চার্জশিট প্রত্যাখ্যান করেছেন গাইবান্ধার সাঁওতালরা

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় রংপুর সুগার মিলস লিমিটেডের সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের জমি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ এবং ওই ঘটনায় পুলিশের উপর হামলা মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দিয়েছে গাইবান্ধা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তবে, চার্জশিটে প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ সাঁওতাল-বাঙালিরা।

রবিবার সকালে গোবিন্দগঞ্জ চৌকি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক পার্থ ভদ্রের আদালতে এই চার্জশিট জমা দেন গাইবান্ধা পিবিআই এর সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই সরকার।

গাইবান্ধা পিবিআই ও সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২ সালে আখ চাষের জন্য গোবিন্দগঞ্জের সাপমারা ও কাটাবাড়ী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মুসলমান ও সাঁওতালদের কাছ থেকে ১৮৪২.৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড। অধিগ্রহণ করা এই জমির নামকরণ করা হয় সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম। তখনকার সময় থেকে বাগদাফার্মের আশেপাশে বসবাস করে আসছে সাঁওতাল-বাঙালিরা। পরে আখ চাষের জন্য নেওয়া এই জমিতে অন্য ফসলের চাষাবাদ হলে শর্তভঙ্গের অভিযোগ তুলে সাঁওতাল-বাঙালিরা ২০০২ সাল থেকে জমি ফেরতের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করেন। ২০১৪ সালে তারা গঠন করেন সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি। এরপর চলতে থাকে সাঁওতাল-বাঙালিদের ভূমি উদ্ধারের বিভিন্ন কর্মসূচি।

২০১৬ সালের ১ জুলাই সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের প্রায় ১০০ একর জমিতে বসবাস শুরু করেন সাঁওতাল-বাঙালিরা। পরে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের জমি থেকে পুলিশ ও রংপুর সুগার মিল কর্তৃপক্ষ বলপূর্বক সাঁওতাল-বাঙালিদের উচ্ছেদ করতে গেলে শ্যামল হেমরম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামের তিন সাঁওতাল মারা যান। এ ঘটনায় আহত হন সাতজন সাঁওতাল এবং তীরবিদ্ধ হয়ে আহত হন আটজন পুলিশ সদস্য ও তিনজন পথচারী। পরে ১৬ নভেম্বর ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন সাঁওতাল স্বপন মুরমু।

এর কয়েক দিন পর গোবিন্দগঞ্জের তৎকালীন সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ, রংপুর সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আউয়াল ও সাপমারা ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আকন্দ বুলবুলসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে হাইকোর্টে অভিযোগ দায়ের করা আরেক সাঁওতাল থোমাস হেমরমের করা অভিযোগটি গোবিন্দগঞ্জ থানায় এজাহার হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

৬ নভেম্বর পুলিশ আহত হওয়ার ঘটনায় ওই দিনই এসআই শ্রী কল্যাণ চক্রবর্তী বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে এই মামলা দুইটি গাইবান্ধা পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। ঘটনার দীর্ঘ ২ বছর ৮ মাস ২২ দিন পর রবিবার ৯০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।

সাঁওতালদের মামলায় ৬ নভেম্বরের ওই ঘটনায় পুলিশ ২৫ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন গোবিন্দগঞ্জের সারাই গ্রামের শাহজাহান আলীর ছেলে মিঠু মিয়া (৩৮)। সাক্ষী দেন ২২০ জন ও মামলাটির তদন্ত করেন পাঁচজন।

অপরদিকে পুলিশের দায়ের করা মামলায় সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলীসহ ৪২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে আদালতে। তাদের মধ্যে শাহজাহানসহ তিনজন মৃত্যুবরণ করেছেন। এই মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বর্তমানে তারা জামিনে আছেন।

মামলা দুটি নিয়ে গাইবান্ধা পৌর এলাকার পলাশপাড়ায় দুপুরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পিবিআইয়ের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই সরকার।

তবে, এই চার্জশিটে প্রতিবাদে রবিবার বিকেল তিনটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কের গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন ক্ষুব্ধ সাঁওতাল-বাঙালিরা। পরে গোবিন্দগঞ্জের বর্তমান সাংসদ মনোয়ার হোসেন চৌধুরী, উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ আকন্দসহ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি গিয়ে তাদের পক্ষে থাকার আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেন।

সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৬ নভেম্বরের ঘটনায় আমাদের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। লুটপাট করা হয়। এই ঘটনায় আমাদের তিনজন মারা যান। তৎকালীন সাংসদ আবুল কালাম আজাদ, সুগার মিলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আউয়াল, তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং তৎকালীন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) নামীয় মূল আসামিদের বাদ দিয়ে চার্জশিট জমা দেওয়ায় আমরা মর্মাহত। সোমবার আমরা চার্জশিটে কপি তোলার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।

পিবিআইয়ের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, থোমাস হেমরমের এজাহারটি স্বপন মুরমুর মামলার সাথে যুক্ত করে একটি করা হয়। কারণ একটি ঘটনায় দুইটি মামলা হয় না। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকায় সাবেক সাংসদ আবুল কালাম আজাদ, রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আউয়াল এবং পুলিশের সংশ্লিষ্টতা না থাকায় তাদের চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।