সোলের তানিয়া খানকে বন বিভাগ, বন ও প্রাণী, পাখি গবেষকরা সবাই ভালোবাসতেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান ও বন্যপ্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপুর স্মৃতিতে তাকে নিয়ে লিখেছেন ওমর শাহেদ
একেবারেই আলাদা ছিলেন দুজনে। মুনীর আহমেদ খান ও তানিয়া খান জোড় বেঁধেছিলেন প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসায়। দুজনেই বন্যপ্রাণী ভালোবাসতেন। তাদের সন্তানের মতো লালনপালন করতেন। মুনীর ছিলেন সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও পরে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের রেঞ্জ অফিসার। বড়লোকের ছেলে, সমাজের উঁচু তলার মানুষ। তবে আলাদা করেছে তাকে প্রাণিকুল ও বনের প্রতি আগ্রহ। নতুন কিছু দেখলেই, অন্যরকম প্রাণীর খোঁজ পেলেই জানতে চাইতেন। বনে ঘোরার বাতিক ছিল। প্রাণীদের ডাক শুনেই বলে দিতে পারতেন কে, কোথায় ডেকেছে। বনচোররা তার ভয়ে গাছ কাটতে পারত না। সর্বশক্তি দিয়ে তাদের রুখে দিতেন। কোনো ভয় ছিল না। যখন-তখন বনে চলে যেতেন, বেড়াতেন। অনেকবার তার বাড়িতে গিয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও বাঘ গবেষক ড. মনিরুল এইচ খান; নামকরা লোক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক। দেশে-বিদেশে তার অনেক ছাত্র। পাখি, প্রাণী নিয়ে তাদের আলাপ হয়েছে। নানা ভাবনা ও অভিজ্ঞতার বিনিময় করেছেন। অধ্যাপককে তিনি বন হাতে ধরে জানিয়েছেন। শিক্ষক দিয়েছেন বিদ্যা। মুনীরের অধীনে ছিল পুরো শ্রীমঙ্গল। মৌলভীবাজার জেলার বড়শিজোড়া ইকোপার্কে শেষবার সক্ষম হয়ে তিনি হোন্ডা চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে গেলেন। এরপর তাকে ইকোপার্ক হাসপাতালে নেওয়া হলো, কিন্তু প্রচন্ড চাপ, টেনশন এবং অনিয়মিত জীবন তাকে স্বাভাবিক হতে দেয়নি। রোগও হয়তো ছিল। সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। সেখানেই দেখতে গেলেন মনিরুল স্যার। তেমন কোনো কথা বলতে পারতেন না, মুখের একটি অংশ অবশ হয়ে গিয়েছিল। তবুও দীর্ঘদিনের বন্ধুর কথাগুলো বুঝতে অসুবিধা হলো না বাঘ গবেষকের। তাকে বসতে বললেন বন কর্তা। ‘তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও’, বললেন তিনি; উত্তরে শুনলেন, ‘আবার আমরা একসঙ্গে পাখি দেখতে যাব।’ আলাপ শেষে ফিরে এলেন নিজের কাজে। মায়ের কাছে সুনামগঞ্জে চলে গেলেন মুনীর আহমেদ খান। মায়ের কাছেই সেবা ও ভালোবাসায় থেকেছেন। তবে কেন যে আবার তিনি দ্বিতীয়বার হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন! আবারও তাকে ওসমানী মেডিকেলে ভর্তি করা হলো। সেখানেই ২০১৫ সালে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন ত্যাগী, বনপ্রেমী ও জীবনে অনেক সংগ্রাম করা মানুষটি। তখনও বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা জানাতে, শেষবারের মতো দেখতে গিয়েছিলেন মনিরুল এইচ খান। অনেক ট্রিপের, ছবি তোলার অনেক মুহূর্তের, অনেক পাখিরÑ প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা ছড়ানোর ঘটনাগুলো মনে পড়ে গেল। এমন বিরল মানুষ তো বনের বুকে থাকে না। স্বাভাবিকভাবেই তার মনটি এখনো বিঘ্ন, ব্যথায় ভরে ওঠে সেসব স্মৃতি মনে পড়লে। কী যে হারিয়েছেন সে তিনিই জানেন। বন চিনিয়েছেন তাকে কতভাবে। তার স্ত্রীর কথাও কোনোদিন ভুলতে পারবেন না মনিরুল এইচ খান। তানিয়া খানও একেবারেই অন্যরকম। বনে, জঙ্গলে ঘোরার ও ছবি তোলার বাতিক স্বামীর মতো তারও ছিল। তাদের যৌথ সংসারের বন বিভাগের সেই বাড়িতে থেকেছেন স্বামীর মৃত্যুর পর। সেটি ছিল পড়শিজোড়া ইকো পার্কের একটি পরিত্যক্ত বাংলো। কয়েকবার গিয়েছেন মনিরুল এইচ খান। তাতে পা পড়েছে অনেকবার সীমান্ত দীপুর। এই বন্যপ্রাণী গবেষকের সঙ্গে তার আলাপ অনেক বছর ধরে। প্রকৃতি, পাখি; সিলেটের বনে বনে প্রাণী, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীদের জীবন কেমন, তার চেনা স্বামীর মতোই; বনপ্রাণী ও সরীসৃপদের জীবনও জানা; ফলে শিখতে ও জানতে এবং ওদের নিয়ে কাজ করতে দুজনের আলাপ হতো, তারা অনেক বেড়িয়েছেন। হৃদ্যতা ছিল খুব। কোনোকিছু দেখলেই ছবি তুলতেন তানিয়া। কোনো সময় না পারলে ডাক রেকর্ড করতেন; তাও না পারলে চিনে রাখতেন। পরে ফোন করে জানাতেন। আসব তানিয়া আপা; কিন্তু আমাদের তো চাকরি করে খেতে হয়; নিয়মের মধ্যে চলি; বলে সবকিছু গোছগাছ করে রাখতে বলতেন দীপু। আপা সব ঠিক করে রাখতেন। তারা গিয়ে দেখতেন, কাজ করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তাদের গাইড হিসেবে কাজ করে এভাবে সামান্য কিছু রোজগার করে চলেছেন এই নারী। অথচ তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ছাত্রী। থাকতেনও খুব খারাপ অবস্থায়। প্রথমে বন বিভাগের বাড়িই ঠিকানা ছিল তার। সেটি তাদের সংসার ছিল। পরে জমানো সব টাকা দিয়ে মৌলভীবাজারেই বনের ওখানে একটি বাড়ি কিনলেন। সেটি আসলে পুরনো, মানুষের বাসের অযোগ্যই ছিল। কোনো টাকা-পয়সা ছিল না তানিয়া খানের। প্রাণীদের চর্চার কোনো বিদ্যাও শেখেননি ক্লাসরুমে। তবে ভালোবাসা ও বনের প্রতি মায়া তাকে করে তুলেছিল অনন্য। জীবনের একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত সেই ছোট্ট বাড়িটিই তার ঠিকানা ছিল। সেখানেই তার বিছানায়, বাড়িতে, ঘুমাত ওরা। থাকতও পরম মমতায়। সেটির নাম দিয়েছিলেন ‘সেইভ আওয়ার আনপ্রোটেকটেড লাইফ’ বা ‘আমাদের অনিরাপদ প্রাণীদের বাঁচান’, যেটি ‘সোল’ নামে বিখ্যাত। স্যাঁতসেঁতে সেই জায়গাটি ছিল একেবারে তাদের থাকার উপযোগী। কেবল ওড়া ঠেকাতে পাখিদের জন্য আলাদা করে একটি খুপড়ির খাঁচা করে নিয়েছিলেন। কোনো চিকিৎসা বিদ্যায় বিশ^াস করতেন না, প্রশিক্ষণও নেননি কোনোদিন। মুনীর আহমেদ খান ও বন্যপ্রাণী গবেষক নানা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের কাছে শিখে, নিজে ওদের ভুবনে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছেন, ভালোবাসা ও সামান্য যতœই তাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারে; অসুস্থ থেকে সুস্থ করতে পারে। ফলে তার এই সেবাকেন্দ্রটি তেমনই ছিল। জাতীয় উদ্যান ও আশপাশের এলাকার কোনো প্রাণী অসুস্থ হলেই হলো; তার কাছে দিয়ে যেতেন সেই এলাকার মানুষরা। এমনকি বন বিভাগও তার কাছে অনেক প্রাণী সুস্থ করে তোলার জন্য দিয়ে গেছে। বিভিন্ন বন থেকেও তার কাছে প্রাণীদের সুস্থ করে তোলার জন্য পাঠানো হতো। তিনি তাদের ভাঙা পা জোড়া দিয়েছেন, খাইয়েছেন মমতায়; কোনো কাটাছেঁড়া হলে সেখানে স্যাভলন লাগিয়ে দিয়েছেন। নিজের বিছানায় রেখেছেন। মা ও সন্তানের এই সম্পর্কই প্রাণীগুলোকে সুস্থ করে তুলেছে। বিনিময়ে কেউ কিছু দিলে তাই দিয়ে চলেছেন। বনে বনেও তিনি অসুস্থ প্রাণীদের খোঁজে ঘুরে বেড়াতেন। স্যাভলন, আয়োডিন, তুলো ইত্যাদিই তার উপকরণ। মনিরুল এইচ খান ও তার ছাত্র সীমান্ত দীপু একবাক্যে বললেন, তার মৃত্যুতে সেই অঞ্চলের বনের ও প্রাণীদের খুব ক্ষতি হয়ে গেল। একশ’র বেশি সফরে দীপুদের সঙ্গী হয়েছেন তিনি। সেসব খরচ দিয়ে শেষের দিকে চলেছেন। তারাও তাকে যা পেরেছেন টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন। আইইউসিএনের (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার)’র কর্মকর্তা সীমান্ত দীপুর শকুনের নিরাপদ অঞ্চল তৈরি ও তাদের বাঁচানো এবং প্রজননের প্রকল্পেও তিনি কাজ করেছেন। রেমা-কালেঙ্গাতে শকুনের আবাসে শকুনের বাসা সংরক্ষণ করেছেন। তাদের মলও পরিষ্কার করেছেন মমতায়। গবেষণার কাজেও সেগুলো লেগেছে। একবার একটি শকুনের ডানা ভেঙে গেল। বিরাট পাখিটিকে তানিয়ার সোলে দেওয়া হলো। তিনি একমাস ধরে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুললেন। শরীরে অপারেশন নয়, ভালোবাসা দিয়ে ভালো করেছেন। তবে আয়োডিন, পাখা বেঁধে দেওয়ার পরও পাখিটি ওড়ার ক্ষমতা হারাল। সোল থেকে নিয়ে রাত দুইটার দিকে বনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ডাকাতরা তাদের গাড়ি আক্রমণ করল। চালককে মেরে গাড়ি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করল। বনে চাবি ফেলে দেওয়ায় পারল না। দুইটি সাহায্যকারী ছেলে পালিয়ে বাঁচল। পরদিন গাড়ির বনেট থেকে শকুনকে উদ্ধার করে আনা হলো। হাঁটতে পারছে এই দেখে তানিয়া খুব খুশি। পাখি গোনাতে তার উৎসাহ খুব ছিল। হাতের তালুর মতোই চিনতেন সিলেটের বনগুলো। তাই শহরে ফিরতে পারেননি। তিনি ‘ট্রিজ পাম বাটিং বার্ড’ দ্বিতীয়বার রেকর্ড করেছেন। এই এলাকার আশপাশে থাকলেও ভবঘুরে এই পাখিটিকে এখানে প্রথম পেয়েছেন। হিল ব্লু ফ্লাইক্যাচার ত্রিপুরার বনে পাওয়া গেলেও প্রতি শীতে এখানে আসে বলে খবর আছে প্রাণী ও পাখিপ্রেমীদের। তবে তানিয়াই সিলেটে তাদের প্রথম পেয়েছেন সাতছড়িতে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বনে পাওয়া গেলেও ‘চিকিলা ফুলেরি’ নামের এক ধরনের কেঁচো, ব্যাঙের কাছাকাছি প্রাণী তিনি দুইবার লাউয়াছড়াতে পেয়েছেন। তবে মরা। এটি খুব বিরল প্রাণী। জীবনের বেশিরভাগ সময় মাটির নিচে থাকে। কেঁচোর মতো জীবন কাটালেও মা চিকিলা ডিম দিয়ে তাতে বসে। ছানা বের হয়ে মায়ের শরীরের চামড়া খেয়ে বাঁচে। পরে আবার মায়ের চামড়া জন্মায়। ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত বার্ড এশিয়ায় তার কয়েকটি লেখা প্রকাশ হয়েছে। তার মেয়ে মায়ের হয়ে ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন ২০১৯’ গ্রহণ করেছেন।