স্কুল কী, কখনো দেখেনি সে। তবে প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ কিংবা কোডিংয়ের কথা শুনলে মুখে ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যের হাসি। দুই বছর বয়স থেকে কম্পিউটারের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা শিশুটি আজ বছর তেরোর কিশোর। বহু গেমের উদ্ভাবক! বাংলাদেশের বুকে দিনকে দিন অবিশ্বাস্য সব ইতিহাস লিখে চলা ওয়াসিক ফারহান রূপকথার গল্প শোনাচ্ছেন অমৃত মলঙ্গী
দোতলায় উঠে সোজা তাকাতেই যে ফ্ল্যাটটি, ওখানে রূপকথা থাকে। রাজধানীর নিকেতনের ছয় নম্বর রোডের সাদা বাড়িটির দারোয়ান এভাবে দেখিয়ে দিলেন রূপকথাদের ঘর। দরজা খুলতেই টকটকে লাল টি-শার্ট পরা এক বালকের আবির্ভাব। পেছনের জানালা ভেদ করে আসা রোদ সেই লালের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। আভা ছড়িয়েছে গোটা মুখে। সঙ্গে যোগ হয়েছে হাসি। লাজুক হাসির এই ছেলেটি আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগে ‘রিপলিস বিলিভ ইট অর নট’ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে কনিষ্ঠ কম্পিউটার প্রোগ্রামারের খেতাব পেয়েছে। দেশের অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি বইয়ে তাকে নিয়ে আছে আলাদা অধ্যায়। নাম উঠেছে গিনেস বুকে। তার দুটি গেম গুগল প্লেস্টোরে এখন শীর্ষে। অথচ নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা!
কীভাবে সম্ভব?
এই প্রশ্নটি বহু মানুষের। কিন্তু উত্তর পাওয়া দায়। কারণ রূপকথার মা সিনথিয়া ফারহান ও বাবা ইমদাদুল হকের কাছেও এটা বিস্ময়। তবে রূপকথার কাছে একটি উত্তর আছে।
‘একা একা শিখেছি’ ঘণ্টাখানেকের আলাপে রূপকথা ইংরেজিতে এই কথাটি বলেছে প্রায় দশবার। অনেক সাধারণ মানুষও এটি বিশ্বাস করতে চায় না। কিন্তু গিনেস বুক যখন তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তখন তো সেটি মানতেই হবে।
কয়েকজন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকের সামনে রূপকথা তার কম্পিউটারে পারদর্শিতা দেখায়। পুরো বিষয়টি ভিডিও করে অসম্পাদিত অবস্থায় গিনেস বুক কর্র্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। এই ভিডিও ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাগজপত্র দেখে গিনেস তাকে স্বীকৃতি দেয়।
রূপকথা কি আসলে কোনোদিন স্কুলে যায়নি?
না। সে কোনোদিন স্কুলে যায়নি। সব শিখেছে ইন্টারনেটে। মা সিনথিয়া ফারহানেরও গেমের প্রতি দারুণ ঝোঁক। রূপকথা গর্ভে থাকা অবস্থায় কখনো কখনো ১২-১৩ ঘণ্টা করে গেম খেলতেন। তাহলে ছেলে কি ওই গর্ভে বসেই গেমবিষয়ক জ্ঞান অর্জন করেছে?
সিনথিয়া এটি আবার মানতে নারাজ। বললেন, ‘নাসায় তো কত নারী কাজ করেন। অনেকে গর্ভবতী থাকা অবস্থায় গবেষণা করেন। এ সবক্ষেত্রে তো সন্তানরা তাদের মতো হয় না।’
তাহলে রহস্য কোথায়?
স্ত্রীর কথা থামিয়ে স্বামী ইমদাদুল হক বললেন, ‘পৃথিবীতে কিছু কিছু ব্যাপার থাকে, যার কোনো ব্যাখ্যা হয় না। বড় বড় বিজ্ঞানীও এটা স্বীকার করেন। রূপকথা আমাদের কাছে তেমনই। ও গড গিফটেড তো বটেই, সুপার ন্যাচারাল!’
রূপকথা বাংলা বলতে পারলেও অতটা সাবলীল নয়। কথা বলানোটাও কষ্ট। আবার যত বড় হচ্ছে লজ্জাটাও বাড়ছে। ইন্টারনেটে থাকতে থাকতে ইংরেজিতে দক্ষতা তৈরি হয়েছে বেশি। কোডিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে তাই ইংরেজিতে চলল কথোপকথন। প্রসঙ্গ তার তৈরি গেম।
‘গ্রহ-উপগ্রহ থেকে ছুটে আসা উল্কা আর ভিনগ্রহের প্রাণী থেকে পৃথিবীকে সুরক্ষিত রাখার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ইউনিটি প্ল্যাটফর্মে সি শার্প প্রোগ্রামিং ভাষায় তৈরি করেছি স্পেস কলাইডার। নতুন প্রজন্মের গেমাররা যাতে নৃশংসতার পরিবর্তে পৃথিবীকে ভালোবাসে, সে লক্ষ্যে গেমটি তৈরি।’
রূপকথা জানায়, ৭৭ মেগাবাইটের গেমটি অ্যান্ড্রয়েড ৪ দশমিক ১ বা তার পরের সব সংস্করণ সমর্থন করে। বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে এটি ডাউনলোড হচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি আফ্রিকা থেকেও। ভারত, সৌদি আরব, কুয়েত, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও গেমটি প্রশংসিত হচ্ছে।
গেমারকে পৃথিবী রক্ষায় মহাকাশযান চালাতে হবে। গেমটির ধাপ ১৩টি। গেমের সারভাইভাল মোডে প্রতিটি তরঙ্গে এলিয়েনরা নড়াচড়া করে ও দ্রুত গুলি চালায়। সারভাইভাল মোডে ইজি, নরমাল, হার্ড ও নাইটমেয়ার মোড রয়েছে। গেমে নতুন এলিয়েন গ্রুপ পাওয়া যাবে। গেমে উল্কা ধ্বংস করতে পারলে তা আবার ছোট ছোট উল্কায় রূপান্তরিত হবে।
এই গেমটি আপলোড করতে গিয়ে রূপকথা ছোট একটি সমস্যার মুখোমুখি হয়। আপলোড হচ্ছিল না। অবিশ্বাস্য রূপকথা সেই সমস্যাকে পরিণত করেছে নতুন সম্ভাবনায়। তখন আরেকটি গেম বানিয়ে ফেলে ডিফেন্ড দ্য আর্থ!
আর্কেড ঘরানার শ্যুটার গেমটি ইতিমধ্যেই ডাউনলোড হয়েছে প্রায় ৯ হাজার বার। গেমটি রেকর্ড পরিমাণ ডাউনলোড হয় ৩ সেপ্টেম্বর। এদিন তিন হাজারেরও বেশিবার ডাউনলোড হয়।
মঙ্গলবার পর্যন্ত গেমটি ৪.৮ রেটিং পেয়েছে সাড়ে ৮ হাজারের বেশিবার। বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে ডাউনলোড হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা এবং আফ্রিকাতেও।
বর্তমানে সে ইউনিটি প্ল্যাটফর্মে একটি থার্ড পারসন শ্যুটার গেম তৈরি করছে। ডিফেন্ড দ্য আর্থ এবং স্পেস কলাইডার গেম দুটি মোবাইলের পাশাপাশি পিসিতেও খেলা যায়। পিসি সংস্করণটি রয়েছে রূপকথা স্টুডিও ওয়েবসাইটে।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গেমও বানাচ্ছে রূপকথা। বাবার কাছে শুনছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প। নিজেও করছে গবেষণা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কয়েকটি গেম দেখার পর সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সবার থেকে আলাদা কিছু করবে। তার ইচ্ছা পাহাড়ের যুদ্ধবিষয়ক কোনো গল্পকে কেন্দ্র করে গেম বানানোর।
রূপকথার ইচ্ছা, রূপকথার স্বপ্ন
তার দিনরাত পার হয় একটি প্যাশনকে কেন্দ্র করে। সেটিই তার শখ, সেটিই তার ধ্যানজ্ঞান গেম ডেভেলপমেন্ট।
এর বাইরে রূপকথার জানাশোনা খুব একটা নেই। বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান কিংবা বিখ্যাত কোনো অভিনেতাও তার পরিচিত নয়। তবে দুনিয়ার নামকরা প্রযুক্তিবিদরা ঠিকই তার ‘চেনা’!
‘সুযোগ পেলে কার সঙ্গে দেখা করতে চাও’ প্রশ্নটি করতেই খুব আস্তে বিল গেটসের নাম বলে। তার সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা আছে? রূপকথা আবার ফিরে যায় নিজের প্যাশনের কাছে, ‘না। কাজ করব না। আমি তো গেম ডেভেলপ করে যেতে চাই।’
সমবয়সীদের জন্য রূপকথার পরামর্শ
যারা আমার মতো হতে চায় তাদের ইন্টারনেটে কোডিং শেখা উচিত। শুরুতে সহজ সহজ বিষয় শিখতে হবে। তারপর কঠিন। ইংরেজি জানতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। তবে জানা থাকলে ভালো কাজে আসবে।
মা-বাবার পরিকল্পনা
একমাত্র সন্তান রূপকথা একদিন বাংলাদেশের নাম সারা পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে দেবে, সেই স্বপ্ন দেখেন তার মা-বাবা। এ জন্য সরকারের কাছে তাদের কিছু চাওয়ার নেই। তারা বলেন, ‘আমাদের তো কিছু দরকার নেই। যে সামর্থ্য আছে তা দিয়েই ওকে বড় করতে পারছি,’ ইমদাদুল হক বলেন, ‘কিন্তু রাষ্ট্র যদি তার দায়িত্ব নিতে চায়, বড় কিছু অর্জন করতে, তবে তাকে নিতে পারে। দেশের জন্য আমি আমার রূপকথাকে উপহার দিয়ে দেব।’
রূপকথা কী চায়
নিজেদের একটা বাড়ি হবে। অনেক বড় সে বাড়ি। অনেক জায়গা থাকবে। থাকবে একটা ল্যাব। সেখানে রাতদিন চলবে গবেষণা। তবে রূপকথার মাঝে মাঝে ভারী মন খারাপ হয়। তার কথা বলা, চলাফেরার ধরন নিয়ে অনলাইনে অনেকে হেনস্তা করে! তার যোগ্যতাকে কেউ কেউ ভুয়া প্রমাণ করতে চায়। একদিন নাকি খুনের হুমকিও এসেছে! রূপকথার বাবা ইতিমধ্যে সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ তুলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে তার বাবা যখন আক্ষেপ করছিলেন, তখন রূপকথাও যোগ দেয়। হাসিতে ভাসতে থাকা ছেলেটা হঠাৎ মনমরা হয়ে যায়।
‘ওদের বিচার করবে সৃষ্টিকর্তা,’ বলতে বলতে আবার রূপকথা হাসতে থাকে। বিদায় চাইতে গেলে সবাইকে অবাক করে কপালে এঁকে দেয় চুমু! কেউ একজন চলে যাচ্ছেন, এটি বুঝতে পেরে বিড়বিড় করে বলতে থাকে অদ্ভুত একটি বাক্য; যার অর্থ বের করা কঠিন- ‘সবাই চলে যায়, সবাই আসে...।’