পানির অভাবে জাগ দেওয়া যাচ্ছে না পাট, আমন চাষাবাদ ব্যাহত

‘আল্লায় যেন গজব দিয়িছে, আষাঢ় মাস শেষ হতি গেলো পানি হচ্ছে না। খাল বিলি এক ছটাকও পানি নেই যে সেখানে পাট জাগ দেবো। মহাজনের কাছে সুদির টেকায় ঋণ নিয়ি ১৫ কাটা জমিতে পাট চাষ করিলাম। এখন মাটের পাট নিয়ি চিন্তায় ঘুমিতে পারছি না।’

মাঠের পাট নিয়ে এভাবেই নিজের দুর্ভোগের কথা বলছিলেন চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক ইন্তাজ মণ্ডল। শুধু এই ইন্তাজ মণ্ডল নয় চলতি বছর পাট নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তার মতো হাজারও কৃষক। পানির অভাবে তারা সবাই পাট জাগ দিতে পারছেন না। এমন দুর্ভোগে পড়ে অনেকের রাতের ঘুম হারাম হওয়ার অবস্থা।

দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিলেও বৃষ্টি নেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গায়। ভরা বর্ষাতেও বৃষ্টি না হওয়াতে জেলার নালা, খাল-বিল ও পুকুরগুলোও ফেটে চৌচির অবস্থা। আর এতে করে জেলার কয়েক হাজার পাটচাষি পড়েছেন চরম বিপাকে। পানির অভাবে তারা পাট জাগ দিতে পারছেন না। পানি না পেয়ে অনেক কৃষকই খেতেই শুকাতে বাধ্য হচ্ছেন সোনালি আঁশখ্যাত স্বপ্নের ফসল। এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন কৃষকরা।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গার মাটি ও আবহাওয়া পাট চাষের জন্য খুবই উপযোগী। প্রতি বছর এ জেলার কৃষকরা অন্য ফসলের মতোই পাট চাষ করে থাকেন। গত বছরের মতো বাজার দর ভালো হওয়ায় চলতি বছরও পাট চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন পাটচাষিরা। কৃষি অফিসের তথ্য মতে, চলতি বছর জেলার চারটি উপজেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমি। কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে পাটের আবাদ হয়েছে ১৫ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলাতে আবাদ হয়েছে ৫৯০ হেক্টর, দামুড়হুদা উপজেলাতে ৬ হাজার ২৮৫ হেক্টর, আলমডাঙ্গা উপজেলাতে ৬ হাজার ২০০ হেক্টর ও জীবননগর উপজেলাতে ২ হাজার ১৫০ হেক্টর।

জেলার চারটি উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ বিস্তীর্ণ পাটের ক্ষেত। বাতাসে মৃদু দোলে দুলছে পাট গাছ। আলমডাঙ্গা ও দামুড়হুদা উপজেলার কয়েকটি মাঠের চিত্র বলছে বেশ আগেই পাট কাটার সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু পাট না কাটাতে অনেকটা বিবর্ণ হয়ে গেছে পাটের চেহারা।

কথা হয় আলমডাঙ্গা উপজেলার বড় গাংনী গ্রামের কৃষক আব্বাস আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে আমরা পাট চাষ করে আসছি। গত বছরের মতো ভালো লাভের আশায় এবারও ৫ বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছিলেন তিনি। বিস্তীর্ণ ক্ষেতের সবুজ পাতা স্বপ্ন দেখাচ্ছিল সোনালি আঁশ ঘরে তোলার। কিন্তু তা বিধিবাম। বৃষ্টির দেখা নেই কোথাও। পাট জাগ দিতে পারছি না।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সুফি রফিকুজ্জামান বলেন, বৃষ্টির অভাবে সঠিক সময়ে পাট পচাতে না পারলে কিছুটা ফলন বিপর্যয় হতে পারে। তবে কৃষি বিভাগ কৃষকদের বিকল্প উপায়ে পাট পচানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এ জন্য রেবন রেটিং প্রদ্ধতিসহ পুকুর ও ডোবা-নালাগুলোতে সেচের পানিতে ভরাট করে পাট পচানোর জন্য কৃষকদের বলা হচ্ছে।

রাঙ্গুনিয়ায় আমন চাষাবাদ ব্যাহত

কাক্সিক্ষত বৃষ্টিপাতের অভাবে রাঙ্গুনিয়ায় চলতি মৌসুমের আমন চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পানি সেচের অভাবে বিলে কৃষিকাজ চলছে না। ভরা মৌসুমে এসে প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় আমন চাষাবাদে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। থমকে গেছে কৃষির কর্মতৎপরতা।  এ অবস্থায় রাঙ্গুনিয়ায় চলতি আমন চাষাবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কৃষকের মধ্যে নেমে এসেছে হতাশা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দিগন্ত বিস্তৃত গুমাই বিলে চাষাবাদের জন্য সেচের পানি নেই। চাষাবাদ করতে পারছেন না কৃষক। বিক্ষিপ্তভাবে কোথাও কিছু জমিতে রোপা দেওয়া হলেও বৃষ্টি না হওয়ায় শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। তবুও বৃষ্টির আশায় কোথাও কোনো কৃষক মাটি কেটে আইল বেঁধে জমিতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

বিলের কৃষক চন্দ্রঘোনা পাঠানপাড়া গ্রামের আবদুল ছালাম বলেন, বর্ষার বৃষ্টির পানিতেই আমন চাষাবাদ সেচ নির্ভর। কিন্তু বর্ষায় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় চাষাবাদ পিছিয়ে যাচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কারিমা আকতার বলেন, অনেকে কৃত্রিম পানি সেচ ব্যবস্থায় জমিতে রোপা লাগাচ্ছেন।