শুরুটা ২০০৩ সালে। শিশু একাডেমি আয়োজিত জাতীয় প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া দিয়ে সেই যে শুরু, দেশের ব্যাডমিন্টনে এখনো দাপটের সঙ্গে খেলে যাচ্ছেন শাপলা আক্তার। পাবনার মেয়ে। বৈবাহিক সূত্রে এখন বসবাস নারায়ণগঞ্জে। স্বামী ওয়াহেদুজ্জামান রাজু ছিলেন সাবেক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়। এখন কোচিংয়ের পাশাপাশি সাংগঠনিক কাজেও জড়িত। মূলত তার অনুপ্রেরণাতেই মেয়েদের ব্যাডমিন্টনে শাপলা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সেরার আসনে। গড়েছেন অনন্য রেকর্ড। তিনিই একমাত্র শাটলার, যার রয়েছে ছয়বার ট্রিপল ক্রাউন জয়ের
কৃতিত্ব। সম্প্রতি চট্টগ্রামে হয়ে যাওয়া জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে মেয়েদের সিঙ্গেলস, ডাবলস ও মিক্সড ডাবলসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ছয়বার ট্রিপল ক্রাউনের মধ্যে শেষ তিনটি আবার সর্বশেষ তিন আসরে। ব্যাডমিন্টন খেলে এই সুনাম কুড়ানো ছাড়া প্রাপ্তি জানতে চাইতেই শাপলার কণ্ঠ থমকে গেল, ‘কী আর পাব বলেন হতাশা ছাড়া?’
জুনিয়র পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর পর ২০০৬ সালে প্রথম সিনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন শাপলা। তখন বয়স মাত্র ১১। প্রথম বছর অল্পের জন্য জিততে পারেননি সিঙ্গেলসের স্বর্ণপদক। হেরে যান সে সময়ের চ্যাম্পিয়ন কনিকা রানী অধিকারীর কাছে। তবে পরের বছর সেই কনিকাকে হারিয়েই সিঙ্গেলসে শ্রেষ্ঠত্বের শুরু। ২০০৮ সালে প্রথম জেতেন ট্রিপল ক্রাউন। পরের বছর অর্থাৎ ২০১০ সালে এলিনা সুলতানার কাছে হেরে যান সিঙ্গেলসে। তবে ২০১১ ও ’১৩-তে ফের ট্রিপল ক্রাউন নিজের করে নেন শাপলা। ২০১৪-তে এলিনার কাছে সিঙ্গেলসে হারার পর ২০১৬, ’১৮ এবং চলতি বছর ট্রিপল ক্রাউন জিতে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান ২০১৩ বাংলাদেশ গেমসেও ট্রিপল ক্রাউন জেতা শাপলা।
‘প্রাপ্তি যদি কিছু বলেন সেটা ভালো খেলার আনন্দ আর কিছু মানুষের আন্তরিকতা। এর মধ্যে একটা বড় স্থান জুড়ে আছে সংবাদকর্মীদের সমর্থন। নইলে হয়তো অনেক আগেই খেলা ছেড়ে দিতাম। কারণ শাটলার হয়ে এখানে না পাওয়া যায় আর্থিক সুবিধা, না আছে উন্নত প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত খেলার সুযোগ। উল্টো খেলি বলে অনেকের কাছ থেকে শুনতে হয় কটূক্তি’Ñ বলেন শাপলা।
এ দেশে ব্যাডমিন্টন এলাকাভিত্তিক খেলাগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তার ওপরের দিকেই থাকে। শীতকালে পাড়া-মহল্লায় কোর্ট কেটে গভীর রাত পর্যন্ত চলে খেলা। যেখানে কেবল থাকে ছেলেদের খেলার সুযোগ। দেশের শীর্ষপর্যায়ের ছেলে শাটলাররা এ সময়ে বিভিন্ন জেলায় জেলায় টুর্নামেন্ট খেলে ভালো অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি নিজেদের ঝালাইও করে নেন। সে সুযোগটাও নেই মেয়েদের জন্য। ফেডারেশনের তত্ত্বাবধানে শহীদ তাজউদ্দীন ইনডোর স্টেডিয়ামে খ-কালীন প্রস্তুতিই মেয়েদের জন্য নিজেদের ঝালাই করার একমাত্র মাধ্যম। ফেডারেশনেরও খেলাটাকে এগিয়ে নিতে নেই তেমন কোনো উদ্যোগ। শাপলার কণ্ঠে তাই ফের হতাশা, ‘আসছে ডিসেম্বরে এসএ গেমস হবে, সেটাকে সামনে রেখে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নিতে দেখছি না। কবে থেকে প্রশিক্ষণ শুরু হবে, বিদেশি কোচ আসবে কি না, কিছুই জানি না। বিদেশে গিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা তো কল্পনাও করি না। আমি নিশ্চিত গতবারের ব্রোঞ্জপদক ধরে রাখাই হবে দুঃসাধ্য। কারণ নেপাল, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোও বছরব্যাপী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নিয়ে নিজেদের মান অনেক বাড়িয়ে নিয়েছে। এদের সঙ্গেই হয়তো এখন আর আমরা পেড়ে উঠব না।’
শুধু ব্যাডমিন্টনের শাপলা নয়, ক্রীড়াঙ্গনে কান পাতলে প্রায় প্রতিটি খেলাতেই শোনা যাবে মেয়ে ক্রীড়াবিদদের এই হাহাকার। তারপরও তারা খেলে যান অদম্য মনোবল এবং খেলাটির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকেই।