দেশের বন্যাপ্লাবিত জেলাগুলোতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে গেছে। বন্যা প্লাবিত ২০টি জেলায় ২ হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১১৯টি বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র ঘোষণা করে বন্যাদুর্গতদের ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৩ হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমি, অবকাঠামো, আসবাবপত্র ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের ব্যাপক ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাঠানো প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩২ কোটি টাকা। তবে, বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পুরো হিসাব করা সম্ভব বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। এই পরিস্থিতিতে বন্যাদুর্গত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা এবং স্কুল-কলেজগুলোর অবকাঠামো মেরামতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
বন্যার কারণে বিভিন্ন জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোত পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১৬টি জেলায় অন্তত ১ হাজার ২৯৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্কুল রয়েছে কুড়িগ্রাম জেলায়। কুড়িগ্রামের ১২টি উপজেলার ৫৪০টি স্কুলে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। গাইবান্ধা জেলার ৯টি উপজেলায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে ২৫৪টি স্কুলে। বাকি ১৪টি জেলার বিভিন্ন উপজলায় পাঠদান বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে আরও কয়েকশ বিদ্যালয়। তবে পানিবন্দি এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে এখনই ধারণা করা যাচ্ছে না। বন্যার পানি সরে গেলে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশনা দিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ।
মাউশির ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় বিভিন্ন জেলায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির একটি
প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে দেখা গেছে, সর্বমোট ১ হাজার ৫৫৭টি নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ৫৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামালপুরের। জেলাটিতে ৪০৮টি স্কুল-কলেজ বন্যাকবলিত হয়ে বন্ধ রয়েছে।
অবস্থাদৃষ্টে এটা প্রতীয়মান যে, বন্যার পানি সরে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো মেরামত করতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। তাই বন্যাদুর্গত এলাকার শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এসব এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে অবকাঠামো মেরামতের জন্য প্রয়োজন বিশেষ উদ্যোগের। লক্ষ রাখতে হবে যাতে অবকাঠামো মেরামতে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি না হয়। মেরামত কাজের জন্য এমনিতেই বন্যার কারণে পাঠদান বাধাগ্রস্ত হওয়া স্কুল-কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সময় নষ্ট না হয়।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নদী তীরবর্তী এবং চরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। তাই প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এমন এলাকাগুলোর বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে বিশেষ চিন্তাভাবনা প্রয়োজন। এসব এলাকায় প্রয়োজনে স্থায়ী ভবন নির্মাণের পরিবর্তে সহজে স্থানান্তর ও মেরামতযোগ্য অস্থায়ী ভবন তৈরি করা যেতে পারে। দেশের বিশেষজ্ঞ স্থপতিদের সহায়তা নিয়ে পরিকল্পিত নকশায় এসব এলাকায় উঁচু কাঠামোর ওপর এমনভাবে বিদ্যালয় ভবন তৈরি করা যেতে পারে যা সহসা বন্যার কারণে প্লাবিত হবে না।
বন্যা মোকাবিলা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। দেশের বিশেষ ভৌগোলিক পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এখানে অবকাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে এমন ভাবনা মাথায় রাখা হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিশেষ চিন্তা ও পরিকল্পনা প্রতিফলন দেশে বিরল। দেশের ঋতুবৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়টিকে আমলে নিয়েই এসব বিষয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্যানুসারে এবারের বন্যায় বিভিন্ন জেলায় এখন পর্যন্ত ১১৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। পানিবাহিত নানা অসুখে আক্রান্ত হয়েছে অগণিত মানুষ। বন্যা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তার পাশাপাশি বন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণের ক্ষয়ক্ষতিকে আমলে নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।