লজ্জা কাটিয়ে লক্ষ্য জয়

এই দেশের সুবিধাহীন, গরিব মানুষদের আয়, শিক্ষা ও উন্নত জীবনের খোঁজ দিতে বর্ডারলেস জাপান করপোরেশন সামাজিক উদ্যোক্তা ব্যবসা করছে। তাদের মাধ্যমে সাড়ে সাতশ মানুষের জীবন বদলে যাচ্ছে। তাদের বাংলাদেশ প্রধান সামাজিক উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচাল মোহাম্মদ ফারুক হোসেনকে ঘিরে দারুণ সে গল্প লিখেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন অপু সরকার

 

 

বলার মতো জাপানি ভাষা শিখে ২০০৫ সালে চলে গেলেন জাপানে। কৃষক বাবা ও জাপানে এক সময় থাকা বড় ভাই কামাল হোসেনের কাছ থেকে আট লাখ টাকার টিউশন ফি নিতে হলো। মোহাম্মদ ফারুক হোসেন টোকিওতে পা রেখে ভাবলেন, মাস্টার্সে ভর্তি হবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের (ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ) ভাষা বিজ্ঞান বিভাগে অনার্স করেছেন। প্রথমে ইউনোগাকুইন ভাষা শেখার স্কুলে ভাষা শিখলেন। এরপর চুওউহোউরিতসু সেনমন গাককো নামের এক ডিপ্লোমা স্কুলে আইটি বিজনেসে (আইবি) ভর্তি হলেন। পাশ করে সরকারি বিশ^বিদ্যালয় চিবা ইউানভার্সিটিতে রিসার্চ স্টুডেন্ট হিসেবে ভর্তি হলেন। থেকে, খেয়ে, লেখাপড়ার খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই। কাজকে জাপানিরা অসম্মান করে না দেখে খুশি মনে রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের কাজ নিলেন। প্লেট ধোয়া, মোছা; খদ্দেরদের খাবার তৈরি করতেন। যেদিন ক্লাস থাকত না, টিকে থাকতে ১৫ ঘণ্টাও কাজ করেছেন। শুক্রবার ক্লাস করে বিকেল ৪টায় ওয়েটার রুমে ঢুকতেন, টানা কাজ করতেন। বেরুতেন পরদিন ভোর ৬টায়। খেয়ে, গোসল সেরে ঘুমিয়ে শনিবার বিকেল ৩টায় পা পড়ত সে ঘরে, পরদিন সকাল ৬টায় বেরুতেন। দুটি ছুটির দিন বাদে অন্যদিনে বিকোল ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করতেন। রাতে ক্লান্ত হয়ে ফিরে রান্না, খাওয়া, গোসল, বিশ্রাম সেরে ঘুমাতে রাত ২টা-৩টা। সকাল ৬টায় বিশ^বিদ্যালয়ে ক্লাস করতে ছুটতেন। ক্লাসের ফাঁকে কী রেস্তোরাঁয় আসার পথে বাসে অল্প, বিস্তর পড়তেন। ছাত্র ভালো, মেধাবী বলে টিকেছেন, ভালো করেছেন। তখন আমাদের দিনে ৭শ টাকা রোজগারে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। তবে স্বীকার করলেন শুরুতে দেশের ছাত্রের অভ্যাসে, সকালে ঠিক মতো কাজে যেতে পারেননি। ঘড়ির সঙ্গে ছোটা দেশটির মানুষের সঙ্গে তাল মেলাতে তো অন্যথার উপায় তো নেই। ফলে কর্মী ছাঁটাইয়ের শিকার হয়ে ২০০৬ সালে সবেধন চাকরিটি হারাতে হলো। তখন পাশে দাঁড়ালেন দেশেরই ভাই। বড় মানিক ভাই বলেছিলেন, ‘ঘর ভাড়ার টাকা জোগাড় কর, আয় বাড়লে বাকি টাকা ফেরত দিও।’ পরে আরেক দেশি বড় ভাই তাকে আরেক রেস্তোরাঁতে কাজ জোগাড় করে দিলেন। পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা কাজ করতে হতো। যেখানে প্লেট ধোয়া হয়, সিঙ্কের মধ্যে হাত ডোবালে আর বের করার উপায়ই ছিল না। খুব চালু, জনবহুল এলাকার রেস্তোরাঁটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ছিল বলে খাবারের মান খুব ভালো ছিল। ঘাড় নিচু করে কাজ করতে করতে প্রায় কুঁজো হয়ে গিয়েছিলেন, হাত দুটি মোজা পরার পরও একেবারে সাদা হয়ে গিয়েছিল; ফলে দিনগুলো ফারুকের তখন খুব কষ্টে কেটেছে। অনেকবার ভেবেছেন, ‘বাবা বেঁচে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা তো বসে থাকে না। দেশে গিয়ে কিছু করে খাব।’ পরক্ষণেই ভেবেছেন, ‘বাবার চোখের পানি, মায়ের কান্না, বন্ধুদের দারুণ সঙ্গ ফেলে চলে এসেছি আরও ভালো ভবিষ্যতের জন্য; তাহলে অবস্থান তৈরি করেই ফিরব।’ জাপানের মানুষের কাছ থেকে শিখেছেনÑপারি না কথাটি কোনোদিন, কোনোভাবেই, কোনো অবস্থাতেই তারা বলেন না। সময়কে মূল্য দেন জীবনে উন্নতির অন্যতম প্রধান শর্ত মেনে। এতদিনে সেটি গেড়ে বসেছে তার মনেও। তার সঙ্গে টোকিও বিশ^বিদ্যালয়ের এক ছাত্র একই কাজ করতেন। তাকে তিনি কিছু না বলেও লজ্জায় ফেলে ছিলেন। বিশ^খ্যাত বিশ^বিদ্যালয়, এ দেশের মানুষ হয়ে তিনি কাজটি করতে পারলে আমি কেন পারব না, নিজেকে বারবার বলেছেন ফারুক। ওরা এমনই, যেকোনো কাজে, যে কেউ হাত লাগায়। লজ্জা, কাজের প্রতি ঘৃণা তাদের কারোর নেই।

তারপরও রোস্তারাঁটি থেকে আরও ভালো প্রতিষ্ঠানে, লেখাপড়া ও বেঁচে থাকার জন্য সময় বের করতে চলে যেতে চাচ্ছিলেন। পেলেন ওয়াতামি রেস্তোরার ঠিকানা। এটি চেইন ব্যবসা ছিল। তাদের এক রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরি, প্লেট ধোয়া থেকে সব কাজ করতে হতো বিকেল থেকে। রাত ১০টার পর আয় দেড়গুণ, রাত ১২টার পর দ্বিগুণ শ্রমের দাম পেতেন। এ দেশের মানুষরা শ্রমের মূল্য দিয়ে অভ্যস্ত। ফলে মাসে আমাদের টাকায় লাখ খানেক পেতেন তখন। ভালো এই চাকরিটি করেছেন ২০০৭ থেকে টানা চার বছর। তবে থাকা-খাওয়ার বেজায় খরচ জাপানে। ফলে আমাদের চোখে সুখের এই দিনগুলোতে জীবন ও অভাবের সঙ্গে নিয়ত যুদ্ধ করা ফারুককে আইটি বিজনেসের লেখাপড়া ছাড়তে হলো। বছরে সাত থেকে আট লাখ টাকা টিউশন ফি দিতে হয়। গবেষণাগারেও অনেক সময় দিতে হয়। তাই সময় ও টাকা থাকে না তার। বাড়ি থেকে নেবেন যে সে উপায়ও নেই। ফলে পুরনো ভালোবাসার পড়ালেখার দিকে চলে এলেন তিনি চিবা বিশ^বিদ্যালয়ে। ২০১০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা বা প্রাইমারি এডুকেশনের ওপর রিসার্চ বা গবেষক ছাত্র হিসেবে ভর্তি হলেন। ততদিনে নিজেকেও গুছিয়ে এনেছেন। ৯৫ শতাংশেরও বেশি শ্রেণিকক্ষে  উপস্থিতি তাকে লেখাপড়ার খরচ ছাড়ও দিল। তাতে খরচ পড়ল বছরে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। এত কষ্ট কীভাবে করেছেন? ফর্সা, হাসিখুশি, চুপচাপ, লম্বা তরুণটি হাসিমুখে বললেনÑ ‘জাপানে আসার পর নিজেকে এভাবে বদলে নিয়েছি। আমরা চাঁদপুরের মানুষ; বাবা কৃষক ছিলেন। বড় ভাই মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন জাপানে ভাষা শিখে কাজ করতে আসার পর আমাদের ভাগ্য বদলে গেল। তিনি সারা বিশে^র অর্থনৈতিক মন্দা ও জাপানিদের অতিরিক্ত প্রযুক্তি প্রীতিতে কাজ ছেড়ে দেশে ফিরে এলে সংসার আবার পড়ে গেল। তাই কাজ ও জাপানে অবস্থান তৈরি করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।’ তার তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক খাতাওকা ছাত্রটিকে খুব ভালোবাসতেন। তাকে নানাভাবে সুবিধা করে দিতেন। তারপরও সেখানে তাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, মাঠ গবেষণায় দুপুরের পর থাকতে হতো। কিন্তু একটু পরে তো আবার পেটের দায়ে বেরিয়ে পড়তে হতো। ফলে কোনোভাবেই লেখাপড়া ও জীবন মেলাতে পারছিলেন না।

এই দুঃসময়ে দারুণ একটি সুযোগ এলে দিলেন বড় ভাই কামাল হোসেন। তিনি আবার এই দেশে কাজ করতে এসেছিলেন। ভাইকে বললেন, ‘এই ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে যাবেন। ইংরেজিতে তো তারা কথা বলেন না, পারেনও না। ভাষা অনুবাদক হিসেবে তাদের দেশ ঘুরিয়ে দেখাবে। তারা আলাপ করবেন, ঘুরে দেখবেন এই দেশের গরিবদের জন্য কোনো কাজ করতে পারেন কি না?’ ফারুককে অনেক কষ্টে সবগুলো কাজই তাদের চাহিদা অনুসারে সুবিধাবঞ্চিতদের নিয়ে করা হয়েছেÑ খুঁজে খুঁজে বের করতে হয়েছে আগেই। ‘বর্ডারলেস জাপান করপোরেশন’ নামের একটি সামাজিক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের তিন কর্তা চেয়ারম্যান খাজুনারি তাগুচি, সুজুকু এবং নাকামুরাকে ছুটিতে বাংলাদেশে থাকা ফারুক ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানালেন।

পঞ্চগড়ের বোদা থানায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের একটি গ্রামীণ উদ্যোগ, দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের গ্রামীণ উদ্যোগ ও ঢাকায় সরকারি বিসিকের (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) হস্তশিল্পীদের নিয়ে নানা কার্যক্রম ঘুরে ঘুরে দেখলেন তারা। অনেক প্রশ্ন, এই দেশের গরিব মানুষদের ভাগ্য কী কী সামাজিক ও আর্থিক কাজের মাধ্যমে বদলানো যাবে জানতে চাইলেন। সব প্রশ্নের জবাব তাদের হয়ে করতে হলো; উত্তর সাজিয়ে, গুছিয়ে তুলে দিতে হলো বর্ডালেস জাপানের তিন প্রধানের কাছে। ফারুকের সঙ্গে তাদের মনের মিল তখন হয়ে গেল। তিনিও তো এমন একজনই। বোঝার বয়স থেকে যাদের বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন নে বয়স্ক ভিক্ষুক, যাদের কাজের কোনো সামর্থ্য নেই তাদের পকেট খরচ থেকে টাকা দেন। শিশুদের কোনোদিন টাকা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেন না। খাবার বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস সামর্থ্য অনুযায়ী কিনে দেন। পরে আলাপ চলতে চলতে বর্ডারলেস জাপান করপোরেশন সম্পর্কে, এটির প্রধান সম্পর্কেও ভালোভাবে জানালেন। তাগুচি ছাত্রজীবনে ভারতে শিক্ষা সফরে এসেছিলেন। তাদের বস্তিতে ঘুরতে নেওয়া হয়েছিল। পা নেই এমন একজন পঙ্গু যুবক জীবনের জ¦ালা সইতে না পেরে, ব্যর্থতা ও বাঁচার আকুতিতে তাকে জাপানে নিয়ে যাওয়ার জন্য পা জড়িয়ে ধরেছিলেন। কোনোভাবেই অন্যের কাছে ছোট হওয়া যাবে নাÑ স্বদেশবোধটি তার সেদিন ভেঙেচুরে গিয়েছিল। মানুষ এত কষ্টে, নোংরায় জীবন যাপন করেন দীর্ঘদিন কষ্ট, ব্যথাগুলো তাকে তাড়িয়েছে। জীবন এত নির্মমÑ বেদনার এই স্মৃতিগুলো তিনি ভুলতে পারেননি। অনেক ভেবে বুঝেছেন, তাদের সমস্যার সমাধান খাবার বিলিয়ে হবে না। তাদের জন্য এমন কোনো কাজ করতে হবে, যাতে তারা ভালোভাবে বাঁচতে, স্বপ্ন দেখতে পারেন। ফলে যাদের কোনো উপায় নেই তাদের জন্য জীবনটাকে উৎসর্গ করলেন কাজুনারি তাগুচি। তার দেশের একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে যোগ দিলেন কীভাবে কাজ করা হয় সেই প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ও টাকা জমাতে। ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা জমিয়েছেন এরপর অনেক কষ্টে। রাতের পর রাত রেস্তোরাঁতে বসে, দাঁড়িয়ে কাজ করেছেন। টাকা খরচ হবে বলে সঞ্চয় করতে পার্কের বেঞ্চে ঘুমিয়েছেন। অবশেষে ‘শেয়ার হাউজ’ নামের বাড়ি ভাড়ার প্রকল্প শুরু করেছেন। জাপানে বাড়ি ভাড়ার খরচ অনেক। বিদেশ থেকে প্রচুর ছাত্রছাত্রী এদেশে পড়তে, অনেকে কাজের খোঁজে আসেন। তবে থাকার জায়গা তাদের এই দ্বীপ দেশে খুব কম। মানুষও তারা অনেক। জাপানে বিদেশীরা বাড়ি ভাড়া নিতে হলে সেই দেশের কোনো নাগরিকের নিশ্চয়তাপত্র পুলিশের কাছে জমা দিতে হয়। ফলে নতুন পা রাখা কেউ গ্যারান্টার বা নিশ্চয়তা দেবার মতো কাউকে না পেয়ে সহজে বাড়ি ভাড়া নিতে পারেন না। গ্যারান্টারের সমস্যা সমাধান, কম টাকায় ভাড়া পাওয়ার জন্য তিনি শেয়ার হাউজের শুরু করেছিলেন। যাতে নানা দেশের অধিবাসীরা কম টাকায় জাপানি ছাত্রদের সঙ্গে থাকতে পারেন। তাদের মধ্যে অভিজ্ঞতার বিনিময় হবে, আবার থাকার জায়গার অভাবও মিটবে। কয়েক বছরের মধ্যে তারা এভাবে নানা দেশের স্থানীয় ছাত্রদের সঙ্গে বাড়ি ভাড়ার এই ভাবনাটির বাস্তবায়ন করেছেন। বাড়িগুলোতে হাজার, দেড় হাজার ছাত্রছাত্রী থাকছেন। তাদের বর্ডারলেস জাপান করপোরেশন তারপর সেই টাকায় নানা দেশে সামাজিক সমস্যার সমাধান সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে করতে ছড়িয়েছেন। এখন লাভজনকভাবে বিশ্বের ১২টি দেশে আছে তাদের সামাজিক উদ্যোগ ব্যবসা।

ফারুকের বিনয়ী আচরণ, জাপানের কৃষ্টি-কালচার, তাদের প্রতি ভালোবাসা এবং তার দেশের নারী, পুরুষ ও নানা প্রতিবন্ধিতার শিকার মানুষদের সমস্যাগুলো দেখে এই দেশে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। তাকে বলেই ফেললেন প্রতিষ্ঠান প্রধান, ‘তোমাকে টাকা লগ্নি করা হলে কী করবে?’ বিন্দুমাত্র না ভেবে ফারুক উত্তর দিলেন, ‘আমি আমার দেশের না খেয়ে থাকা মানুষদের ভালো রাখার জন্য জীবন বাজি রাখব।’ ফলে ২০০৯ সালের নভেম্বরে তিনি বর্ডারলেস জাপান করপোরেশনের স্থায়ী কর্মী হিসেবে যোগ দিলেন। জাপানে দুই মাস থাকতে হলো। ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নানা গবেষণা করে তৈরি করতে হলো। পরে তাকে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মোট ২ কোটি টাকার উদ্যোক্তা পুঁজি দফায় দফায় দেওয়া হলো। তবে তার প্রতিষ্ঠানের সব শেয়ারের মালিক বর্ডারলেস জাপান করপোরেশন, তাদের নিয়মানুসারেই। তারা সবাই, চেয়ারম্যানও বেতন পাওয়া কর্মচারী, লাভের ভাগ পান না।

প্রাথমিক বিনিয়োগ পাওয়ার পর কাজে নেমে পড়লেন নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন দেখা যুবক।

আগেরবার এসেছিলেন বলে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার শম্ভুগাঁও, পঞ্চগড়ের বোদা থানার এক গ্রাম ঘুরে ঘুরে অসহায়, সংসার-জীবন চালাতে না পারা নারীদের জড় করলেন, তাদের বাঁচার উপায় তখন তেমন নেই। কারও স্বামী মারা গেছেন, কারও অভাব চরমে, কারো স্বামী ছেড়ে চলে গেছেন। মোট ৪০ জন নারীকে ঘুরে ঘুরে একসঙ্গে করলেন ফারুক হোসেন। মৌ বাক্স, মৌমাছি, ফুল গাছ মাড়াই যন্ত্র প্রতিষ্ঠানের হয়ে কিনে বিনা খরচে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিনা মূল্যে বিলি করলেন। তাদের বাড়ির আঙিনায়, আশপাশে মৌমাছি চাষ করে মধু সংগ্রহে উদ্বুদ্ধ করলেন। লোকাল বাসে ঘুরে ঘুরে জেলাগুলোর প্রত্যন্ত এলাকায় যেতে হলো তাকে। তবে তার প্রথম ব্যবসাটি নানা কারণে খুব সফল হলো না। একে তো মৌমাছির চাষ শীতকাল ছাড়া অন্য সময়গুলোতে চালানো খুব কঠিন; শীতে ফুলের মৌসুম; চারদিকের সরিষা, নানা ফুলের জন্ম হয়; মৌমাছিরা ঘুরে ঘুরে মধু খেয়ে মৌবাক্সে এসে বসে। তখন মধু বিক্রি করে তাদের বেশ আয় হয়, কিন্তু বছরের অন্য মৌসুমগুলোতে তাদের কোনো আয় থাকে না। মৌমাছিগুলোকে তো সবসময় খাবার দিতেই হয়। সেই খরচও আছে। ফলে তার উপলব্ধি হল এভাবে গ্রামের অভাবী নারীদের আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়ন ব্যাপকভাবে করা সম্ভব নয়। ফলে তাদের সঙ্গে আলোচনার পর ঠিক হলো, বিদেশী জাতের মৌমাছি চাষ করবেন, যাতে অনেক মধু মিলবে। এক ফুলের মধু শেষ হলে আরেক ফুলে মৌ বাক্স নিয়ে যাবেন। যেমন লিচুর মৌসুম শেষ হলে সরিষা ফুলের মধু আহরণের জন্য বাক্সগুলো তারা নিয়ে গিয়েছেন। তবে গ্রামের মা, মেয়েরা মধুর জন্য রাতে বিভিন্ন ফসলের মাঠে থাকতে পারেন না, চাষও করতে পারেন না। আবার সমস্যা হল তাদের পরিবারের পুরুষরা মধু আহরণ করতে চাইলেও তাতে মাসে মাসে সংসার চলে না। সেই খরচ তো মৌমাছি তুলে দিতে পারে না। ফলে অনেক মানুষের ভাগ্য ও জীবন বদলের স্বপ্নটি পূরণ হলো না ফারুকের। অনেক খুঁজেও নতুন কোনো ভাবনা না পেয়ে জাপানে গেলেন এবং বর্ডারলেস জাপানের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন। তাকে বিনয়ের সঙ্গে জানালেন, ‘এভাবে হচ্ছে না। ভালো ভাবনাও পাচ্ছি না। বসে বসে বেতন নিতেও বাঁধছে। ফলে চাকরিটি ছাড়তে চাই। নতুন কোনো ভাবনা পেলে আবার আসব।’ তবে উদ্যমী তরুণকে ছাড়তে নারাজ তাগুচি। বললেন, ‘তাগুচি জানালেন, ‘তুমি বেতনের সামান্য টাকা নিয়ে ভাবছ কেন? বড় করে ভাবতে শেখ। তোমার গুণ হলো, সবাই মানুষের ভালোর জন্য ভাবতে পারে না। তুমি তো সেই চেষ্টা এই বয়সেই শুরু করেছো। হতাশ না হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাও। এমনও হতে পারে, তু্মইি হাজারো মানুষের উপকার করবে।’ তাকে ছেলের মতো আদর করেন তাকে অন্য রকমের এই ভদ্রলোক। এভাবে দুই থেকে তিন মাস কাটল। পরে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা শিল্প খাত গার্মেন্ট নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলেন ফারুক।

গার্মেন্ট আমাদের অবিশ্বস্য উন্নতি করা শিল্প খাত। মোট রপ্তানি আয়ের ৭২ ভাগই আনেন গার্মেন্ট কর্মীরা। ২০১৩ সালে যখন এই শিল্প খাতে বর্ডারলেস জাপান করপোরেশন ফারুকের মাধ্যমে বিনিয়োগ, শ্রম ও স্বপ্ন ঢালার সিদ্ধান্ত নিলস তার তিন বছর পর, ২০১৬ সালের বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, আমরা তখন চীনের নিচে, বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে!

এখনো আমাদের দেশে লাখ লাখ অসহায়, বয়ষ্ক, এতিম, প্রতিবন্ধিতার শিকার নারী, পুরুষ আছেন, তাদের কেউ চাকরি বা কাজ দেন না। তাদের কর্ম ও ভবিষ্যত গড়ে দেবার স্বপ্ন দেখলেন তিনি। তাদের মাধ্যমে চামড়া থেকে নানা পণ্য ও পোষাক তৈরি করবেন তিনি। বিভিন্ন চামড়া থেকে পণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠান ও গার্মেন্ট ঘুরে বুঝলেন, সস্তা শ্রমের এই দেশে এই খাতগুলোর অনেক সম্ভাবনা। দেশেই লাখ লাখ গরু এক কোরবানিতেই চামড়া দেন, অন্য সময়েও তাই। সেগুলো দিয়ে হাতের কাজের অনেক পণ্য তৈরি করা যাবে। মেয়েদের এখানে কাজের সুযোগ বেশি। রপ্তানি করতে পারলে তো আমাদের দেশেই বিপুল পরিমাণ টাকা থেকে যাবে। তবে বর্ডারলেস জাপান বাংলাদেশে চামড়া দিয়ে নানা পণ্য তৈরির কারখানা চালু করতে চাইলেও তাদের বাংলাদেশের প্রধানের তো কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

ভাবনাটি জেনে জাপানেরই বিখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠান তাকে বিনা খরচে প্রশিক্ষণে রাজি হলো। টানা দুটি মাস জাপানে তাদের প্রতিষ্ঠানে তিনি আর দশজন শ্রমিকের মতো দিন, রাতের শিফটেও কাজ করে পুরো কর্ম প্রক্রিয়া শিখলেন। এরপর দেশে চলে আসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে এখানেও সমস্যা আছে। দেশের বাজারে অন্য বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টেকা যাবে না। ভালো দাম না পেলে শ্রমিকদের জীবন ও প্রতিষ্ঠানের  উন্নতি হবে না। জাপান যেহেতু পাশে আছে, ফলে বর্ডারলেস জাপান করপোরেশনের সাহায্যে উৎপাদিত, তৈরি করা পণ্য তারা জাপানেই প্রথম বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে তারা আরও সিদ্ধান্ত নিলেন, অন্য বিদেশী ভালো প্রতিষ্ঠানের কাজ পেলেও ছাড়বেন না। জাপানে শ্রমিকের কাজ করার সময় জার্মানির বিশ^খ্যাত স্টেশনারি পণ্য তৈরি করা প্রতিষ্ঠান স্তেদলারের বিক্রয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। তারা বিভিন্ন দেশ থেকে চামড়ার তৈরি পণ্য তৈরি করে আনেন। তারা ফারুককে কথা দিয়েছিলেন, মান তাদের মতো হলে অর্ডার দেবেন বাংলাদেশেও। এবার বাংলাদেশে নমুনা তৈরি করে পাঠালেন তিনি। তারা মানে খুব খুশি। ফলে মাত্র ১০ হাজার পিস কলমদানির অর্ডার করলেন। তবে দেশি, নবীন উদ্যোক্তা মোহাম্মদ ফারুক হোসেনের জন্য এ তো আকাশের চাঁদ, আর কম্পানিটির নাম ‘স্তেদলার’! ফলে জায়গা ভাড়া নিয়ে তিন কর্মচারী ও এক সহযোগী নিয়ে তিনি কাজ শুরু করলেন। ২০১৩ সালের এপ্রিল-মেতে ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরে ছয়তলা এক বাণিজ্যিক ভবনের সবচেয়ে উঁচু তলায় তিন হাজার স্কয়ার ফিট জায়গা ভাড়া নিল বর্ডারলেস জাপান করপোরেশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠান বিএলজে বাংলাদেশ করপোরেশন লিমিটেড। মোহাম্মদ ফারুক হোসেন হলেন তাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সামাজিক উদ্যোক্তা। তখন থেকে সাত বছর বছর, আজও নানা সময়ে শ্রমিকের মতোই কাজ করেন ফারুক। প্রথমে তো সকালে এসে অফিস খুলে মেঝে ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করেছেন। মেশিন অপারেট (চালানো) করেছেন। চামড়া কেটেছেন হাতে। শিখেছেন, চামড়া কেটে পণ্য তৈরি। ১০ হাজার পিস পেন ফেইস তৈরি করার চুক্তিটি তাদের ভাগ্য বদলে দিল। এত কাজ বাংলাদেশে সামলাতে না পেরে তারা ভিয়েতনাম থেকেও কাজ করিয়ে আনলেন। তখন ফারুক টানা ৭২ ঘণ্টাও কাজ করেছেন। দুই মাসে ১০ হাজার পিস বিশ^মানের পণ্য তৈরি করলেন তারা। তিনি নিজের হাতে প্যাকেটজাত কলমের বাক্স ছয়তলা থেকে নামিয়ে সিএনজিতে তুলেছেন। অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড থেকেও চামড়া কিনেছেন। প্রতিষ্ঠানের সেই সময়ের সেলস ম্যানেজার সোহেল সাহেবের কথা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন বিএলজে বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সামাজিক উদ্যোক্তা ফারুক হোসেনÑ ‘তিনি আমাকে চামড়া চিনিয়েছেন; নানা ভাবনা দিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন।’

সেই থেকে তারা কাজ করে চলেছেন যাদের সুবিধা নেই, কম আছে; জীবনটি ভালো কাটে না তেমনদের ভাগ্য ভালো করতে। তাদের প্রতিষ্ঠানে পরে কাজ করেছেন কিশোরী ‘মুক্তা’। ১৫ কী ১৬ বছর বয়সের মেয়েটি এতিম। দেখতে কালো। অসুন্দর বলে স্বামী ছেড়ে চলে গেছেন। আবার বিয়ে করেছেন। তবে গরিবের মেয়েটির তো আবার ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় নেই। অবশেষে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে কাজ পেলেন। খুব পরিশ্রমী ও মনোযোগী কর্মী বলে বেতন ও সম্মান ধীরে ধীরে বেড়েছে। তার উন্নতি হয়েছে। পরে স্বামীও ভুল বুঝতে পেরে এসে মাফ চেয়ে স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছেন। শাহীনূরের সন্তান আছেÑ তখন শিশু; মা দেখতে ভালো, বয়সও কম। যেখানেই কাজ করতে যান এই অভাবী মানুষটি, কারও না কারো খারাপ দৃষ্টি তাকে পেয়ে বসে। তারপরও বেঁচে থাকার জন্য তিনি একের পর এক চাকরি বদলে সম্মান ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন। পরে নানাভাবে খোঁজ পেয়ে ফারুক হোসেনের কাছে অনুরোধ করলেন, তাকে বাঁচাতে। তারপর থেকে নিশ্চিতে তিনি কাজ করছেন। তার আশ্রয় হয়েছে বিএলজে বাংলাদেশ করপোরেশন লিমিটেডে। ধীরে ধীরে এসব মানুষের শ্রমে ঘামে ২০১৪ সালের মধ্যে তাদের কর্মীর ও সহযাত্রীর সংখ্যা বেড়ে হলো চার থেকে ৩০। সব খরচ দিয়ে লাভ বেশ হতে লাগল। কর্মীদের বেতন বাড়ল, অর্ডারও অনেক এলো। তারপর তারা চলে গেলেন ৩২ হাজার স্কয়ার ফিটের নতুন অফিসে। ৩০ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে ভাড়া চলে এলেন ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায়। সাড়ে চার লাখ টাকা মাসে অফিস খরচ দিয়েছেন। ২০১৫ সালের মধ্যে বর্ডারলেস জাপানের অসাধারণ সহযোগিতায় তারা হলেন দেড়শ শ্রমিকের বিশাল এক গার্মেন্ট। আরও নানাভাবে সুবিধা না পাওয়া, জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করা এই মানুষগুলোর ভাগ্যকে বদলাতে বিএলজে বাংলাদেশ করপোরেশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সামাজিক উদ্যোক্তা একটি আন্তর্জাতিক মানের দেশী শিশুদের পোশাক তৈরির কারখানা ঘুরে দেখতে পারলেন।

সবসময়ই তো তিনি নতুন কোনো উপায়ে গরীবের, অসহায়ের ভাগ্য বদলাতে চাইছেন। সেটি দেখে তাদের শিশুদের পোশাক তৈরি ও রপ্তানি শাখা চালু করলেন। একশ ভাগ জাপানে রপ্তানি হওয়া এই কারখানাতে এখন তাদের আছেন ৫২ জন কর্মী। এক মাস থেকে তিন-চার বছর বয়সের মেয়ে ও ছেলে শিশুর সবই তৈরি হয়। ২০১৭ সালের আগস্টে আলাদা কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স কম্পানি (কিউওসি) চালু করেছেন তারা। সেখানে  কেবল শারিরীক প্রতিবন্ধীরাই কাজ করছেন। ভবিষ্যতেও তাই থাকবে।  তাতে তাদের জীবন জয় করা রফিকুল ইসলামের দেখা মিলল। হুইল চেয়ারে চলেন। মাসখানেক ধরে কাজ করছেন। প্যাকেজিং ওয়ার্কার। থাকেন কাচ দেওয়া জায়গায়। সামনে টেবিল আছে। ২০০৯ সালে সাততলা থেকে পড়ে গিয়েছেন। এক বছর হাসপাতালে ছিলেন। চারটি হাসপাতালে তার জীবন ও পা দুটি বাঁচাতে চারটি জটিল অপারেশন হয়েছে। তারপরও তিনি হাসিখুশি। কিশোরগঞ্জের তরুণটি সিআরপিতে দীর্ঘদিন থেরাপিসহ নানা চিকিৎসা নিয়েছেন। তার ছবি তোলার শুরু সেখানে, জীবনকে ভালোবাসতেও শিখলেন। এখন কলকাতায় ‘ছবিওলা’তে তার ছবির প্রদর্শনী হচ্ছে, ২০১৭ সালে তার ছবি গিয়েছিল দিল্লির এক প্রদর্শনীতে। আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত আলোকচিত্রীটি ২০১১ সালে সিআরপিতে থাকার সময় পা উঁচু-নিচু হাবিবা আক্তারের প্রেমে পড়েন। মেয়েটি ভালো, ছেলেটিও স্বপ্নবাদী হাসিখুশি বলে তারা বিয়ে করেছেন। এই দম্পতি খুব ভালো আছেন। আলাদা একটি শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র আছে বিজেএল বাংলাদেশ করপোরেশন লিমিটেডের। তাতে এখন কর্মজীবী মায়েদের ১০ থেকে ১২টি শিশুসন্তান আদরে লালিত হয়। সেটিকে তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রূপ দেবেন। এই বছরের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হবে। তাতে আলাদা শিক্ষক-কর্মী থাকবেন। তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ছেলেমেয়েরা পড়বেন।  এই প্রতিষ্ঠানটি একেবারেই অন্যরকম। তারা কর্মজীবী মায়েদের চার মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি দেন। সন্তান জন্মদানের পর প্রথম ছয় মাস ১৫শ টাকা করে শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খরচ দেন। যে কোনো পর্যায়ের যে কোনো কর্মীর ছেলে কী মেয়ে পিএসসি পরীক্ষায় পাশ করলে তিন, জেএসসি পাশ করতে পারলে পাঁচ, এসএসসি ও এইএচএসসি পাশ করলে তাদের যে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই সাত ও ১০ হাজার টাকার ভাতা পান। যে কারো কাছের আত্মীয় মারা গেলে তিনি তাকে সৎকার, কবর বা দাহ করতে পাঁচশ টাকা প্রতিষ্ঠান থেকে সাহায্য পেয়ে থাকেন। বড় কোনো দুর্ঘটনা বা সমস্যায় পড়লে যে কোনো কর্মী ও কর্মকর্তা সুদমুক্ত ২০ হাজার সাহায্য পান। কর্মীদের সবার জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড, ইনস্যুরেন্স (জীবন ও ক্ষয়ক্ষতি বীমা) সুবিধা আছে। কর্মীদের এত সাহায্য ও সুবিধার ফলে বিজেএল বাংলাদেশ করপোরেশনের লেদার গুডস ম্যানুফেকচার অ্যান্ড এক্সপোর্ট (চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে পণ্য ও রপ্তানি) বিভাগ এ বছর পুরো দেশের খাতটিতে দ্বিতীয় হয়েছে। তাদের পণ্য জাপানের টোকিও, ওসাকা, ইওকোহামা, নাগোয়া ইত্যাদি শহরের ১৫টি বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্রি হয়। বিরাট এই প্রতিষ্ঠানে ৬৫০ জন চামড়াজাত পণ্য তৈরি, ৫০ জন গার্মেন্ট, ২৫ জন কিউওসি কারখানাতে আছেন। মোট সাড়ে সাতশ কর্মী আছেন স্বপ্ন দেখার এই বিরাট ঘরে।

সবার জীবনের গল্পই আলাদা, সংগ্রামে ভরা। শিশুদের পণ্য তৈরি বিভাগে কাজ করেন হাসিনা। গার্মেন্টের ভাষায় ‘সুইং অপারেটর’। ২২ বছর হলো স্বামী নেই; ১৯৯৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় গাড়িচালক স্বামী মারা গেছেন। সেই থেকে জীবন সংগ্রামে আর বিয়ে করেননি তিনি। একমাত্র মেয়েকে সাভারের বাইশমাইল কলেজ থেকে বিএ পাস করিয়ে কদিন হলো বিয়ে দিয়েছেন। ১৭ থেকে ১৮শ টাকা বেতনে জীবন শুরু করে তখন ওভারটাইম করে সাত থেকে আট হাজার টাকা আয় করতে হতো তাকে। এভাবে দুই ভাই, তিন বোনকে মানুষ করেছেন। মা-বাবাকে দেখেছেন। আরেকজন সাত হাজার টাকা বেতনের কর্মী ঝাড়–দার মনোয়ারা বেগমের একমাত্র মেয়ে সাভার ক্যান্টনমেন্ট কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ে। তাদের পুরো প্রতিষ্ঠানের সব শেয়ারের মালিক বর্ডারলেস জাপান করপোরশেন। কোনো দেশে লাভের টাকা তারা অন্য পিছিয়ে পড়া দেশে সুবিধাহীনদের জীবন সাজাতে লগ্নি করছেন।