জীবনের পাশে জীবন

বন্যা হয়েছে অনেক জেলায়। তেমনই একটি গাইবান্ধায় পড়া ফেলে, বন্ধু, শিক্ষক, পথের মানুষের কাছে চেয়ে; সাহায্য তুলে দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্ল্ড লিংক আপ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা। তাদের হয়ে শাহীন আলমকে পুরো গল্প নিজের জবানে বলেছেন সভাপতি শাহদুদুজ্জামান শিশির। ছবি তুলেছেন রাসেল শিকদার

সেদিন বিকেলে টিউশনিতে ছিলাম। হঠাৎ ম্যাসেঞ্জারে টুং করে একটি শব্দ বেজে উঠল। ছাত্রের বই থেকে দৃষ্টি পড়ল সেলফোনে। হাতে নিয়ে ম্যাসেঞ্জারে ক্লিক করতেই চোখে পড়ল ‘আমরা কি অসহায় বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে পারি না? তাদের জন্য আমাদের আদৌ কি কিছু করার নেই?’ কথাগুলোতে চোখ আটকে গেল। লিখেছেন আমারই সদস্য নাজমুস সাকিব। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো অবশ্যই আমাদের অসহায়দের জন্য কিছু করা উচিত। কাজই তো আমাদের অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো। টেকসই উন্নয়ন (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনে আমরা কাজ করি, এসডিজির লক্ষ্যমাত্রার দুই নম্বর গোলটিই ‘ক্ষুধামুক্তি’; এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় বন্যাক্রান্ত মানুষের জন্য অবশ্যই আমাদের কিছু করতে হবে। ‘ওয়ার্ল্ড লিংকআপ’র সভাপতি হিসেবে আমার দায় অনেক। ফলে টিউশনি থেকে সোজা ক্যাম্পাসে এসে সেই রাতেই সদস্যদের নিয়ে আলোচনায় বসলাম। কীভাবে কী করা যায় ভেবে সবার আলোচনা হলো। শেষে উপদেষ্টা দর্শন বিভাগের প্রভাষক ইকরাম হোসাইনসহ অন্যদের ভাবনাগুলো জানালাম। তারা সাহায্য করতে পুরো রাজি। এতটুকু সময়ও নষ্ট করলাম না। সিদ্ধান্ত শেষে নেমে পড়লাম কাজে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের কয়েকটি ফার্মেসি থেকে ওষুধের খালি বিরাট বাক্স জোগাড় করলাম। বন্যার্তদের ত্রাণ দেব বলার পর দোকানদাররা খুশি হয়ে ভালো ভালো বাক্স খুঁজে দিলেন। এরপর লেখা হলো আবেদনপত্র। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদনপত্রগুলো জমা দিলাম। তারাও অনুমতি দিতে দেরি করলেন না। একযোগে শুরু হলো বিভাগগুলো থেকে টাকা সংগ্রহ। শিক্ষার্থীদের কাছে চাঁদা তোলায় খুব ভালো সাড়া পেয়েছি। শিক্ষকদের কাছেও যখন গিয়েছি, তারা আমাদের শুধু মানিব্যাগ থেকে টাকা দিয়েই সাহায্য করেননি, মানসিকভাবেও সাহস জুগিয়েছেন, অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। কয়েকজন শিক্ষক তো সঙ্গে গিয়ে বন্যার্তদের সাহায্যই করতে চাইলেন।

সব বিভাগের টাকা তোলার পর চিন্তা করলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও চাঁদা সংগ্রহ করতে যাওয়া উচিত। ফলে ব্যানার তৈরি করলাম ‘বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি’। যাতে মানুষের চোখে পড়ে আমাদের সাহায্যের আবেদন। রাজশাহী শহরের আলাদা কয়েকটি স্থান নির্বাচন করলাম, যেগুলোতে সবসময়ই মানুষ আসেন। সেগুলোতে টাকা তোলার জন্য কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে গেলাম আমরা। তবে এই কাজেও বাধা পেয়েছি। পদ্মা গার্ডেনে টাকা সংগ্রহের সময় স্থানীয় কয়েকজন যুবক বাধা দিয়েছেন। তারা জিজ্ঞেস করেছিলেন টাকা সংগ্রহের অনুমতি আছে? আমাদের সন্দেহ করে বেশ কিছুক্ষণ জেরা করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাদের বোঝাতে পেরেছি আমরা রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়েরই ছাত্রছাত্রী, মানবধর্মে অনুপ্রাণিত হয়েই এ কাজে বেরিয়েছি। এখানেই এসেছি প্রথম দিন।

পরদিন ব্যানার নিয়ে নগরের জিরো পয়েন্ট মোড়ে দাঁড়ালাম ২৫ জন। সেদিন আরও বাজে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। বুঝেছি ভালো কাজও খুব সহজে করা সম্ভব নয়। আমাদের সঙ্গে ১৫ জন নারী সদস্য ছিলেন। যখন তারা পথচলতি মানুষের কাছে টাকা দান করতে অনুরোধ করেছেন, কয়েকজন লোক সাহায্য না করে উল্টো নানা ধরনের বাজে কথা বলেছেন। তাদের বোঝাতে হয়েছে। পরে মনে হয়েছে, কত বিচিত্র মানুষের স্বভাব! সেদিন সবাই খুব হতাশ হয়েছি, কিন্তু অসহায় বানভাসি মানুষগুলোর ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠার পর ব্যথাগুলো ভুলেছি। আমরাও তো এই কাজে নতুন। আগে কোনোদিনও পথে দাঁড়িয়ে মানুষের জন্য টাকা সংগ্রহ করিনি। ফলে এমন অভিজ্ঞতা কোনোদিন হয়নি। মানুষের কাছে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আগ্রহ বলে পিছু ফিরে তাকালাম না। তৃতীয় দিন গেলাম রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে। প্রথমেই স্টেশন মাস্টারের কাছ থেকে মৌখিক অনুমতি নিতে হলো। এরপর প্লাটফর্মে বিভিন্ন জেলার ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করা যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ অভিযান শুরু হলো।

এখানে ঘটল মজার ঘটনা বাংলাদেশের সব রেলস্টেশনগুলোতে একেবারেই গরিব কিছু মানুষের বসবাস। তারা স্টেশনে আসা যাত্রীদের কাছ থেকে একটি, দুটি টাকা ভিক্ষা নিয়ে বেঁচে থাকেন, সংসার চালান। আমাদের টাকা কালেকশনের শুরুতেই তারা অবাক হয়ে চারপাশে ভিড় করলেন এবং জানার চেষ্টা করলেন আসলে কী করছি। পরে মনে করলেন, আমরাও তাদের মতো ভিক্ষুক। আমি নিজেই তো বাক্স নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এক ভিক্ষুক এসে জিজ্ঞেসই করে বসলেন, ‘তোমার টাকার কী দরকার? তোমাকে দেখে তো ভিখারী মনে হচ্ছে না।’ শুনে হাসি পেয়ে গেল। তাকে বোঝাতে হলো হাজার হাজার মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হয়ে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সাহায্য চাইছি আমরা সবার কাছে। এরপর তিনি মাথা নেড়ে সরে গেলেন। তার মুখ কোমল হয়ে উঠল। তবে আশার কথা, আমাদের জীবনের প্রাপ্তি বন্যার্তদের কথা শুনে একজন ভিক্ষুকও আমাদের টাকা দান করেছেন। তখন মনে পড়েছে, অনেকের টাকা আছে, কিন্তু তারা তো আমাদের দিকে ফিরেও তাকাননি। মানবিক মানুষ আরও দেখেছি আমরা। রাজশাহী রেলস্টেশনে ডিউটি করছিলেন এমন দুইজন পুলিশ কনস্টেবলের কাছে সাহায্যের জন্য গিয়েছিলাম। তারা হেসে বলেছিলেন, আমরাই বন্যার্ত। গ্রামের বাড়িতে এখন হাঁটুজল। ফলে মনগুলো আমাদের সবার আরও খারাপ হয়ে গেল। এমন নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে বন্যাকবলিতদের জন্য ত্রাণ জোগাড় করছি। তার মধ্যেই ঘটে গেল অন্যরকম ঘটনা। পুলিশের যে কাজÑ রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন পুলিশের একটি টহল দল আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। এসেই বললেন, আপনারা কারা? বললাম, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, গাইবান্ধার বন্যাকবলিতদের জন্য সাহায্য তুলছি। তারপরও তারা বিশ^াস করতে রাজি নন। তাতে খুব অবাক হলাম না। কারণ প্রতারণার, অসহায়দের ঠকানোর ইতিহাস তো এই দেশে বড় দীর্ঘ। তবে আমাদের কাছে বিশ^বিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র ছিল বলে রক্ষা পেলাম। তারা সেই পরিচয়পত্রগুলো দেখে নিশ্চিত হলেন এবং পরে আমাদের সঙ্গে থেকে টাকা সংগ্রহ করলেন। দয়ালু মন তাদের অনেক। স্টেশন মাস্টার এবং একজন ট্রেন চালক যতটুকু তাদের সামর্থ্য ছিল, সাহায্য করেছেন। আসলে মানুষের মন মরেনি।

এবার সাহায্য কেনার পালা। কয়েকজন বসে কী কী কেনা যায় আলাপ করে তালিকা করলাম। চলে গেলাম সাহেব বাজারে। তালিকা ধরে ধরে চাল, ডাল, চিঁড়া ও চিনি কিনলাম। যাতে এই মানুষগুলো বন্যায় থেকেও জীবন বাঁচাতে পারেন শুকনো খাবার খেয়ে। সবকিছু নিয়ে রিকশায় করে চলে এলাম আমাদের ঠিকানা নবাব আবদুল লতিফ হলে। হলের প্রভোস্ট ইকরাম স্যার আমাদের জন্য তার রুমটি খুলে দিলেন। সেখানে বসে গল্প হলো অনেক পরিশ্রমের পর। আড্ডা দিতে দিতেই আলাদা প্যাকেট করা হলো। সেগুলোর দিকে যখন তাকালাম, টানা শ্রমের পর এতটুকুও ক্লান্ত মনে হলো না নিজেদের। 

৩০ জুলাই ছয়জন বেরিয়ে গেলাম। একজন আরেকজনকে ডেকে তুলেছি, চা খেয়েছি; তারপরও ঘুমের রেশ কাটেনি। ভোর ৬টায় যাত্রা শুরু হলো। সঙ্গে ইকরাম স্যার আছেন। সব সাহায্য নিয়ে পকেটের পয়সায় মাইক্রোবাসে করে নামলাম গাইবান্ধায়। শহরেও বন্যা আছে। তবে কম। গ্রামগুলোতে পানি কমে কমেছে, তারা বললেন, কিন্তু এখনও বেশিরভাগ বাড়ি দেখলাম, পানির তলেই আছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুত দেওয়া যায়নি। রাস্তা-ঘাট তলিয়ে আছে। আমাদের নৌকা দেখেই দলে দলে লোক পিল পিল করে আসতে লাগলেন। পরে মনে হয়েছে, অন্তত শ’খানেক বানভাসি আমাদের কাছে আশ্রয় চেয়েছেন, বেঁচে থাকার খাবার খুঁজেছেন। তাদের মুখগুলো শুকনো, অনেকদিনের না খাওয়া; কপালে চিন্তার রেখা। অসহায় চেহারাগুলো দেখে বিচলিত হয়েছি। নিরুপায় চোখে সান্ত¡না ছাড়া আর কিছুই দিতে আমরা পারিনি। সাধ থাকলেও সাধ্য তো সীমিত। দুপুর ১২টায় নৌকায় এলাম গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার পোড়া গ্রামে। গরমে ও নৌকার যাত্রায় আমাদের দুইজন অসুস্থ হয়ে গেলেন। তাদের ফিরে যেতে বারবার বললেও, বানভাসিদের হাসি দেখতে তারা আকুল। অসুস্থতা নিয়েই তাই সঙ্গ দিলেন। আমরা পোড়া গ্রামের কয়েকজন গণ্যমান্যের সঙ্গে আগেই কথা বলে রেখেছি। বানভাসিদের মধ্যে নিতান্তই অসহায় হয়ে পড়াদের, খাবার জোগাড়েরও কোনো উপায় আর নেই, এমন অনেকের তালিকা তারা আমাদের জন্য আগেই তৈরি করে রেখেছিলেন। সেগুলো হাতে দিলেন।

যখন তারা ত্রাণ নিতে এলেন, এলোমেলো দাঁড়িয়ে। তাদের লাইনে দাঁড় করালাম। একে একে নাম ডেকে প্রত্যেকের হাতে প্যাকেট তুলে দিলাম। এক বৃদ্ধা প্যাকেট হাতে পেয়ে বলেছেন ‘তোমরা জীবনে অনেক বড় হও বাবা।’ পুরো গ্রামের একশ জনেরও বেশি মানুষকে সাহায্য করতে পেরেছি। আমাদের সাহায্যের পরিমাণ খুব যে বেশি ছিল, তা নয়। তবে আমাদের ইচ্ছাটুকু ছিল বানভাসিদের মুখে সামান্য হলেও হাসি ফোটাব। তাদের মলিন মুখগুলো ক্ষণিকের জন্য হলেও অমলিন করব। সেটি পেরেছি। তারা আমাদের বলেছেন, সামনে বন্যা হলেও আমাদের সাহায্য করতে আসবেন। শুনে সবার মন খারাপ হয়েছে। সন্ধ্যায় ফিরতে হয়েছে আপন ঠিকানায়।

এই পুরো কাজে সবসময় সাহায্য করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক লায়লা আরজুমান্দ বানু, ফার্মেসির শিক্ষক আজিজুর রহমান, অর্থনীতির আবদুর রশীদ সরকার, দর্শনের জাহিদুল ইসলাম ও ইকরাম হোসাইন। আমাদের ওয়ার্ল্ড লিংকআপের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহ নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন।

পুরো কাজে ওয়ার্ল্ড লিংকআপ দলে ছিলেন সদস্য নিশাত খন্দকার, আফসানা মাহমুদ, ফিরোজ হোসেন, মেহেদী হাসান, সাহাবুল ইসলাম, সাইদুর রহমান, সাগর হোসেন, শামীম, সুমাইয়া, মোস্তাকিম, হামিদ, রাহী, সালমান, বন্যা, তানভীর, সিফাত, শাওন, মিমি, শিকদার, ঐশী, ইভু, জেমি, সমাপ্তি, সূচি, বন্ধন, ইতি, সাদিয়া, টুম্পা, রুবাইয়া, মিনাক্ষী ও আজাদ।