কফিনের শেষ পেরেক

আমাজনে এখন শেষ লড়াই চলছে প্রাণী ও মানুষের মধ্যে। বনটির উভচর এবং সরীসৃপ জাত নিয়ে লিখেছেন রাজু আহমেদ

আমাজনে জলে ও স্থলে বাস করতে পারে, এমন উভচর ও সরীসৃপ বহু প্রজাতি আছে। সেগুলোর মধ্যে সাপ, গিরগিটি, অমসৃণ ত্বকবিশিষ্ট ব্যাঙ জাতীয় প্রাণী, প্রজনন ঋতু ছাড়া অন্য মৌসুমে যারা ডাঙাতেই বাস করে আছে। তবে বনমালার অল্প পরিচিত এমন এক উভচর টাক্সা; সেগুলোর পা নেই, শরীর আংটির মতো গোলাকার। বনের সরীসৃপ ও উভচরের তালিকায় ক্যাসেলিয়ানস আছে। ওরা মাটিতে বাস করে, দেখতে সাপের মতো পেঁচানো-বাঁকানো থাকে। শত জাতেরও বেশি ব্যাঙ আছে এখানে। আকার ও রঙের জন্য সেগুলো খুবই বৈচিত্র্যময়। বেড়ানোর সময় একেবারেই ছোট কিছু আপনার আঙুলের মধ্যেই থাকার মতো জায়গা করে নেবে। এমন ব্যাঙও আছে, যেগুলো আধা ফিটেরও বেশি লম্বা হয়। এই বনমালায় বাস করা বেশির ভাগ ব্যাঙ গাছে থাকে। মাটিতে বা পানির কাছের গাছপালা, উদ্ভিদের ভেতরে ডিম পাড়ে। তাতে গাছের গরম বনের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ডিমগুলোকে শুকিয়ে ফেলার হাত থেকে বাঁচায়। অনেক জাতের ব্যাঙ আছে, বিষ ছুড়ে মারে (বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘ড্যানড্রোবেইট’ জাতের ব্যাঙ)। যদিও এগুলো আকারে খুব ছোট (১ দশমিক ৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার লম্বা); অচেনা এই জাতগুলোকে চিনে বিজ্ঞানীরা নামগুলো প্রস্তাব করছেন। বিষাক্ত ব্যাঙগুলো শিকারজীবী অন্য প্রাণীদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে চামড়া থেকে বিষ ছুড়ে মারে। সাধারণভাবে সবাই ডাকেন, ‘বিষ ছুড়ে মারা ব্যাঙ’। শিকার ধরার জন্য ওদের বিষ এক দল আদিবাসী মানুষ তাদের তীরে মাখান।

এই বনমালায় বিশেষভাবে পাওয়া সরীসৃপের মধ্যে আছে, নানা প্রজাতির সাপ, গিরগিটি, কচ্ছপ, কুমির ও কচ্ছপের মতো দেখতে গিরগিটির অন্যতম ‘কাইম্যান।’ এদের কচ্ছপের মতো শক্ত চামড়া আছে। বনে পাওয়া সাপের আট পরিবারের মধ্যে দুটি ‘প্রবাল’ ও মাটির গর্তের বিষাক্ত সাপ; এগুলো মরণ বিষের জন্য পরিচিত। ‘বোয়াস’ ও ‘বয়েনস’ নামে দক্ষিণ আমেরিকার লোকরা ডাকে। সম্ভবত আমাজন অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত সাপ ওরা। আবাসস্থল বৃষ্টি পড়ে বনের এমন সবচেয়ে নিচ ও ওপরের অংশ; একেবারে নিম্মভূমি ও উচ্চভূমি। সব ধরনের বোয়া মাংসাশী; শত্রুকে পুরো শরীর দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে শ্বাসরোধ করে মারে। দক্ষিণ আমেরিকার আরেকটি পুরোপুরি আলাদা ও একমাত্র পাওয়া সরীসৃপ ‘দি সাউথ আমেরিকান রিভার টার্টেল (পোদোকনিমিস এক্সপানসা-বৈজ্ঞানিক নাম)’। ১৫৮ মিলিয়ন বছর আগে এই পৃথিবীতে এসেছে। আমাজনেও কিছুকাল বাস করেছে। আবাসস্থলের ব্যাপারে ওরা খুব বেশি স্পর্শকাতর; তাই এটিই বনের অবস্থার সবচেয়ে ভালো নির্দেশক প্রজাতি; স্বাস্থ্য ও উপস্থিতিতে চারপাশের প্রাণ-প্রতিবেশের প্রতিফলন ঘটায়। নদীর কাছিমগুলো সরকার ও জনগণের অল্প সচেতনতায় টিকে আছে কোনোমতে। ফলে আইইউসিএনের (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন ফর নেচার) লাল তালিকাভুক্ত; মানে খুব বেশি বিপন্ন। দক্ষিণ আমেরিকার নদীগুলোর এই কচ্ছপ খাবার জোগাতে মাছ ধরার আসল কাজটিও করতে পারছে না নদীদূষণ ও মাছের অভাবে; মানুষ তাদের অনুকূল বেঁচে থাকার অবস্থা নষ্ট করে ফেলছে, ডিম ও খাদ্য হিসেবে শরীরের মাংস খাওয়ার লোভে কাছিমগুলোকে ব্যাপকভাবে শিকার করা হচ্ছে। এভাবেই আসলে আমাজনের উভচর ও সরীসৃপ প্রজাতিগুলো মানুষের নানা ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে হুমকিতে। সরাসরি হুমকি হলো বাসায় পোষা প্রাণী হিসেবে রাখার জন্য তাদের ধরার অবৈধ ব্যবসা। চাষাবাদের জন্য বন কেটে ফেলায় অপ্রত্যক্ষ হুমকির মোকাবিলাও করছে। তাতে আবাস হারিয়ে যাচ্ছে। ২০১৫ সালের এক গবেষণায় জানা গেছে, বেশি জায়গা থাকায় এই প্রাকৃতিক আবাসভূমিতে তুলনামূলক ভালো জীববৈচিত্র্যতে প্রজাতিগুলোর খুব অবস্থা আছে। তবে চারণভূমি জোগাড়সহ অন্যান্য মানুষের করে যাওয়া ক্ষতিতে এই আবাসেও তাদের জীববৈচিত্র্য কমিয়ে ফেলছে। বনমালার নানা ধরনের প্রজাতিকে আক্রমণাত্মক করে তুলছে।