নিয়মিত পানি ব্যবহার করলেও নগরীর বাসিন্দাদের অনেকেই রাজশাহী ওয়াসার বিল সময়মতো পরিশোধ করছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরনের গ্রাহকদের কাছে গত কয়েক বছরে ওয়াসার পাওনা টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ ৪০ হাজার ২৭৫ টাকা। সাধারণ গ্রাহক ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেও বকেয়া পড়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। তবে বিলখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া একাধিক প্রতিষ্ঠান বলছে, তাদের কাছে নিয়মিত বিলের কপি না পাঠিয়ে হঠাৎ করেই বড় অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বকেয়া বিল আদায়ে অভিযানে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজশাহী ওয়াসা কর্র্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় খুব শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা শুরু হবে বলে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহী ওয়াসার যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। এর আগে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পানি শাখার পক্ষ থেকে রাজশাহী নগরীতে পানি সরবরাহ দেওয়া হতো। ওয়াসা কর্র্তৃপক্ষ প্রতি ছয় মাস পর পর গ্রাহকদের কাছে বিল পাঠায়। কিন্তু অনেক গ্রাহকই বিল দেওয়ার বিষয়ে বেশ উদাসীন। বছরের পর বছর বিল পরিশোধ করেননি অনেকেই। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে ওয়াসা চালু হওয়ার আগের বিলও বকেয়া রয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বকেয়া আদায়ে বিলখেলাপি আবাসিক ও অনাবাসিক গ্রাহকদের তালিকা তৈরি করেছে ওয়াসা কর্র্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় এরমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধের জন্য নোটিসও পাঠানো হয়েছে।
রাজশাহী ওয়াসার রাজস্ব কর্মকর্তা মেহদি হাসান দেশ রূপান্তরকে জানান, রাজশাহীতে পানির সংযোগ রয়েছে ৪৩ হাজার ৭৩২টি। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী এসব গ্রাহকের মধ্যে প্রায় তিন হাজার গ্রাহক নিয়মিত বিল পরিশোধ করছে না বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের তালিকা ও বকেয়া বিলের পরিমাণ চূড়ান্ত করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত বিলখেলাপিদের মধ্যে সর্বনি¤œ ৭৫ টাকা ও সর্বোচ্চ বিল বকেয়া রয়েছে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৭৮০ টাকা। বকেয়া বিলের ওই তালিকা ঘেঁটে দেখা যায়, ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কাছে বকেয়ার পরিমাণ ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৭৮০ টাকা এবং রাজশাহী বিভাগীয় সাধারণ গ্রন্থাগারের কাছে পাওনা রয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৩৮ টাকা। এছাড়া সরকারি নিউ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রবাসের কাছে ২ লাখ ২১ হাজার ৫শ’ টাকা, মহিলা কলেজ ছাত্রীনিবাসের কাছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৫০ টাকা, রাজশাহী মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষের কাছে ১ লাখ ৪ হাজার ১ টাকা, সাহেববাজারের বাসিন্দা নুরুজ্জামান পিটারের কাছে ৯১ হাজার ৮০ টাকা এবং নামো ভদ্রার বাসিন্দা আবুল বাসার মৃধার কাছে ৭৪ হাজার ৫২০ টাকা পাওনা রয়েছে।
ওয়াসা কর্মকর্তারা আরও জানান, ডিসেম্বর পর্যন্ত ওই তালিকার পর হালনাগাদ আরেকটি তালিকা তৈরির কাজ এখন চলছে। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত সময়ের হিসাব যুক্ত করে এই তালিকাটি করা হচ্ছে।
এদিকে বিল না দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে নিউ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ এসএম জার্জিস কাদির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কোনো বিল বাকি থাকার কথা নয়। আমরা এ বছর সব থেকে বেশি সরকারি কর পরিশোধ করে রাজশাহীতে প্রথম হয়েছি। তারপরও খোঁজ নেব, যদি বাকি থেকে থাকে তা হলে তা দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
অন্যদিকে রাজশাহী বিভাগীয় সাধারণ গ্রন্থাগারের উপ-পরিচালক আবু সাঈদ বলেন, ‘আমাদের এত টাকা বিল বকেয়া আছে, এটা আমরা জানতামই না। গত বছরে শেষের দিকে আমাদের এখানে পানির লাইনে সমস্যা দেখা দেওয়ায় আমরা ওয়াসায় যোগাযোগ করি। তখন তারা বলে, আমাদের কাছে বড় অঙ্কের বিল বকেয়া হয়েছে। পরে তারা চার লাখেরও বেশি টাকার একটি বিল দিয়েছে। এর আগে কখনই এই গ্রন্থাগারে কোনো বিল পাঠানো হয়নি। বিল দেওয়াও হয়নি। এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। হঠাৎ করে এত টাকা বিল এলে তো আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওয়াসার বিল পাওয়ার পর আমরা বিষয়টি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে অবগত করি এবং বিলের টাকার জন্য আবেদন করি। পরে তারা বিলের জন্য ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। তবে এখনো ওই টাকা হাতে পাইনি। হাতে পেলে ওয়াসার সঙ্গে কথা বলব।’
ওয়াসার তালিকাভুক্ত আরেক বিলখেলাপি প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট লাইফ ইনস্যুরেন্স রাজশাহী জেলার ভাইস প্রেসিডেন্ট মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ওয়াসার ভুল বোঝাবুঝির কারণে বিল বাকি ছিল। সম্প্রতি দুই কিস্তিতে ওয়াসার বিল পরিশোধ করা হয়েছে।’
খেলাপি বিল আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী ওয়াসার বাজেট কর্মকর্তা আবদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার থেকে পর্যাপ্ত বাজেট আসে। এ কারণে এখন পর্যন্ত সমস্যা হয়নি। তবে অদূর ভবিষ্যতে বিশাল অঙ্কের এই বিল আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।’
অন্যদিকে রাজশাহী ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম তুহিনুর আলম বলেন, ‘যাদের কাছে বিল বকেয়া রয়েছে তাদের তালিকা করা হয়েছে। বিল পরিশোধের জন্য এরই মধ্যে গ্রাহকদের অবগত করা হয়েছে। আমরা খুব শিগগিরই বিল আদায়ের জন্য মাঠে নামব। প্রথমে বিল পরিশোধের জন্য মাইকিং করা হবে। এরপরও যারা বিল পরিশোধ করবে না তাদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’