নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনকে দুভাগে বিভক্ত করেছে শীতলক্ষ্যা নদী। এর পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ শহর ও সিদ্ধিরগঞ্জ এবং পূর্বপাড়ে বন্দর থানা এলাকা। মহানগরীর মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌ-নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নৌ-পুলিশ এবং চলাচলকারী নৌযানের ট্রাফিক ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে বালুবাহী বাল্কহেডগুলো থেকে চাঁদা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। নদীটির কয়েকটি পয়েন্টে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা নিজেরাই এবং নৌ-পুলিশের নামে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কয়েকটি বাহিনী ট্রলার নিয়ে প্রতিদিনই বাল্কহেডপ্রতি ৫০ থেকে ১ হাজার টাকা করে চাঁদা তুলছে। আর দাবিকৃত চাঁদার টাকা না দিলে মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ করেছেন বাল্কহেডগুলোর ভুক্তভোগী শ্রমিকরা।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে শত শত বালুবাহী বাল্কহেড। বিভিন্ন সময়ে অনিয়ন্ত্রিত এসব বাল্কহেডের ধাক্কায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। তবে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-পুলিশসহ বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা দিয়ে যথারীতি চলাচল করছে এসব বাল্কহেড।
সম্প্রতি সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা-বুড়িগঙ্গা নদীর মোহনার কাছাকাছি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ট্রলার নিয়ে বালুবাহী বাল্কহেডের পেছনে পেছনে ছুটছে একদল মানুষ। তারা প্রতিটি বাল্কহেড থেকে ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছে। সেখানে নারায়ণগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএ’র একটি দলও চলন্ত প্রতিটি বালুবাহী বাল্কহেড থেকে টাকা আদায় করছিল। কারণ জানতে চাইলে তারা বলে, বিআইডব্লিউটিএ’র ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু টাকা প্রদানকারী বাল্কহেডের সুকানি, সারেং ও বালু শ্রমিকরা জানালেন, তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও কোনো রসিদ দেওয়া হচ্ছে না। তবে বিআইডব্লিউটিএ’র ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, কনজারভেটের (অভিযানের নাম) মাধ্যমে টাকা আদায় করা হচ্ছে এবং যথারীতি তার রসিদও দেওয়া হচ্ছে।
একটি বাল্কহেডের ভুক্তভোগী সুকানি আজাদ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হঠাৎ করে বাল্কহেড থামাতে বলেন কয়েকজন। পরে জানান, তারা বিআইডব্লিউটিএ’র লোক। কর্মকর্তারা কাগজ দেখতে চাইলে তাদের তা দেখালাম। সব কাগজ দেখার পর তারা ১ হাজার টাকা নিলেন, কিন্তু কোনো রসিদ দেননি।’
অভিযানের নামে রসিদ ছাড়া টাকা আদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঘটনাস্থলে থাকা বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সমর কৃষ্ণ সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে আমাদের লোক আছে। আমরা বাল্কহেডগুলোকে আটক করছি। সবগুলো থেকে ১ হাজার করে টাকা নিচ্ছি। মানি রিসিট পরে দেওয়া হবে। আমরা ফিটনেস দেখছি না, এখন শুধু কনজারভেট করছি। তবে অন্য সময় আমরা ফিটনেসও দেখি।’
এদিকে শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌ-পুলিশের নামে বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে বন্দর থানা এলাকার কুড়িপাড়ার মনির বাহিনীর বিরুদ্ধে। ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে আদমজী, সাইলো ও চর সুমিলপাড়া এলাকা দিয়ে নদীতে চলাচলরত বাল্কহেড থেকে ৫০০ ও ১ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করছে এই বাহিনী। প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করছে মনির বাহিনী। চাঁদা না দিলে অমানবিক নির্যাতন করা হয় বলে ট্রলার মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সবুজ সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নৌপথের চাঁদাবাজি এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। শীতলক্ষ্যা দিয়ে চলাচলকারী বাল্কহেড থেকে বেপরোয়াভাবে চাঁদা তোলা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ’র ট্রাফিক বিভাগের কিছু কর্মকর্তা রয়েছেন যারা যখন-তখন লাইসেন্স দেখাতে বলেন। তখন তাদের তাৎক্ষণিকভাবে তা দেখাতে না পারলে টাকা দিতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইনে আছে চলন্ত বালুবাহী বাল্কহেডের গতিরোধ করে টাকা আদায় করা যাবে না। কিন্তু তারা তা করছেন। আমরা এই মহামারী ভোগান্তিতে আছি।’
অভিযানের নামে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের পরিচালক মো. জাফর হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শীতলক্ষ্যা নদীতে ট্রাফিক বিভাগের কোনো অভিযান চলছে বলে আমার জানা নেই। তবে অর্থ বিভাগের কমিটির মাধ্যমে অনেক সময় এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু আপনার বক্তব্য অনুযায়ী যেহেতু ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছিলেন, তাই বিষয়টি তদন্ত করে যদি কোনো অনিয়ম পাই তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে নৌ-পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আবদুল হাকিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ আমার জানা নেই। কেউ অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’