নক্ষত্র হয়ে জ্বলবেন, এই সম্ভাবনার জানান দিয়েই আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি। তার নামের আক্ষরিক অর্থটাও নক্ষত্র- ধ্রুব; আফিফ হোসেন ধ্রুব। কিন্তু ২০১৮ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক অভিষেকটা হলো তার বিভীষিকার। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি অভিষেকেই শূন্য রানে ফিরলেন প্যাভিলিয়নে। জাতীয় দলে আর বিবেচিতই হচ্ছিলেন না হতাশার সেই দিনটির পর থেকে।
দেড় বছর পর আবার যেদিন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামলেন ধ্রুব, সত্যিই সেদিন নক্ষত্র হয়ে জ্বলে উঠলেন মিরপুরের আকাশে। ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টির সিরিজের উদ্বোধনী ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয়টা মুঠো থেকে বেরিয়েই গিয়েছিল যেন। শুক্রবারের ছুটির দিনে বৃষ্টি উপেক্ষা করে গ্যালারিতে দর্শকের ঢল নেমেছিল ঠিকই। বাংলাদেশ জয়ে ফিরবে এই আশায়। কিন্তু গেল কিছুদিনের দুর্দশাগুলোই গোলক ধাঁধা হয়ে ফিরে আসছিল বারবার। পথ আটকে দিচ্ছিল।
সেখান থেকে দলকে পথ দেখালেন ১৯ বছরের ধ্রুব। একটা জয়ের জন্য হাপিত্যেশ করতে থাকা দেশকে এনে দিলেন ভুলে যাওয়া স্বাদ। ধ্রুব’র রাতে সত্যিই যেন ‘মুক্তি’র স্বাদ পেল বাংলাদেশের ক্রিকেট।
মুক্তি’র স্বাদ কথাটা আসছে দেশের ক্রিকেটের সাম্প্রতিক সময়টার কারণেই। নইলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটা জয় আর এমনকি! কিন্তু পেছন ফেরে তাকালে দেখা যায় বাংলাদেশ দলটা জিততে ভুলে যাওয়া দল। বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের পর টানা ৫ ওয়ানডেতে হার। যার মধ্যে শ্রীলঙ্কা সফরে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার ক্ষত। সেটি আরও দগদগে করে দেয় টেস্ট ক্রিকেটে নবীন আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের একমাত্র টেস্টে হার।
রশিদ খানদের বিপক্ষে হারটা আসলে দেশের ক্রিকেটের ভীতটাই নাড়িয়ে দিয়ে গেল বলে ভাবছিলেন সবাই। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের পোস্টারবয় সাকিব আল হাসান, বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন, প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গোসহ ক্রিকেটাররা বলছিলেন, একটা জয়ই সব বদলে দিতে পারে। সেই জয়টা জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই ধরা দেবে এটা প্রত্যাশা ছিল সবারই। বৃষ্টি বাঁধার পর বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে ম্যাচটা যখন মাঠে গড়ায়, শুরু থেকেই গ্যালারি নেচেও উঠতে থাকল সাকিব আল হাসানের দলের সাফল্যের আনন্দে। আফ্রিকার দেশ জিম্বাবুয়ের টপ অর্ডারের ভিত গুঁড়িয়ে দিলেন বোলাররা। তাইজুল ইসলাম তার টি-টোয়েন্টি অভিষেকের প্রথম বলেই উইকেট তুলে নেওয়ার কীর্তিও গড়লেন।
কিন্তু এমন দিনে সাকিব আল হাসানের মতো বলার একপর্যায়ে এক ওভারে দিয়ে দিলেন ৩০ রান। রায়ান বার্ল নামের ২৫ বছরের তরুণ ঝড় বইয়ে দিলেন স্বাগতিকদের ওপর। এই ব্যাটারের ৩২ বলে অপরাজিত ৫৭ রানে জিম্বাবুয়ে পেল চ্যালেঞ্জিং পুঁজি। আর বাংলাদেশ ১৮ ওভারে ১৪৫ রানের লক্ষ্যে ছুটতে গিয়ে পড়ল গভীর খাদে।
যেখান থেকে দলকে টেনে তোলার মতো বীরত্ব দেখাতে পারলেন না মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের মতো অভিজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনেক সময় যে পার দিলেন, এই কথাটা আরেকবার ভুলে গেলেন সৌম্য সরকার, লিটন দাস, সাব্বির রহমানের মতো ব্যাটসম্যানরা।
ঠিক সেই সময় উইকেটে এলেন আফিফ হোসেন ধ্রুব। ৯.৩ ওভারে ৬০ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তখন দিক ভ্রান্ত। দেড় বছর আগে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে শূন্য রানে ফিরেছিলেন। দ্বিতীয় ম্যাচে একটু নির্ভরতা খুঁজবেন কি, দলই কিনা বড্ড বিপদে। সেই ধ্রুব প্রথম শটটা খেলেই আসলে জানান দিলেন, দিনটা নিজের করতে এসেছেন। নেভিল মাদজিভাকে যেভাবে মাথার ওপর দিয়ে মারলেন, যে কোনো ক্রিকেট রোমান্টিকেরই তা মন মাতাতে বাধ্য।
প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে দুই বলে শূন্য রানে আউট হওয়া ধ্রুব তার ভান্ডারে থাকা শটগুলো মেলে ধরতে থাকলেন একেএকে। উইলিয়ামসনকে একই ওভারে পর পর দুই চার ও ছক্কা হাঁকানোর কথা বলতেই হবে। তাকে যোগ্য সমর্থন দিয়ে গেলেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। ১৬তম ওভারে ধ্রুব জার্ভিসের বলে কি অদ্ভুত সুন্দর শটই না খেললেন থার্ডম্যান, ফাইনলেগ দিয়ে। বিপিএল অভিষেকে ৫ উইকেট, ফার্স্ট ক্লাস অভিষেকে সেঞ্চুরি করা ধ্রুবকেই ফিরে পেল সবাই।
বাংলাদেশও তখন জয় দেখতে শুরু করেছে। ধ্রুব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম ফিফটি তুলে নিয়ে ফেরেন শেষ ওভারে। দল তখন জয় থেকে ৩ রান দূরে। ধ্রুবর ২৬ বলে ৮ চার ও ১ ছক্কায় সাজানো ৫২ রানের ইনিংসটির জন্য তখন দাঁড়িয়ে গেল পুরো মিরপুরের গ্যালারি। একই সঙ্গে ড্রেসিংরুমের সব সতীর্থ, কোচিং স্টাফরাও। ড্রেসিং রুমের কাচ ঠেলে ধ্রুবর ভেতরে ঢোকা পর্যন্ত হাততালি দিয়ে গেলেন নতুন কোচ রাসেল ডমিঙ্গো। ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ যে তাকে ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, তার চোখমুখই বলে দিচ্ছিল তা।
ধ্রুব নিজে কি ভাবছেন? ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে খেলার কথা ছিল তার। কিন্তু এই সিরিজে সুযোগ পেতে পারেন বলে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়নি তাকে। দেশের জার্সিতে ফিরতে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে খেলার সুযোগ হারানোকে কোনো ব্যাপারই মানেননি তিনি। দুর্দান্ত পারফর্ম করছিলে ‘এ’ দল, ইমার্জিং দলের হয়ে। সেটিই টেনে নেওয়ার প্রত্যয় ছিল ফের জাতীয় দলে সুযোগ পেলে। অবশেষে সেই ফেরাটা করলেন স্মরণীয়। একই সঙ্গে জানিয়ে দিলেন, এখন তার সুযোগ পাওয়ার সময়।
ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে বলছিলেন, ‘দীর্ঘ দিন পর আমি সুযোগ পেয়েছিলাম। দল চাপে থাকলেও পজিটিভ থাকতে চেয়েছি। আমি শুধু বলের জন্য অপেক্ষা করেছি। মোসাদ্দেকের সঙ্গে জুটিটা ছিল দারুণ উপভোগ্য। সে আমাকে দারুণ সাপোর্ট করেছে।’ ২৪ বলে ৩০ রানে অপরাজিত ছিলেন মোসাদ্দেক। ধ্রুব নায়ক হলে যিনি পার্শ্ব নায়ক।
আর অধিনায়ক সাকিবের কথায় থাকল দুর্দশা থেকে মুক্তির আনন্দ, ‘এই জয় থেকে আমরা অনেক আত্মবিশ্বাস পাব। দল খুব খারাপ সময়ের মধ্যে যাচ্ছিল। সহজ জয়ের চেয়ে এই ধরনের জয় তাই অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস দেবে। এই মোমেন্টামটাই এখন আমরা ধরে রাখতে চাই।’