শোক হলো শক্তি

ভাইকে নিয়ে শুরু করেছিলেন। সেই ভাই নেই, তার নামে গড়েছেন শহীদ মিলন স্মৃতি পাঠাগার। একেবারে গ্রামে কীভাবে তরুণ শেখ মুহাম্মদ আতিফ আসাদের পাঠাগার চলে, তার জীবনই বা কেমন– লিখেছেন তানভীর সিদ্দিক। ছবি তুলেছেন রতন মিয়া

ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলা। এ জেলারই সরিষাবাড়ী উপজেলার ডোয়াইল ইউনিয়নের একটি গ্রাম হাসড়া, মাজালিয়া। এখানেই থাকেন শেখ মুহাম্মদ আতিফ আসাদ  (ফেইসবুকে আছেন Shekh Muhammad Atif Asad নামে)। আতিফ আসাদ নামে পরিচিত। বাবা আফজাল হোসেন দিনমজুর ছিলেন। এখন বয়স ৭০ হয়ে গেছে। আর কাজ করতে পারেন না। বড় ছেলে মারা যাওয়ায় মন ভেঙে গেছে তার। তারই সন্তান আসাদ। গরিবের এই ছেলেটির লেখাপড়ার প্রতি খুব ভালোবাসা। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের একটি পাঠাগার থেকে ধার নিয়ে বই পড়ার শুরু। আস্তে আস্তে পড়ার অভ্যাস বেড়েছে। মুক্তিযুদ্ধ তার ভালো লাগার বিষয়। এরপর হাইস্কুলে ভর্তি হলেন। লেখাপড়া করেছেন তাদের হরখালী মজিবর রহমান আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে। স্কুলে থাকার সময়ও অনেক বই পেয়েছেন পাঠাগারে। তবে পাস করে যাওয়ার পর আর বই পড়ার সুযোগ হলো না সেখানে। এসএসসিতে তার জিপিএ ছিল ৪ দশমিক ৫০। এরপর ভর্তি হলেন পোগলদিঘা ডিগ্রি কলেজে। তবে সেখানে বইপাগল আসাদের বই পড়ার তেমন কোনো সুযোগ হলো না। তাই একটি লাইব্রেরি গড়ার খুব ইচ্ছা হলো তার। কিন্তু তাদের সরিষাবাড়ী উপজেলায় কেউ কোনো পাঠাগার গড়ে তোলেননি। গ্রামের বখাটে ছেলেরা এখন তো অনলাইনেই বই পড়া যায়, পাঠাগারের আর দরকার কী বলে তাকে নিয়ে, তার স্বপ্নটাকেও উপহাস করেছে। নানা জায়গায় পড়লেও তারা বই পড়ার স্বপ্নটাকে ছড়িয়ে দিতে রাজি হলো না। এরপর কী করা যায়, অনেক ভেবে বড় ভাই রবিউল ইসলাম মিলনের সঙ্গে আলাপ করলেন।

ফলে শুরু হয়ে গেল বছরের প্রথম মাসেই তাদের বাড়ির বারান্দাতে একটি গ্রামের লাইব্রেরির যাত্রা। দুই ভাই মিলে সেটির দেখাশোনা করেন। তখন তাদের বই ছিল মাত্র ২০টি। তবে স্বপ্ন তখন থেকেই এটি নিয়ে রক্তের বাঁধনে বাঁধা পড়া দুই ভাইয়ের অনেক। একজন আরেকজনকে পরামর্শ ও সাহায্য করেন। তবে এই ভালোবাসা ছিঁড়ে গেল, পুরো পরিবার ভেঙে পড়ল মিলন মারা যাওয়ার পর। একুশে ফেব্রুয়ারি জমির বিরোধে মিলনকে মেরে ফেলল গ্রামের প্রভাবশালীরা। সেই মামলা এখন চলছে। ভাইকে হারিয়ে তার নামেই পাঠাগারের নাম দিলেন ছোট ভাই– শহীদ মিলন স্মৃতি পাঠাগার। এখন তাতে প্রায় সাড়ে ৫০০ বই আছে। তবে এখনো গ্রামের সেই ছেলেদের বাধা ডিঙাতে হচ্ছে তাদের। তবে ভাই নিজে কিছু করো বলেছিলেন বলে এখনো পাঠাগারের পেছনে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার লাইব্রেরির পাঠকও বাড়তে লাগল শুরু থেকে। প্রথম দিন থেকে আজও সেখানে পড়তে আসেন এলাকার মাহমুদা-সালাম মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞানের এখন অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী শর্মী আক্তার। তিনি আসাদের বড় বোনের মতো, প্রতিবেশীও বটে। প্রথম ২০টি বই তিনিই দিয়েছিলেন। লাইব্রেরিরও জন্ম দিয়েছিলেন সেভাবেই। এখন তিনি গ্রামের কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক। লাইব্রেরিরও নিয়মিত পাঠক। আরেক পাঠক খোকন মিয়া পড়েন অনার্স প্রথম বর্ষে। তারও এই লাইব্রেরির বই খুব ভালো লাগে। সবুজ প্রামাণিক আসাদের অন্যতম বন্ধু। একসঙ্গে দুজনে লেখাপড়া করেন। আসাদ যখন কাজে ব্যস্ত থাকেন, বই নিয়ে এদিক-ওদিক যান; শহীদ মিলন স্মৃতি পাঠাগারের সব বই গুছিয়ে রাখা, কোনো পাঠক এলে তার নাম লিস্ট করে বই ধার দেওয়া, ফেরত বইগুলো গুছিয়ে রাখাসহ সব কাজ সামলে রাখেন। এখন তারা দুই বন্ধুই কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হওয়ার জন্য চেষ্টা করে চলেছেন। তাদের এই পাঠাগারে আছে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের  রোজনামচা, জামালপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, দারুচিনি দ্বীপ, মুহম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন, অপারেশন জ্যাকপটসহ অনেক বই। তবে সেটি ভালো পরিবেশে নেই। বইয়ের তাকগুলো বাড়ির গাছের কাঠ কেটে বানিয়েছেন আসাদ, বারান্দায় শলা দিয়ে তারের বেড়া দিয়ে বানিয়েছেন আলাদা ঘর, এখন একটি আলমিরাতেও বই আছে তাদের। এই আলমিরার টাকা ছয় হাজার দিয়েছেন টাঙ্গাইলের অধিবাসী ও গ্যাসটন ব্যাটারিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কে এইচ মালেক। ফলে ছনের বইয়ের তাক বদলে গিয়েছে। ফেইসবুকে পরিচয়ের পর তিনি এই বছরের জুলাইয়ে মোট ১০০টি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় বই উপহার দিয়েছেন তাকে। তার মতোই অন্যরা আসাদকে সামনাসামনি আর ফেইসবুকের মাধ্যমে সাহায্য করেছেন। ভিয়েতনামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ দিয়েছেন পাঁচ হাজার টাকা। তাদের এই দান ঘিরে যে পাঠাগার আছে একটি প্রত্যন্ত গ্রামে, সেটির দেখাশোনা সময় পেলেই করেন আসাদের মা। জয়নব বিবি মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণি পাস। তবে বড় ছেলের স্মৃতি আর ছোট ছেলের পরিশ্রমের ফসল এই পাঠাগারের সব কাজ তিনিও সামলান। তখন আসাদ বেরিয়ে পড়েন বই নিয়ে। বিভিন্ন চরের, আশপাশের গ্রামের পাঠকদের হাতে বই তুলে দেন। সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন এভাবে সাইকেলে তিনি ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দেন। ফলে একেবারে গ্রামে বই পড়ার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে, অনেকেই বই পড়তে চাইছেন, পড়ছেনও। আবার অনেকের সাহায্যও পেয়েছেন তিনি। ভাই মারা যাওয়ার পর তার বিধবা স্ত্রীসহ নয়জনের পুরো পরিবার যখন অথই সাগরে, তখন আসাদের এইচএসসির ফরম ফিলাপের টাকাও ছিল না। তখন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান তাদের এলাকায় রাজনৈতিক কাজে গিয়েছিলেন। এরপর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির মাধ্যমে আসাদের কথা জেনে তিনি তাকে ফরম ফিলাপের টাকা দিয়েছেন। তাকে ফেইসবুকের মাধ্যমে বই পাঠিয়েছেন অভিনেতা সাঈদ মোশাররফ, সিনেমার অভিনেতা হাসান আহমেদসহ অনেকেই। চাইলে আপনিও তাকে বই দিতে পারেন, ফেইসবুকের মাধ্যমে।

এ ছাড়া আসাদের আছে আদর্শ গ্রাম সমবায় সমিতি। গত বছরের ১৮ আগস্ট এই সমিতির জন্ম। প্রতি মাসে তারা ২০ টাকা করে চাঁদা নেন। ১৭ জনের সমিতিতে এখন আছেন ২৬ জন। অষ্টম শ্রেণি থেকে গ্রামের গৃহবধূও তাদের সদস্য। পাঁচ শতাংশ হারে তারা ঋণ দেন। তাতে অনেকেই হাঁস-মুরগি কিনে স্বাবলম্বী হয়েছেন। সাজেদা বেগম ৫০০ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। এখন তার নিজের কয়টি মুরগি ও ছানা আছে।

এসএসসি ও এইচএসসির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আসাদ এইচএসসিতে পেয়েছেন ৩ দশমিক ৬৭। কখনো দিনমজুর, কখনো রাজমিস্ত্রির কাজ করে তিনি তার লাইব্রেরি এবঙ জীবনের স্বপ্নটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাদের পরিবার এখন চলে ভাই আল আমিনের পেট্রল পাম্পের কর্মচারীর বেতনের টাকায়। দরকারে রডমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেও আসাদ সংসারের ঘানি টানেন। কখনো তিনি রংমিস্ত্রি হয়ে টাকা উপার্জন করেন। তাকে এই সংগ্রামমুখর জীবনে খুব উৎসাহ দেয় ডেল কার্নেগির লেখা। আত্মবিশ্বাস ও চেষ্টা থাকলে জীবনে অনেক কিছুই অর্জন করা সম্ভব বিশ্বাস করেন তিনি।

কখনো যে ছেলেটি টাকার অভাবে ভালো কোনো শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে পারেননি, সেই তিনিই এখন অনেককে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। ময়মনসিংহ শহরের অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের প্রিন্সিপাল অফিসার মোহাম্মদ জুয়েল তার এই পাঠাগার দেখে এবং স্বপ্নপূরণের চেষ্টা জেনে বলেছেন, ‘আমি নিজেও এমন একটি পাঠাগার গড়ব।’