ইমাম হত্যায় আরেক ইমাম, ফাঁসাতে চাইল হিযবুত তাওহীদকে

সোনারগাঁয়ে ইমাম দিদারুল খুনের ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুরুতে ক্লু-লেস এই হত্যার পুরোটাই ছিল সুপরিকল্পিত।

পুলিশসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দিদারুল হত্যার নেপথ্যে ছিল তারই বন্ধু আরেক ইমাম। ওই বন্ধু ধারের টাকা ফেরত না দিতে নির্মমভাবে হত্যা করেছে ইমামকে। হত্যার পর অভিযুক্ত ইমাম চিরকুট লিখে ফাঁসাতে চেয়েছিল জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাওহীদকে।

হত্যার বিষয়ে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এসব জানান পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ।

গত বুধবার আগস্ট সোনারগাঁ মল্লিকপাড়া গ্রামের নারায়ণদিয়া বায়তুল জালাল জামে মসজিদের ইমাম দিদারুল ইসলামকে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নিহত দিদারুল নড়াইল জেলার কালিয়া থানার রাজাপুর এলাকার আফতাব ফরাজির ছেলে।

এর আগে ২৬ জুলাই তিনি মল্লিকপাড়া গ্রামের ওই মসজিদটিতে ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান।

হত্যার পর জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) নির্দেশে ক্লু-লেস এ মামলার তদন্তে নামে পুলিশ। তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আসামিকে শনাক্ত করে তাকে মঙ্গলবার রাতে মাদারীপুরের শিবচর থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।  গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম ওহিদুর রহমান (৩১)। সে নড়াইল জেলার কালিয়া থানার পশ্চিমপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

ওহিদুর রহমান নিজেও মাদারীপুরের শিবচরের স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করতেন।

পুলিশ জানায়, নিহত দিদারুলের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসা-সংক্রান্ত ব্যাপারে আর্থিক লেনদেন হয় হত্যাকারী ওহিদুরের সঙ্গে। স্বর্ণের বার বেচা-কেনার ব্যবসাও ছিল তার। স্বর্ণের বারের ব্যবসা নিয়েই ইমাম ও তার বন্ধুর মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। পরে দিদারুল ব্যবসা থেকে সরে আসতে এবং বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে দেওয়া টাকা ওহিদুরের কাছে ফেরত চান। এতেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা সাজায় ওহিদুর।

পুলিশ জানায় পরিকল্পনা মতে, হত্যার আগের পরিকল্পনা সাজায় ঘাতক ওহিদুর। হত্যার দিন এশার নামাজের পর দিদারুলকে নেশাজাতীয় দ্রব্য মেশান খাবার খাওয়ায় সে। এতে দিদারুল অচেতন হয়ে পড়েন। তার সেই রাতের খাবারের অবশিষ্ট হত্যার পর উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, দিদারুল অচেতন হয়ে পড়লে তাকে চাপাতি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে একটি চিরকুট লিখে রেখে দরজায় তালা দিয়ে ঘাতক পালিয়ে যায়। এর আগে কুমিল্লায় হত্যাকারী ওহিদুর ও ইমাম দিদারুল পাশাপাশি মসজিদে ইমামতিও করেছেন।

কিলিং মিশনে সেই বন্ধু একাই অংশ নেয় বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

তবে এ হত্যায় অন্য কেউ জড়িত আছে কি না তা জানতে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আসামিকে সঙ্গে নিয়ে ইমাম হত্যায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম উদ্ধারে অভিযান চালিয়েছে সোনারগাঁ থানা পুলিশ। অভিযানে পার্শ্ববর্তী ডোবা থেকে রক্তমাখা একটি লুঙ্গি ও দুটি কোকের বোতল উদ্ধার করা হয়।

দিদারুলের পারিবারিক সূত্র জানায়, দিদারুল তার বন্ধুর সঙ্গে ব্যবসা করবে বলে বিনিয়োগের জন্য দুটি গবাদিপশু কিছুদিন আগে বিক্রি করে। এ ছাড়া সব মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকার কাছাকাছি সে বিনিয়োগ করবে বলে পরিবারকে জানিয়েছিল।

জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ওই টাকা থেকেই তার বন্ধুকে স্বর্ণের বারের ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য টাকা দেয় দিদারুল। পরে তাদের মধ্যে কোনো কারণে দ্বন্দ্ব হওয়ায় ব্যবসা থেকে সরে আসতে চায় এবং নিজের টাকাও ফেরত চায় দিদারুল।

পুলিশ জানায়, হত্যার পর গা ঢাকা দেয় সে ওহিদুর। নিজের পরিচয়ও গোপন করে সে। পুলিশ তার সঠিক পরিচয় খুঁজে বের করে মাদারীপুর থেকে গ্রেপ্তার করে।

সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার এখনো তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত জানানো যাচ্ছে না।

হিযবুত তাওহিদকে ফাঁসানোর চেষ্টা: সোনারগাঁ থানার উপপরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ জানান, গত বুধবার রাতে মল্লিকপাড়া মসজিদে ইমাম দিদারুল ইসলামকে হত্যার খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশের পাশে একটি চিরকুট দেখতে পাই।

তিনি জানান, চিরকুটটি হাতে নিয়ে দেখি তাতে লেখা রয়েছে, ‘প্রিয় এলাকাবাসী ও প্রশাসনের ভাইয়েরা এ মসজিদের ইমাম হিযবুত তাওহীদের সদস্য, যে আমাদের দল থেকে নগদ অর্থ অস্ত্র ও তথ্য নিয়া পালিয়ে আসছে তাই তাকে আমরা মেরে ফেলেছি। ১ জনকে নতুন পেয়ে ধরে নিয়াছি তাকে ছাড়াতে হলে ০১৯৪৪-৩৩৪০৬৭ এ বিকাশ করুন, ২,০০০০০ টাকা। তা না হলে ৫ দিনের মধ্যে মসজিদের দোকানের সামনে তার লাশ পাওয়া যাবে- ইতি হিযবুত তাওহীদ’।

এ চিরকুটটি পাওয়ার পর আমাদের সন্দেহ বেড়ে যায়। গ্রামের লোক বলেছে হুজুর এখানে একা ছিল কিন্তু চিরকুটে লেখা দুজন। তাহলে হত্যার রাতে কেউ হয়ত এখানে ছিল। সেই সূত্র ধরে ও নিহত ইমামের বাড়ির ভাই ও আত্মীয়দের কাছ থেকে টাকার বিষয়টি আমলে নিয়ে কাজ শুরু করি। হত্যার ছয় দিনের মাথায় খুনিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই।