খুনের নেপথ্যে শ্যালিকার সঙ্গে ‘অনৈতিক’ সম্পর্ক

রাজধানীর বাংলামোটরে সাবিকুন্নাহার সাবিনা (২৬)  নামে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার অভিযোগে স্বামী কাজী মাসুদ রানাকে আটক করেছে পুলিশ।

শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ  বাংলামোটরের ওই বাসা থেকে সাবিনার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

বাংলামোটর পেট্রল পাম্প গলির একাধিক  বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সাবিনা ইয়াসমিন ও মাসুদ দম্পতি দীর্ঘদিন ধরেই পেট্রল পাম্পের গলির (নিউ ইস্কাটন) ৬৭/বি নম্বর টিনশেড বাড়ির একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। এই দম্পতির ১১ বছরের এক ছেলে ও ৯ বছরের এক মেয়ে সন্তান রয়েছে। মাসুদ রানা পেশায় প্রাইভেটকার চালক ও সাবিনা বাসায় সেলাইয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন। প্রায় বছরখানেক আগে তাদের সংসারে সাবিনার ছোট বোন আসার পর থেকেই কলহ শুরু হয়।

প্রতিবেশী একজন ভাড়াটিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনের ছোট বোনের সঙ্গে মাসুদের অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। এটি নিয়েই তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কলহ চলছিল। সম্প্রতি সাবিনা ইয়াসমিন জানতে পারেন, তার স্বামী গোপনে তারই ছোট বোনকে বিয়ে করেছেন। এই সম্পর্কের প্রতিবাদ করার জের ধরে গত কয়েক দিন ধরেই সাবিনার ওপর নির্যাতন চলছিল। বুধবার সাবিনার মামাতো ভাই সাবিনার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। একই সঙ্গে সাবিনার ছোট বোনকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিয়ে যান। বৃহস্পতিবার থেকে আবারও সাবিনার ওপর নির্যাতন শুরু করে তার স্বামী।

মৃত সাবিনার মামাতো ভাই শেখ ইয়ামিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে সাবিনা তার  ছোট বোন নুন্নাহারের সঙ্গে মাসুদ রানাকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেন। এ সময় তিনি তার ছোট বোনকে দুটি চড় মারেন। এরপর সেই গভীর রাত থেকেই মাসুদ রানা ও নুন্নাহার দুজনে মিলে সাবিনাকে রড দিয়ে পেটাতে থাকে। প্রায় এক ঘণ্টা পেটানোর সময় তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করতে গেলে মাসুদ রানা ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাদের ধাওয়া করে। এ সময় ভয়ে আর কেউ সেখানে যাননি। ততক্ষণে সাবিনা রক্তাক্ত অবস্থায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকেন।

ইয়ামিন বলেন, আমি বুধবার সকাল ৯টার দিকে ওই বাসায় গিয়ে সাবিনাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে একদিন চিকিৎসার পর বৃহস্পতিবার আবার বাসায় দিয়ে আসি। তখনো সাবিনা ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না। তার পা ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জখম ছিল। তারপরও মাসুদ রানার এক ভাই ও বোনকে ডেকে নিয়ে তাদের মাধ্যমে দুজনকে বুঝিয়ে আমি আমার বাসায় চলে যাই। সাবিনার ছোট বোন নুন্নাহারকেও গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে পাঠিয়ে দেই। এরপর শুক্রবার সকালে মাসুদ রানার পরিবারের একজন জানান, সাবিনা খুব অসুস্থ, তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।  খবর পেয়েই হাসপাতালের দিকে রওনা হই। সেখানে যেতে যেতেই আবার ফোন করে বলা হয়, সাবিনা আর বেঁচে নেই।

তিনি বলেন, আমার মনে হচ্ছে সাবিনাকে বাসায় দিয়ে আসার পর তার স্বামী বিষজাতীয় কিছু খাইয়ে হত্যা করেছে। কারণ তার মুখ দিয়ে  লালা গড়িয়ে পড়তে দেখেছি আমি। এখন ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

হাতিরঝিল থানার ওসি মো. ইকবাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, খুনের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মাসুদকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ তার স্ত্রীকে মারধরের কথা স্বীকার করেছে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও কলহের কারণেই তাকে পিটিয়েছে বলে জানিয়েছে। তবে পারিবারিক দ্বন্দ্বের প্রকৃত কারণ কী সে বিষয়ে এখনই বলা যাচ্ছে না।

সাবিনার স্বজন ও পুলিশ জানায়, গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়া উপজেলার গিমাডাঙ্গা গ্রামের আওলাদ সরকারের মেয়ে সাবিনা। প্রায় ১০ বছর আগে যশোরের বাসিন্দা মাসুদ রানার সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় তাদের।  চতুর্থ ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে তাদের ঘরে।

বাংলামোটরের সাবিনার আরেক প্রতিবেশী দেশ রূপান্তরকে বলেন, শ্যালিকা নুন্নাহারকে গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর পর থেকেই ফের সাবিনাকে মারধর করেন তার স্বামী মাসুদ। চিকিৎসা না করিয়ে ঘরেই আটকে রাখেন। এরপর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে লাশ নিয়ে সরাসরি বাসায় আসার পর পুলিশ খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাকিল জোয়ারদার জানান, খবর পেয়ে ওই বাসা থেকে সাবিনার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তার ডান পায়ে ব্যান্ডেজ, মাথায় ও শরীরে আরো বেশ কিছু জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পারিবারিক কলহের জের ধরে  স্বামীর মারধরের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে যাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে তাদের সবাইকে আসামি করা হবে।