আসামে ‘রাষ্ট্রহীন’ হয়ে পড়া এক হিন্দু পরিবারের করুণ অভিজ্ঞতা

আসামে নাগরিক তালিকা (এনআরসি) নিয়ে বিতর্ক আছে শুরু থেকেই। তালিকার চূড়ান্ত খসড়া থেকে বাদ পড়া ৪০ লাখের মধ্যে অধিকাংশই মুসলিম।

ভারতের বিজেপি সরকার রাজ্যটি থেকে সংখ্যালঘু মুসলিমদের তাড়িয়ে দিতে এই তালিকা করছে বলে অভিযোগ।  

খসড়া তালিকা থেকে বাদ গেছে সংখ্যাগুরু হিন্দুদেরও অনেকের নাম। ইতিমধ্যে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত অনেকে মানুষকে রাখা হয়েছে ডিটেনশন সেন্টারে। হাফপোস্ট ইন্ডিয়ার এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভুক্তভোগী এক হিন্দু পরিবারের ঘটনা।

জানা যায়, মরিগাঁও জেলার মায়াং গ্রামের বাসিন্দা দিলীপ বিশ্বাস। আসামের গ্রামটিতে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে এই হিন্দু পরিবারের বসবাস। 

১২ বছর আগে গ্রামপ্রধানের সঙ্গে বিবাদ সৃষ্টি হয় দিলীপের। এর জেরে গ্রামপ্রধান স্থানীয় পুলিশের কাছে অভিযোগ জানায় যে, দিলীপের পরিবার বাংলাদেশি।

এই অভিযোগের তিন বছরের পর নিজ বাড়ি থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে জোরপূর্বক এক ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয় দিলীপের পরিবারকে। তার দুই মেয়ে কল্পনা ও অর্চনার বয়স তখন যথাক্রমে ৬ এবং ২ বছর।

বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে দিলীপের স্ত্রী রমণী এবং তাদের দুই মেয়েকে আসামের কোকড়াঝড় জেলায় এক ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়। দিলীপকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় গোলপাড়া জেলার আরেক ডিটেনশন সেন্টারে।

একটি মানবাধিকার সংগঠনের প্রচেষ্টায় এই বছরের মার্চে তারা জামিনে মুক্তি পান। এর মধ্যে পরিবারটির দুঃসহ অভিজ্ঞতা ঘটে। ভিন্ন ভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে থাকায় এত বছরে শিশু অর্চনার শৈশব কাটে বাবাকে ছাড়া। এই শিশুর মনে এই ধারণা ঢুকে গিয়েছিল, তার বাবা নেই। ডিটেনশন সেন্টারে বেড়ে ওঠা এই শিশু অনেকটা চুপচাপ। তার মধ্যে নেই কোনো চঞ্চলতা। ডিটেনশন সেন্টারে পায়নি শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ।

 ৯ বছর পর এই পরিবারটি মিলিত হওয়ার সুযোগ পায়। ডিটেনশন সেন্টারে পরিবারের সঙ্গে দিলীপের যোগাযোগ ছিল না। স্ত্রীকে লেখা সবগুলো চিঠিও রেখে দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। যা জানতেও দেওয়া হয়নি দিলীপকে। মুক্তি পাওয়ার পর সেসব চিঠি ফেরত দেওয়া হয় তাকে।

গ্রামে ফিরে এসে আরও করুণ অভিজ্ঞতার স্বীকার হয় পরিবারটি। নিজের গ্রাম ও এর মানুষজনও তাদের পর করে দিয়েছে। মুক্তি পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে দিলীপের স্ত্রী রমণী মারা যান।

এ দিকে নাগরিকত্ব তালিকাতেও নাম নেই এই পরিবারের। দিলীপ বিশ্বাস জানায়, নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় প্রতিদিন থানায় ধরনা দিচ্ছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, আগামী ৩১ আগস্ট নাগরিক তালিকা থেকে বাদ যাওয়াদের নাম অনলাইনে প্রকাশিত হবে। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় লাখ লাখ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।