স্টোকসের জীবন বদলে গেল : বোথাম

বেন স্টোকস এখন ইংল্যান্ডের জাতীয় ‘হিরো’। তাকে নিয়ে চর্চা হচ্ছে চারদিকে। ক্রিকেট বুঝে এমন ছোট থেকে বুড়ো, কিংবদন্তি থেকে উঠতি ক্রিকেটার সবাই নায়ক স্টোকসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। শুধু তাই নয়, ইংলিশ অলরাউন্ডার বিশ্ব ক্রিকেটের বক্স অফিসের আকর্ষণে পরিণত হয়েছেন। হেডিংলিতে গত রবিবারের বীরোচিত ইনিংসটি স্টোকসকে এমন দিন এনে দিয়েছে। তাই ওই ১৩৫ রানের অপরাজিত ইনিংসটি উঠেছে গত ২৫ বছরে সর্বকালের সেরা টেস্ট ইনিংসের তালিকায়। দুই নম্বরে থাকা স্টোকসের ইনিংসটি পেছনে ফেলেছে ব্রায়ান লারা, রিকি পন্টিং, ভিভিএস লক্ষ্মণদের মতো ক্রিকেট গ্রেটদের ইনিংসকে। তাই সাবেক ইংল্যান্ড লিজেন্ড স্যার ইয়ান বোথাম বললেন, ‘স্টোকসের জীবনটাই এখন বদলে গেল।’

অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া ৩৫৯ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে হেডিংলিতে ইংল্যান্ডকে জিতিয়েছেন স্টোকস। নাটকীয়ভাবে একাদশ ব্যাটসম্যান লিচকে সঙ্গে নিয়ে শেষ উইকেটে প্রয়োজনীয় ৭৩ রান (আসলে ৭৬ রান) যোগ করেন তিনি, যার ৭৪ রানই এসেছে স্টোকসের ব্যাট থেকে। এমন নাটকীয় কীর্তির পর তাকে ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন ভাবা হচ্ছে। বিশ্বকাপ ফাইনালের পর অ্যাশেজ কীর্তিতে স্যার ইয়ান বোথাম, অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফদের সঙ্গে অনায়াসে বসে যাচ্ছেন স্টোকস।

১৯৮১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অ্যাশেজ সেঞ্চুরি ইতিহাসে অমর করে রেখেছে বোথামকে। সেই ম্যাচটিও হয়েছিল হেডিংলিতে (লিডস)। দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ১৪৮ বলে ১৪৯ রানের ইনিংস খেলে ইংল্যান্ডের আজীবনের অ্যাশেজ ‘হিরো’য় পরিণত হন বোথাম। তার ব্যাটে ফলোঅনে পড়েও অস্ট্রেলিয়াকে আবার ব্যাটিংয়ে পাঠাতে সক্ষম হয় ইংলিশরা। পরে ১৩০ রানের টার্গেট ছুড়েও জয় আসে। এ জয় পরে ইংল্যান্ডকে অ্যাশেজ জিততে সাহায্য করে।

ওই ম্যাচের পর থেকে বোথামের জীবন বদলে যায়। সাধারণ থেকে হয়ে ওঠেন অসাধারণ। স্টোকসের কীর্তি দেখে বোথাম সে সময়ের স্মৃতিচারণ করলেন। উত্তরসূরির জীবনও যে সেদিনকার বোথামের মতো হতে যাচ্ছে জানালেন তাও, ‘ওই একটি ইনিংস এত রাতের মধ্যে আমার জীবন বদলে দিয়েছিল। আমি নিশ্চিত যে বেনের (স্টোকস) জীবনও এখন বদলে দেবে এই ইনিংস। এখন থেকে তার আর কোনো ব্যক্তিগত জীবন থাকবে না। এখন এভাবেই তাকে অভ্যস্ত হতে হবে। ওকে নিয়ে সবাই উচ্ছ্বাস করবে। যেখানে তাকে দেখা যাবে সেখানেই, কারণ সে এখন সাধারণের আগ্রহের কেন্দ্রে। স্টোকস পরপর দুবার যা করেছে তাতে একদম যোগ্য লোক হিসেবেই এই সাফল্য পেয়েছে। তাকে নিয়ে এখন উচ্ছ্বাস হবেই।’

৬৩ বছর বয়সী বোথাম স্টোকসকে ‘স্পেশাল ওয়ান’ আখ্যা দিয়েছেন। জানালেন বড় দৈর্ঘ্যরে ক্রিকেটে স্টোকসের ভালো করার ইচ্ছাটা ক্রিকেটের জন্য ভালো, ‘সে বিশ্বজুড়ে টি-টোয়েন্টি লিগ খেলছে। সেখানেও ভালো করছে; কিন্তু এর মধ্যেই টেস্টে তার খেলার ইচ্ছা ও সুযোগ পেয়ে অসম্ভব ভালো করা সাধুবাদ জানানোর দাবি রাখে। এটাই প্রমাণ করে আপনি সত্যিকারের ক্রিকেটার। টেস্ট ক্রিকেট সব সময়ই ভিন্ন। এখানে ভালো করাও ভিন্ন ক্রিকেটারের পরিচয় রাখে। আমরা প্রথম ইনিংসে ৬৭ রানে অলআউট হয়েছিলাম। অন্য কোনো ফরম্যাট হলে আমরা সেখানেই ম্যাচ হেরে যাই। কিন্তু এটা টেস্ট ক্রিকেট, এখানে একবার ব্যর্থ হলেও ফেরা যায়। এটাই এই ফরম্যাটের মহত্ত্ব। এই ফরম্যাটটা আপনাকে অবিশ্বাস্য কিছু করার সুযোগ করে দেয়।’

স্টোকসের বন্ধু ও সতীর্থ মইন আলি এখন কাউন্টি ক্রিকেটে ব্যস্ত। অ্যাশেজ থেকে বাদ পড়ায় খেলছেন নিজের দল উস্টারশায়ারের হয়ে। তার কাছেও স্টোকস ইতিমধ্যে বোথাম, ফ্লিনটফদের মতো কিংবদন্তি হয়ে গেছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ডের জয়ের মুহূর্তে মইনদের খেলা বন্ধ রাখা হয় ম্যাচ দেখার জন্য। ইংলিশ অলরাউন্ডার জানান, ‘স্টোকস সত্যিই অনন্য ক্রিকেটার। আমার দেখা সেরা অলরাউন্ডার। ওকে আমি গ্রেটদের কাতারে রাখব। বিশ্বকাপ জেতানোর পর অ্যাশেজেও যেভাবে জেতাল সেটা এক কথায় অবিশ্বাস্য। ওই ম্যাচ চলাকালীন আমি কাউন্টি খেলছিলাম। পুরো দিন খেলা দেখেছি। জয় থেকে দুই রান দূরে থাকতে ম্যাচ দেখতে পারিনি। আমাকে ব্যাটিংয়ে নামতে হয়। তবে ইংল্যান্ডের জয় দেখার জন্য আমাদের খেলা বন্ধ ছিল। আমি নিশ্চিত ইংল্যান্ডে যত খেলা হচ্ছিল সব ওই সময়টায় বন্ধ রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত আমরা একটা অবিশ্বাস্য জয় দেখলাম।’

এদিকে সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক মাইক ব্রিয়ারলির দৃষ্টিতে বোথামের সেই কীর্তিকে ছাপিয়ে গেছেন স্টোকস। ৮১’র সেই ম্যাচে বোথামের অধিনায়ক ছিলেন ব্রিয়ারলি। লন্ডন টাইমসে তার কলামে তিনি লিখেছেন, ‘এটা বিশ্বাস করা কঠিন ছিল স্টোকস ছাড়িয়ে যেতে পারে (বোথামকে)।’ স্টোকসের ওপর ব্যাট-বল দুটো বিষয়ের চাপ কমানোর প্রস্তাব রেখেছেন ব্রিয়ারলি। স্টোকসের ব্যাটিংয়েই বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি, ‘অধিনায়ক ও নির্বাচকদের কাছ থেকে স্টোকসের প্রতিশ্রুতি নেওয়া উচিত যে তাকে বেশি বোলিং করতে হবে না। একজন ক্রিকেটারের পক্ষে একদিন ২০ ওভার বল করার পর পরদিন ছয় ঘণ্টা ব্যাটিং করা কঠিন। যেহেতু স্টোকসের ব্যাটিং অনেক উঁচু মানের, তাই টেস্টে তাকে বোলিং থেকে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। এক বছর আগে আমি বলেছিলাম ইংল্যান্ডের সেরা তিন ব্যাটসম্যানের মধ্যে কুক ও রুটের পর স্টোকস। এখন সে তারচেয়েও ওপরে উঠে এসেছে।’