বিখ্যাত নগরবিদ ড. নজরুল ইসলাম ও তার সহকর্মীরা মিলে তৈরি করেছেন ‘ন্যাশনাল অ্যাটলাস অব বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের জাতীয় মানচিত্র সংকলনটিতে কী আছে? কীভাবে তৈরি হলো বাংলা ও ইংরেজি ভাষার বইটি। লিখেছেন রানা মিত্র। ছবি তুলেছেন সাহাদাত পারভেজ
২০১২ সাল, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির বিরাট গবেষণা প্রকল্প ‘বাংলাপিডিয়া’র কাজ শেষ হলো। তবে প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম সহ-গবেষকদের একদিন আরেকটি প্রস্তাব দিলেন, ‘বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট ফান্ডে অনেক টাকা পড়ে আছে। আপনারা কেন নতুন গবেষণা করছেন না?’ এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক, ড. নজরুল ইসলাম সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলেন ‘ন্যাশনাল অ্যাটলাস অব বাংলাদেশ’ বা বাংলাদেশের জাতীয় মানচিত্র এবার তৈরি করবেন। বিখ্যাত এই ভূগোলবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একজন কার্টোগ্রাফার বা মানচিত্রকার; ছাত্রজীবন থেকে মানচিত্র আঁকেন। মানচিত্র সংগ্রহ ও মানচিত্রে কাজ করা তার পেশা, নেশা ও শখ। আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থাকতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ইন ম্যাপস’র প্রদায়ক সম্পাদক ছিলেন। সবার কাজ সমন্বয় করতে হয়েছে, নিজেকেও আঁকতে হয়েছে। নানা সময়ও তিনি মানচিত্র তৈরি করেছেন। অনেক দিনের স্বপ্ন সারা দেশের সব বিষয়ের ওপর পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র সংকলন বা অ্যাটলাস নিজের হাতে তৈরি করবেন। তাতে এ দেশের প্রশাসনসহ সব সরকারি ব্যবস্থাপনা; স্কুল-কলেজ, হাসপাতালও বাদ যাবে না। থাকবে অতীতের গর্বের স্মৃতিগুলোও। ফলে এটি হবে প্রাচীন থেকে আজকের দেশ। তিনি মানচিত্রের ইতিহাস নতুন ও আগ্রহীদের হাতে তুলে দেবেন। পরিকল্পনাটি এবার আরও ভালোভাবে মনের খাতায় আঁকলেন। সোসাইটির কাউন্সিল সভায় লিখিতভাবে তুলে ধরে সবাই মিলে আলোচনা করলেন। পরপর কটি সভায় আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হলো ইতিহাসনির্ভর, আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ মানচিত্রটি সংকলন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও এশিয়াটিক সোসাইটির আর্থিক সাহায্যে তৈরি করা হবে। সেজন্য গবেষণা করতে হবে, অনেক কাজ আছে। দলের জন্য আর্থিক বরাদ্দের আবেদন এশিয়াটিক সোসাইটি ২০১২ সালের ডিসেম্বরে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে জমা দিল। পরের বছর ৯ অক্টোবরে অনুমোদিত হয়ে তাদের কাছে এলো।
বিখ্যাত নগর গবেষক ড. নজরুল ইসলাম বলেছেন, প্রকল্পের ৬৮ ভাগ টাকা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের, বাকি ৩২ ভাগ টাকা দিয়েছে সোসাইটি। বলে দেওয়া হয়েছিল, ২০১৪ সালে শুরু করে দুই বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে। বরাদ্দ পাওয়ার পর তিনি দল তৈরির কাজ শুরু করলেন। অভিজ্ঞতা ও অনন্যতার গুণে তিনি প্রকল্পের প্রধান সম্পাদক রইলেন। সংকলনের সম্পাদক নির্বাচিত হলেন তারই সহকর্মী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম নাজেম। প্রধান মানচিত্রকার হিসেবে তারা আমন্ত্রণ জানিয়ে আনলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হাসান মাহমুদকে।
শুরু হলো বিরাট কর্মযজ্ঞ। কিন্তু শুরুতেই ধাক্কা খেলেন ড. নজরুল ইসলাম। তাদের কাজের কদিনের মধ্যেই কানাডায় উচ্চতর শিক্ষা নিতে চলে গেলেন হাসান মাহমুদ। তবে তিনি তো বসে থাকার মানুষ নন। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও অন্যান্য বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে, নিজে গিয়ে খুঁজে আনলেন পাস করা মেধাবী ভূগোলের ছাত্রছাত্রীদের। সবাইকে নিজ হাতে বৈজ্ঞানিকভাবে মানচিত্র তৈরি করা শেখালেন। তাদের নিয়েই শুরু হলো ‘ন্যাশনাল অ্যাটলাস অব বাংলাদেশ’র কাজ। তবে সংকট তাদের পিছু ছাড়ল না। ভালোভাবে কাজ শেখার পর, তার সঙ্গে কাজ করেছেন বলেও ভালো ভালো পদে তাদের সাতজনের বেশিরভাগেরই একের পর এক চাকরি হয়ে যেতে লাগল। কীভাবে কাজ করবেন দুশ্চিন্তা শুরু হলো। একে তো আমাদের দেশে এই ধরনের টেকনিক্যাল ও খুব স্পর্শকাতর কাজে দক্ষ পেশাজীবীর অভাব, অন্যদিকে প্রকল্পের মেয়াদও শেষ হচ্ছে। তখন তার পাশে দাঁড়ালেন ড. নাজেম। তারপর প্রধান সম্পাদক চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলেন। একটি মাস বাসায় পড়ে থেকেছেন। কোনো কাজই করতে পারেননি। বয়স্ক ড. নাজেমের দেহেও বড় অপারেশন করাতে হলো। তিনিও খুব অসুস্থ হয়ে গেলেন। ফলে মেয়াদ শেষ হয়ে গেল। তারপরও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও বর্তমান প্রজন্মের জন্য মানচিত্র সংকলনটি করবেন বলে আবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলেন ড. নজরুল ইসলাম। আরও একটি বছর সময় চাইলেন। তবে অতিরিক্ত কোনো বরাদ্দ নেননি। অবসরে ভেবে কাজের পরিধিও বাড়িয়ে ফেললেন। সংকলনকে পূর্ণাঙ্গতা দিলেন। ফলে ২০৫টি মানচিত্রের পরিকল্পনা বেড়ে হলো ৪২৫টি। সময় বরাদ্দ করতে কোনো অসুবিধা থাকল না মন্ত্রণালয়ের। এবার তিনি প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করতে লাগলেন। নিজের পুরো সময় দিলেন অ্যাটলাসে। ড. নাজেমের মতো দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং গুণী শিক্ষকও সঙ্গে গবেষক হিসেবে আছেন। সারা দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ও অন্যান্য কাজ সেরে চলে এসেছেন অ্যাটলাসের কাজে। তাদের দুজনের ও গবেষকদের শ্রমে, ঘামে, মেধায় ২০১৭ সালের জুনে শেষ হলো মানচিত্র সংকলনের কাজ। ভুল সংশোধন, ছাপানো শেষে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় ছাপা হলো ৪৬০ পৃষ্ঠার ‘ন্যাশনাল অ্যাটলাস অব বাংলাদেশ’। প্রকাশনা উৎসব হলো।
৮০-তে পা রাখা ড. নজরুল ইসলাম এটলাস বা মানচিত্র সংকলন নিয়ে বলেছেন, ‘আমার সারাজীবনের স্বপ্ন গবেষক, আগ্রহী ও ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছেছে। আমাদের সঙ্গে
ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রী গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। বইটি সবার কঠোর শ্রমের ফসল। বাসা থেকে সাহায্য না করা হলে কিন্তু কাজটি করতে পারতাম না। বিরাট এই কাজে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলাপিডিয়া ট্রাস্টসহ বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি অর্থ সাহায্য করেছেন। সেই টাকায় দেশের নানা জায়গায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ও ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা, গবেষণা করেছি। তাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞ।’
কী আছে? কেন আছে?
‘ন্যাশনাল অ্যাটলাস অব বাংলাদেশ’-এ দেশের ইতিহাস, প্রশাসন, প্রাকৃতি, পরিবেশ, জনসংখ্যা, অর্থনীতি, সামাজ, সংস্কৃতি, আঞ্চল ও এলাকাগুলোর সম্পূর্ণ মানচিত্র সংকলন। এখানে বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমান কম্পিউটারে আধুনিক কার্টোগ্রাফি বা মানচিত্র আঁকার পদ্ধতিতে তুলে ধরা হয়েছে। সংকলনে আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নও স্পষ্ট ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মানচিত্র সংকলনের ১৬টি অধ্যায়ে মোট ৪২৫টি মানচিত্র, ৪৬০ পাতার বিবরণ আছে।
প্রথম অধ্যায়ে খ্রিস্টপূর্ব ১৫শ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের আকার মানচিত্রে, বর্ণনায় আছে। নানা সময়ে বাংলাদেশের আকৃতি কেমন ছিল সেজন্য মোট ২০টি মানচিত্র আছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে ১২টি মানচিত্রে ভারত থেকে ভাগ হওয়ার পর আজ পর্যন্ত আমাদের রাজনীতি ও প্রশাসনের ছবি তুলে ধরা হয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়ে ৪১টি মানচিত্রে এই প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে।
চতুর্থ অধ্যায়ে আমাদের পরিবেশ সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধরণ ১৬টি মানচিত্রে দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চম অধ্যায় এই দেশের চালিকাশক্তি কৃষি, পশু, হাঁস-মুরগি, মৎস্য উৎপাদন ইত্যাদি খাতের পরিস্থিতি ৭৬টি মানচিত্রে দেখানো হয়েছে।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে খনিজ, শক্তিসম্পদ, শিল্প ও পর্যটন খাতের অবস্থা ২২টি মানচিত্রে আছে। পর্যটনকে বিনোদন শিল্পখাত হিসেবে তুলে ধরে এখানে নতুন সম্ভাবনার চিত্র দেখানো হয়েছে।
সপ্তম অধ্যায়ে আমাদের পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ৯টি মানচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে।
অষ্টম অধ্যায়ে জনসংখ্যার অতীত ও বর্তমান বিবর্তন ৪২টি মানচিত্র আছে।
নবম অধ্যায়ে শ্রমশক্তি ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ২০টি মানচিত্রে আছে।
১০ম অধ্যায়ে নগরায়ণ ১৫টি মানচিত্রে আছে।
১১ অধ্যায়ে ১৬টি মানচিত্রে আবাসন ও পরিসেবা খাতের চিত্র আছে।
১২ অধ্যায়ে মানব উন্নয়ন সূচক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জিডিপি (গড় জাতীয় আয়) ও দারিদ্র্যের চিত্র ১৬টি মানচিত্রে আছে।
১৩ অধ্যায়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ১২টি মানচিত্রে রাখা আছে।
১৪ অধ্যায়ে আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ১৪টি মানচিত্রে আছে।
১৫ অধ্যায়ে দেশের প্রশাসনিক একক ৮৪টি মানচিত্রে আঁকা হয়েছে।
১৬ অধ্যায়ে রাজধানী ঢাকার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ১০টি মানচিত্রে আছে।
কেন দরকার
ড. নজরুল ইসলাম বললেন, ‘আমাদের ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিকÑ সব খাতের পরিপূর্ণ মানচিত্র সংকলনের অভাব ও প্রয়োজনীয়তা অনেক বছর ধরেই সবাই অনুভব করছিলেন। আমাদের মানচিত্রও তো আগের মতো নেই। এই দেশের বিপুল ভৌগোলিক উপাত্তও আছে। সেগুলোর ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। প্রায়ই নীতিনির্ধারক, পরিকল্পনাবিদ, পেশাজীবীরা ঠিক তথ্য বিন্যাস ও বিশ্লেষণে সমস্যায় পড়ছেন। সাধারণের কাছেও মানচিত্রের সাহায্যে জটিল তথ্য সহজে উপস্থাপন করা দরকার। তাই এই সংকলন। ছাত্রছাত্রী, গবেষক, শিক্ষক, সব নানা পেশার মানুষ, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম কর্মীরাও বিশ্লেষণাত্মক এই মানচিত্র সংকলনের মানচিত্রগুলো ব্যবহার করতে পারবেন।’