‘প্রতিবন্ধকতা মানেই অক্ষমতা নয়’। এই স্লোগানের মূল বাণী হচ্ছে আমরা যাদেরকে তথাকথিত প্রতিবন্ধী বলি, তাদেরও রয়েছে অনেক সুপ্ত সম্ভাবনা, যাকে কাজে লাগিয়ে আমরা তাদেরকে সক্ষম ও প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে তুলে আনতে পারি। মানসিক প্রতিবন্ধকতা, শিক্ষণ অক্ষমতা, বিকাশজনিত অক্ষমতা অথবা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা যে নামকরণই করি না কেন, তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে সর্বোত্তম বিকাশের সুযোগ।
তার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো : শিউলি আক্তার সাথী যিনি একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। তবে তিনি তার প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে হয়ে উঠেছেন এক সাফল্যমণ্ডিত ব্যক্তি। তার সাফল্যের ঝুলিতে রয়েছে সোনা, রূপা ও ব্রোঞ্জের মেডেল।
২০১২ সালের ব্রুনাইয়ের স্পেশাল অলিম্পিকে 'বউচি' খেলায় তিনটা সোনা, একটি রূপা ও একটি ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছেন।
এর আগে ২০০৫ সালে ব্রুনাইয়ের এশিয়া প্যাসিফিক স্পেশাল অলিম্পিক ও ২০০৭ চীনের সাংহাই স্পেশাল অলিম্পিকে ব্যাডমিন্টন খেলায় সর্বমোট ছয়টি পদক জিতেছেন। বিশ্বে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। শুধুমাত্র খেলায় নয় তিনি নাচ ও গানে সমানভাবে পারদর্শী। দিল্লির একটি প্রতিযোগিতায় সুন্দর গান গাওয়ার জন্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
এছাড়া ভারত কর্তৃক আয়োজিত কয়েকটি দেশের সমন্বিত অংশগ্রহণে একটি নাচের প্রতিযোগিতায় তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং পুরস্কার লাভ করেন।
কিন্তু তার এই প্রতিবন্ধকতা জয় করার পেছনের গল্প মোটেই সহজ ছিল না। পদে পদে হোঁচট খেয়েছেন। এই কণ্টকাকীর্ণ পথে যুদ্ধ করার সময় সমাজ থেকে কোনোরূপ সাহায্য পাননি। পরিবারে ছিল আর্থিক অস্বচ্ছলতা।
শিউলি আক্তার সাথীর জন্ম হয় ছয় মাসে। লিকলিকে অপুষ্ট শরীর ছিল শিউলির। জন্মের পর প্রায় সাত দিন পর্যন্ত তিনি চোখ মেলতে পারেননি। তার এমন শারীরিক অবস্থা মা ও ধাই মায়ের একমাত্র চিন্তার কারণ হয়ে পড়েছিলেন। জন্মের পর থেকে প্রায় ১৫ বছর পর্যন্ত নিজ পায়ে ভালোভাবে দাঁড়াতে পারতেন না। কোনো কিছু ধরে তাকে হাঁটতে হতো কারণ দুই পায়ে শক্তি ছিল না। কথার মধ্যে অনেক জড়তা ছিল। এজন্য তাকে অনেক কটুকথাও শুনতে হয়েছে। তার বাবা ছিলেন একজন রিকশাওয়ালা। তার পক্ষে চিকিৎসা করানোর মত সামর্থ্য ছিল না। তবুও তিনি থেমে ছিলেন না। বাবা ও মায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সুইড বাংলাদেশে (গেণ্ডারিয়া শাখা) ভর্তি হন। এরপর তার জীবনের মোড়ক একটু একটু করে উন্মোচন হতে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, তার সহপাঠী, অভিভাবকগণ নানাভাবে তাকে সাহায্য- সহযোগিতা করে।
তার অন্তর্নিহিত সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হতে থাকে। তার মেধার বলেই বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেয় কখনো খেলার জন্য কখনো নাচ, গানের জন্য।
কিন্তু কণ্টকাকীর্ণ পথ তার পিছু ছাড়েনি। তার বাবা ছিলেন ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোমরে গুরুতর আঘাত পান। তার অপারেশন করা জরুরি হয়ে পড়ে। শিউলির তিন বোন ও দুই ভাই। তার ভাই ও বোনেরা দারিদ্রতার জন্য বাবাকে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারেননি। কিন্তু শিউলি আক্তার সাথী হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন।
বাবা ও মা তার জীবনের একমাত্র পরম সম্পদ। ভাগ্যক্রমে তিনি গ্রামীণফোন কোম্পানি কর্তৃক একটি বিজ্ঞাপনে 'যাবো বহুদূর' অভিনয় করার সুযোগ পান। এই জন্য গ্রামীণফোন তাকে দুই লাখ টাকা দেন। যা আজও তিনি শ্রদ্ধার সাথে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এর পাশাপাশি তিনি সমাজে একটি পরিচিত মুখ হয়ে যান। বিভিন্ন বিলবোর্ডে তার ছবি দেখা যেত। এছাড়া সরকার থেকে ১০,০০০ টাকা পান। যা দিয়ে তিনি তার বাবার চিকিৎসা করান। কিন্তু তার বাবা কিছুদিন পর মারা যান।
তার সংগ্রামী জীবন তবুও পিছু ছাড়েনি। ভাই-বোন থাকা সত্ত্বেও তিনি ও তার মা আলাদা বাসায় থাকেন। এখন সবকিছুর দায়িত্ব শিউলি আক্তারের। বাড়িভাড়া, দৈনন্দিন জীবনযাপন চলার জন্য যা লাগে তার সবকিছুই শিউলি আক্তার করে থাকেন।
বর্তমানে তিনি সুইড ল্যাবরেটরি মডেল স্কুল ( ৪/এ, ইস্কাটন গার্ডেন) এর সহকারী নাচ ও গানের শিক্ষক। তার বেতন প্রায় ১৬০০ টাকা। তবে তিনি নিয়মিত বেতন পান না। যেখানে তার বাড়ি ভাড়া ৫৫০০ টাকা। তার প্রাত্যহিক জীবনযাপন অনেক কষ্টের ও সংগ্রামের। এই কথাগুলো বলতে বলতেই তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে।
তার দীর্ঘশ্বাস বুঝিয়ে দেয় আমাদের সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও অসচেতনতা। এত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও এই সমাজ তাকে তেমনভাবে মূল্যায়ন দেয় না। কখনো ভালোভাবে তাকে বা তার প্রতিভাকে গ্রহণ করেনি বরং প্রতিবন্ধী বলে মনে করে যা শিউলি আক্তার সাথী মানতে নারাজ।
তিনি নিজেকে আর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হিসেবে পরিচয় দেন না। এত সাফল্য, প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তিনি সঠিক মূল্যায়ন পান না। এই পৃথিবীতে তার মা ছাড়া তেমন কোনো ব্যক্তি নেই যার সাথে তিনি তার স্বপ্ন, সুখ, দুঃখ ভাগ করে নেবেন। তার ভাই ও বোন দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। এই সমাজ যদি তার মূল্য দিত তাহলে সাধারণ মানুষের মতো দিনাতিপাত করতে পারত। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর নিকষ কালো অন্ধকার পর্যন্ত নিজের সাথে, চারপাশের পরিবেশের সাথে হয়ত এত স্নায়ুযুদ্ধ করতে হত না।
লেখক: তন্বী আক্তার
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।