বন্যার পানিতে রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে, তাই ভ্যান চালাতে পারছিলেন না টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থানার টেপিপাড়া গ্রামের মিনু মিয়া (২৮)। কামাই-রোজগারের আশায়, বেঁচে থাকার তাগিদে ভ্যান চালানো বাদ দিয়ে মাছ ধরবেন বলে ঠিক করলেন।
ঘরে থাকা পুরোনো জালটি ছিঁড়ে গেছে। তাই দরকার একটি নতুন জাল। নতুন জাল কিনতে গত ২১ জুলাই পাশের কালিহাতি থানার সয়াহাটে যান। পকেটে কিছু টাকা ছিল মিনু মিয়ার। এই টাকা নেয়ার উদ্দেশ্যে এক ছেলে তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেয়। মিনু মিয়া তাকে ধরে ফেলেন। তাৎক্ষণিক ওই ছেলে ‘ছেলেধরা’ বলে চিৎকার শুরু করে।
তার সাঙ্গপাঙ্গরা মিনু মিয়াকে মারধর শুরু করে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে নেয়া হয় কালিহাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখান থেকে ওই দিনই পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে টানা আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন মিনু মিয়া।
সোমবার সকাল ১০টায় ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের সহকারী ইনচার্জ এএসআই আবদুল্লাহ মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মিনু মিয়ার শ্যালক জাহাঙ্গীর আলম দেশর রূপান্তরকে জানান, মিনু মিয়ার বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলার টেপিপাড়া গ্রামে। তার বাবার নাম কুরবান আলী। মিনু মিয়ার স্ত্রী রিনা আক্তার পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। একমাত্র ছেলে রাহাতের বয়স সাত বছর। মিনু মিয়া পেশায় ভ্যানচালক।
জাহাঙ্গীর বলেন, ২১ জুলাই সকালে মিনু মাছ ধরার জন্য ঝাঁকি জাল কিনতে সয়াহাটে যায়। সে হাটে পকেট মারার সময় পকেটমারকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন মিনু মিয়া। ওই পকেটমার মিনু মিয়াকে ‘ছেলেধরা’ বলে চিৎকার শুরু করলে হাটের লোকজন মিনুকে বাছবিচার না করেই গণপিটুনি দেয়।
মিনু মিয়াকে পরিকল্পিতভাবে গণপিটুনির ঘটনায় টাঙ্গাইলের কালিহাতী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরো ১০ জনকে শনাক্ত করে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। তবে মূল যে আসামি তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কালিহাতী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিনু মিয়া পকেটমার ধরে ছিলেন কিংবা জাল কিনতে গিয়েছিলেন কি না এটা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে তাকে পেটানোর সময় ‘ছেলেধরা’ বলে পেটানোর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি আমরা। প্রথম যে ব্যক্তি ‘ছেলেধরা’ বলে চিৎকার শুরু করেছে তাকে আমরা এখনো গ্রেপ্তার করতে পারিনি। আমাদের তদন্ত অব্যাহত আছে। দায়ী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
‘পদ্মা সেতুর জন্য মাথা লাগবে’ এ রকম গুজবকে কেন্দ্র করে সারা দেশে গত দুই সপ্তাহে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছেন ৮ জন ও আহত হয়েছেন ১৫ জন। এসব ঘটনায় সারা দেশে ১০৩টি মামলা হয়েছে।