানিয়েছেন। করপোরেশনের ফান্ডে ততগুলো গাছের চারা বিনা খরচে দেওয়া হয়েছে। এভাবে হাজার হাজার গাছ শহর ও আশপাশে বেড়ে উঠছে।

প্রথম মেয়াদে ২০১৩ সাল পর্যন্ত টানা আরও অনেক কাজের পাশাপাশি রাজশাহীকে নোংরার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন লিটন। বিপুল গাছের চারা তারা শহরের নানা স্থানে রোপণ করেছেন। বিরাট ভবনের পাশে রাজপথে সড়ক বিভাজক বা রোড ডিভাইডার তৈরি করে মানুষকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে অনুরোধ করেছেন। বিভাজক তৈরি করার সময় খেয়াল রেখেছেন, যাতে বড় গাছও বেড়ে ওঠে সেভাবে মাটি গভীর ও চওড়া রেখে সেটি তৈরি করা যায়। সেই মাটিতে পুঁতে দিয়েছেন এমনকি সুপারি গাছের চারাও। সেগুলো এখন যৌবনে। সড়কের বিভাজকগুলোকে তারা কোনো কোনো জায়গায় লোহা দিয়ে চারপাশে ঘের দিয়েছেন। মাঝে রোপণ করেছেন ফুলের গাছ। যেখানে পারেননি বাঁশের বেড়া দিয়েছেন। গাছগুলো যেকোনো মানুুষকেই মুগ্ধ করছে। লাল, নীল, নানা রঙে রঙিন করছে মন। সেগুলোতে অন্যান্য গাছের মতো ভোর সকালে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের পানি ঢালতে দেখা যায়। শহরে যে ধুলোর চিহ্নও নেই, তার প্রমাণ গাছগুলোর সজীবতা। গাছগুলোর গোড়া থেকে করপোরেশন ও সচেতন মানুষ ময়লা পরিষ্কার করেন। বিরাট অনেক ভবন গড়ে উঠছে। মেয়র ও তার কর্মী বাহিনী উদ্যোগ নিয়েছেন, ভবন মালিক ও ভাড়াটিয়ারা মিলে যেন ছাদে বাগান করেন। কাজের পরিকল্পনা চূড়ান্ত। কদিনের মধ্যেই তারা মাঠে নামবেন।

রাজশাহীর মেয়র ২০০৮ সাল থেকে আরও একটি অনন্য কাজ শুরু করলেন। দিনে নয়, রাতে শহরের বাসাবাড়ি, এলাকার কোনায়, নোংরায় পড়ে থাকা ময়লা গাড়িতে তুলে নেওয়া হবে। সারা দিন বাসাবাড়িতেও জমিয়ে রাখবেন, সেগুলো করপোরেশনের পোশাক পরা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তুলে নেবেন গাড়ি, আবর্জনার টানা গাড়িতে। নিয়ে যাবেন ভাগাড়ে। ’০৯ সাল থেকে এই কাজ চলছে। ময়লা তুলে নেওয়ার জন্য নানা স্থানে অসংখ্য বাতিও লাগিয়েছেন তারা। ফলে শহরটি আলোকিত হয়েছে। কেবল তাই নয়, ময়লা যাতে শহরের মানুষ নির্দিষ্ট স্থানে ফেলেন, সে জন্য তারা নির্ধারিত ময়লার বাক্স স্থাপনের কাজও তখন শুরু করেন। তাতে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার অভ্যাস গড়ে উঠেছে নগরবাসীর। সিটি করপোরেশন ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সভায়, শহরে মাইকিং করে তাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তাতেও অনেক কাজ হয়েছে। নোংরা বাতাসে মিশে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ে রোগ বাঁধানোর উপায় থাকছে না। এভাবেও রাজশাহী দূষণমুক্ত হচ্ছে। এসবের বাইরে পুরো শহরকে তারা রাতে ঝাড়– দিয়ে পরিচ্ছন্ন করে মানুষের বাসের উপযোগী করেন।

শহরের পরিবেশ উন্নয়নের জন্য আলাদা ‘পরিবেশ উন্নয়ন শাখা’ আছে তাদের। এটি এই মেয়রেরই কীর্তি। ঘুরে ঘুরে তারা শহরের পরিবেশের উন্নয়ন করেন, অন্যান্য বিভাগের কর্মীদের সঙ্গে মিলে কাজও করেন। মহাসড়কেও তাই এখন গাছের প্রাচীন, পড়ে যাওয়া গাছের পাতা ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। এতটাই ঝকঝকে! তারা শহরে পানি ছেটান। পুরো শহরের ১০ কিলোমিটার বা ছয় দশমিক ২১ মাইল সড়ক দ্বীপ বের করেছেন। ফুটপাতে ৩৫০টি বিরাট পাম গাছ লাগিয়ে বড় করেছেন। প্রতিটি গাছ ২০ ফুটের পার্থক্য আছে। ফুটপাতগুলো পাকা করে দিয়েছেন। গাছের ছায়ায় গল্প, বসে আরাম করতে পাকা বেঞ্চ করেছেন। করপোরেশনের ফান্ড, সরকারি বাজেট ও ভারত সরকারের দেওয়া অনুদানে বড় রাস্তাগুলোর ফুটপাতে টাইলসও বসানো হয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমাদের এই শহরের ১৫ কিলোমিটার বা (৯.৩২ মাইলেরও বেশি) ফুটপাত টাইলসের খরচ দিয়েছেন। পথগুলো পরিষ্কার রাখতে মানুষকে তারা বারবার বলে অভ্যাস গড়েছেন। নারী-পুরুষের আলাদা অনেক টয়লেট বসিয়েছেন। সারা শহরের সব রাজপথের দুই পাশে নানা জাতের গাছ লাগিয়েছেন। প্রতি বছরের মতো এবার তারা প্রতিটি আইল্যান্ড (সড়ক দ্বীপ), ফুটপাত ও রাস্তার পাশের ফাঁকা স্থানে মোট ১৬ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন। সেগুলোর যতœ নেওয়া হচ্ছে। তারাও বাঁচবে। তারা কোনো রাস্তাই ফুটপাত ছাড়া তৈরি হতে দিচ্ছেন না। তাদের সেøাগানটি জনপ্রিয়Ñ ‘ফুটপাত ছাড়া কোনো সড়ক নয়’। ফলে আগেই মেয়র অফিসে এসে ফুটপাতের জায়গা দেখিয়ে নিচ্ছেন ঠিকাদাররা। নয়তো বিপদ। মেয়র চানÑ একটি মানুষও যেন অনিরাপদে রাস্তায় না হাঁটেন। কারো যেন পঙ্গুত্ব বা মরণ না হয়। 

শহরে গাড়ি কম বলে সেগুলো থেকে বাতাসে পেট্রল, অকটেন অনেক কম মেশে। ব্যাটারিচালিত গাড়ি বেশি বলে তাদের গাড়িদূষণ অনেক কম। তারপরও তারা থেমে নেই। পুরো শহরের নালাগুলোকে পাকা করেছেন, সেখানে ময়লা, আবর্জনা চলাচলের আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেন করে দিয়েছেন। ময়লা এখন নির্দিষ্ট স্থানে যাচ্ছে। শহর উপচে পড়ছে না প্রবল বৃষ্টি বা বন্যার তোড়ে, নোংরা জলে। এক্সকাভেটর (খননযন্ত্র) দিয়ে সেগুলো তুলে ফেলে সরাসরি গাড়িতে তুলে নিয়ে নোংরার ভাগাড়ে ফেলছেন। সেই ভাগাড়ও পরিদর্শন করছেন রাজশাহীর মেয়র। পরিবেশের উন্নতি ঘটাচ্ছেন। বিভাগীয় এই শহরটি আমের জেলা শহরগুলোর কেন্দ্রবিন্দু। শহরের ও পুরো বিভাগের মানুষ তাদের জীবিকা, পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যে গাছপ্রেমী। শহরের আশপাশেও আছে অনেক এমন বাগান, গাছের সারি। ফলে পুরো কার্যক্রমে বিপুল সাড়া পড়েছে। ধুলোহীন শহরের সবচেয়ে বড় ফলাফল হলোÑ আগে যে প্রমত্তা পদ্মার চরে পাশের রাজশাহী শহরের ধুলো, বালির দূষণে ঘাসও জন্মাত না; এখন সেখানে ফসলের ও ফলের চাষ হয়। সেই কৃষকের ঘরেও হাসি ফোটে। এটিই রাজশাহীর দুই মেয়রের ধারাবাহিক সাফল্য। তাতে নতুন খুশি যোগ করেছেন বাংলাদেশে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত রিনা পি সোয়েমারনো। গেল মাসে শহর ঘুরে বলেছেন, ‘পৃথিবীর যেকোনো শহরের চেয়ে রাজশাহী আলাদা। চমৎকার পরিবেশ। পরিচ্ছন্নতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি।’