ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ভাষা ও সম্পদ সুরক্ষিত নয় বলে অভিযোগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমা। তিনি বলেন, সমতলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা অস্থিরতার মধ্যে আছে। আর পার্বত্য চট্টগ্রামে এক অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।
সোমবার ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে সন্তু লারমা এসব বলেন। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘ভাষাকেন্দ্রিক, আদিবাসী ভাষাচর্চা ও সংরক্ষণ’।
সন্তু লারমা বললে, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ভবিতব্য কী, তা অজানা। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের জীবনে কোন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে, তা জানি না।
অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক শক্তির একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িকতা, জাতি-বিদ্বেষ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের জীবনকে গ্রাস করে ফেলছে।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ৯ আগস্ট। এর কদিন পরেই এবার ঈদুল আজহা। তাই এ বছর দিবসটির কেন্দ্রীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হলো চার দিন আগেই। দিনটি পালন উপলক্ষে বরাবরের মতো নিজ নিজ জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নানা বয়সী নারী-পুরুষের সমাগম হয়েছিল শহীদ মিনার। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ছাত্র, যুব ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা ব্যানার ও প্লাকার্ড নিয়ে হাজির হয়েছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, পাহাড়ে-সমতলে নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সার্বক্ষণিক ভীতির আবহ বিরাজ করছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন অনেকাংশে হলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। এ চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে পাহাড়ে শান্তি আসবে না।
তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিরাপত্তার জন্য হুমকি—এমনটাই শাসক চক্রকে বুঝিয়েছে আমলাতন্ত্র। এ ধারণা অমূলক, বিভ্রান্তিকর, অযৌক্তিক। তবে এখন বাংলাদেশে আর কোনো যুক্তি খাটে না।
অনুষ্ঠানে সাবেক মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ২৫ বছরের সংঘাতের পর পার্বত্য চুক্তি শেখ হাসিনার দূরদর্শিতার নিদর্শন। কিন্তু এর পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়াটা লজ্জার বিষয়।
মেনন বলেন, ‘সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান চর থেকে নদীভাঙা মানুষকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করেছিলেন। এইচ এম এরশাদের সময় এ ধারাবাহিকতা ছিল। এরা এসব মানুষকে পাহাড়িদের বিরুদ্ধে সংঘাতে ঠেলে দিয়েছে। তবে আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে জিয়া ও এরশাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বলবৎ আছে।’
‘আদিবাসী দিবস’ জাতীয়ভাবে পালন না করার জন্য সমালোচনা করে মেনন বলেন, ‘এখন দিনটি পালনে নানা বাধা আসে। ফোন করে, সার্কুলার দিয়ে দিবস পালনে বাধা দেওয়া হয়।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ছিল এটাই যে, কোনো জাতি অন্য জাতির ওপর শোষণ করবে না, নিপীড়ন করবে না। কিন্তু সেই আদর্শ আজ বিচ্যুত। আমরা এখন নৃগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার নতুন করে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। শোষণ আজও চলছে।’
দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে স্বাগত বক্তব্য দেন আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। তিনি বলেন, ‘এ দিবসে আমরা অধিকারের কথা বলি। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার কথা বলি।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডালেম চন্দ্র বর্মন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম প্রমুখ।