এবার এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেড পেয়েছে ‘পরিবেশ পদক ২০১৯’। পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগে পদক পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে লিখেছেন শাহ মোহাম্মদ আলী আজগর
বিরাট এই টেক্সটাইল মিলটি আছে ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলাতে। এটির নাম হলোÑ‘এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেড’। ৫০ একর জায়গার এই মিলে সুতা থেকে কাপড় বোনা যায়। অনেকগুলো ইউনিট আছে তাদের। সুনামও বাজারে খুব। ২৪ ঘণ্টাই চলে মিলটি। তিনটি শিফট আছেÑ ২৮শ শ্রমিক নারী-পুরুষ কাজ করেন। তারা আশপাশের এলাকারই মানুষ। কীভাবে কাজ হয়? কারখানা ঘুরে জানা গেল, তুলা থেকে সুতা; সুতা থেকে রোপ ডেনিম (সুতোর জিন্স) তৈরি হয়। শুরু থেকেই কারখানাটি অন্যরকম। সারাক্ষণই চালু আছে ইটিপি প্ল্যান্ট। কল-কারখানা থেকে যে ময়লা পানি বেরিয়ে আসে নানা পণ্যদ্রব্য তৈরি করার সময়, সেটিই এই প্ল্যান্টের মাধ্যমে আবার পরিশোধনের যোগ্য করে খাওয়া যায়। এনভয়ের ইটিপি প্ল্যান্টের পানি খেয়ে বেঁচে থাকেন ও কাজ করেন শ্রমিক-মালিক-কর্মচারী, কর্মকর্তারা এমনকি মালিকরাও। এই অনন্য উদ্যোগসহ আরও অনেক কাজ তাদের এবার জাতীয় পরিবেশ স্বর্ণপদক পাইয়ে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পদকটি গ্রহণ করেছেন এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কুতুব উদ্দিন আহাম্মেদ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের পরিচালক ফরিদ আহমদ বললেন, “দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগে এ বছর আমাদের যাচাই ও বাছাইয়ে ‘এনভয়’ এই পুরস্কারের যোগ্য বিবেচিত হয়েছে। তারা তাদের কারখানার দূষিত পানি পরিশোধন করে বৈজ্ঞানিকভাবে পানের উপযোগী করে সবাই পান করছেন। তাতে শ্রমিকদেরসহ সবার যেমন প্রতিষ্ঠানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশিত হচ্ছে, তেমনি তাদের পরিবেশ দূষণ রোধের অনন্য উদ্যোগটি অন্যদের জন্য উদাহরণ হয়ে আছে।’ তিনি আরও অনেকগুলো কারণ এবারের পরিবেশ বিষয়ে স্বর্ণপদকের জন্য এই প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া হয়েছে বলে জানালেন। এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেড এবার পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগে সেরা হয়েছে। পরিবেশ বাঁচানো ও কারখানাকে বিশ^মানের করার সেই অবিশ্বাস্য গল্পই এবার।
শ্রমিক-মালিক বান্ধব এই প্রতিষ্ঠানে সবার সম্পর্ক খুব ভালো। কারও মধ্যে কোনো বিভেদ-হিংসা নেই; বরং ভালোবাসা ছড়ানোর অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। সেগুলো আলাদা। শ্রমিকদের খেলা করার জন্য কারখানাতে আছে বেশ বড় একটি মাঠ। কাজের অবসরে বা কাজ শেষে তারা সেখানে বেরিয়ে আসেন, ক্রিকেট-ফুটবল খেলেন। সবার নামাজ পড়ার জন্য মসজিদ আছে। নারীদের জন্যও আছে ব্যবস্থা। এনভয়তে কেউ ফোন করলেই শুনবেনÑ ‘আসসালামু আলাইকুম, ওয়েলকাম টু এনভয়।’ প্রতিটি রিংটোনে এই কথাগুলোই শুনবেন সবাই। বাংলাদেশের পরিবেশের উপযোগী ও এই দেশের মানুষের প্রধান ফল আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুসহ নানা জাতের ফলের ও বনের গাছের সারি আছে বিরাট এলাকাটিতে। সেগুলো তাদের ছায়া দেয়। খাবার হিসেবেও তারা খেতে পারেন। নানা জাতের ফুলের গাছ আছে। সেই গাছের সারিতেও মন ভালো হয়, প্রশান্তি লাভ করেন এনভয়ের সবাই। সেজন্য আলাদা ১৪ জন মালি আছেন। তারা অন্য কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মতো সুবিধা ও বেতন সবই পান।
কর্মচারী, কর্মকর্তাদের রোগ বা তারা অসুস্থ হলে আলাদা মেডিকেল ইউনিট (শাখা) আছে। সারি সারি বেড আছে তাতে। খুব ভালো মানের চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ সব তো আছেই। তাদের আছে বিরাট এক লেক। লেকে শিং, মাগুর, রুই, কাতলা, মৃগেলসহ নানা জাতের দেশি মাছের প্রজাতি চাষ হয়। কোনো উৎসব বা আয়োজনে, পিকনিকে, পারিবারিক অনুষ্ঠানে শ্রমিকরাও খেতে পারেন। ভালো আয়োজনে, প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের প্রায়ই বাংলাদেশের মাছ খেতে মন চায়। তখন তারা এই লেকের মাছই নিয়মিত খান। এভাবে দেশের প্রতি ভালোবাসার পরিবেশ পুরো এনভয় টেক্সটাইলসে ছড়িয়ে আছে। তাতে সব শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যেমন এই দেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে ভালো লাগে, তেমনি তারা দেশের প্রতি দায়ও সবসময় অনুভব করেন।
পুরো প্রতিষ্ঠানই সৎভাবে চালানোর চেষ্টা প্রথম থেকেই করে চলেছেন এনভয় গ্রুপের চেয়ারম্যান কুতুব উদ্দিন আহাম্মেদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালাম মুর্শেদী। সালাম মুর্শেদী এখন সংসদ সদস্য। তবে সারা দেশের মানুষ তাকে চেনেন বিখ্যাত ‘ফুটবলার’ হিসেবে। তারা প্রতিদিন এই প্রতিষ্ঠানে সময় দেন। তাদের সততা, সুনাম ও আন্তরিকতা; শ্রমিকদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি ভালোবাসা ও সততাই এনভয়ের অসাধারণ সাফল্যের কারণ।
এই টেক্সটাইলসের ভেতরে আছে ‘সততা’ নামের একটি ‘ক্যান্টিন’। সেখানে নিজেরাই খাবার নিয়ে খেয়ে, আবার দাম লেখা অনুসারে টাকা দিয়ে আসেন শ্রমিকরা। তাদের সৎভাবে বেঁচে থাকার চর্চা গত ১১ বছরে আরও অনেক বেড়েছে। তাদের কল্যাণের জন্য, ভালোর জন্য অনেক উদ্যোগ আছে কর্তৃপক্ষের। তাদের সন্তানদের মেধাবৃত্তিসহ নানা ধরনের সেবা ও উৎসাহ দেওয়ার মতো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন মালিকরা।
পল্লীবিদ্যুতের আলোতে ও নিজেদের জেনারেটরে একশভাগ রপ্তানিমুখী এই প্রতিষ্ঠানটি চলে। কোনোভাবেই, কোনো অবস্থাতেই তারা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে পিছপা হন না।
দুইবার বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সেরা বিল পরিশোধ করা প্রতিষ্ঠান হয়েছেন। তাতে তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি সরকারের নজর আরও বেড়েছে। কার্বন পারফরমেন্স ইমপ্রুভমেন্ট ইনিশিয়েটিভ টু ক্যাড (কম্পিউটার-এইডেড ডিজাইন) পুরস্কার পেয়েছেন মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ রোধে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) তাদের ‘সবুজবান্ধব কারখানা’র পুরস্কার দিয়েছেন।
এটি আসলেই সত্য। তাদের প্রবেশপথেই আছে সবুজের সারি। ভেতরেও সবুজের কমতি নেই, আগেই জেনেছি। সরকারি করও কোনোভাবেই ফাঁকি দেন না তারা। দুইবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেরা করদাতার পুরস্কার পেয়েছেন। তাদের ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি) দুইবার সেরা প্রতিষ্ঠানের পুরষ্কার দিয়েছেন। ফলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তারা করদানে সেরা ও স্বচ্ছ। সেরা শিল্প-কারখানা হিসেবে তারা বড় প্রতিষ্ঠান বিভাগে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছেন। এত উদ্যোগের ফলে দেশের সেরা পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠানটি সেরা টেক্সটাইল মিলস হিসেবে সাতবার জাতীয় রপ্তানি ট্রফি লাভ করেছে। এখন তারা ৩২ মিলিয়ন ডেনিম তৈরি করেন। তারা লিডারশিপ ইন অ্যানার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন পুরস্কার পাওয়া।
এনভয় দেশের প্রথম ডেনিম উৎপাদন করা কম্পানি যারা বিশ^মানের পরিবেশ, নিরাপত্তা ও কাজের নিশ্চয়তা দিয়েছে। পুরো কারখানার সবচেয়ে ভালো দিক হলো কোথাও কোনো ময়লা আবর্জনা নেই। একেবারে তকতকে।
মূলধন ও অন্যান্য খরচ জোগাতে, নতুন উৎপাদনের যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হয়েছে বলে এবার মুনাফা তাদের কমে গেছে। তারপরও দেশের সেরা পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার পেয়ে তারা আশায় বুক বেঁধেছেন।