স্বেচ্ছায় ২০০ বিষধর সাপের কামড় খেয়েও বেঁচে আছেন তিনি

স্বেচ্ছায় দুইশ’রও বেশি সাপের কাপড় খেয়ে বেছে আছেন এক মার্কিন নাগরিক। বিশ্বের যে কোনো সাপের কামড়ের কার্যকরী ওষুধ তৈরির এক গবেষণায় এভাবে জীবনের ঝুঁকি নেন সাবেক ট্রাকচালক টিম ফ্রেডি।

বিবিসি বাংলা জানায়, বিশ্বে প্রতি পাঁচ মিনিটে একজন সাপের কামড়ে মারা যায়। সেই সঙ্গে বাকি চারজন সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায়। এ হিসাবে, প্রতি বছর বিশ্বে ৫৪ লাখ মানুষ বিষাক্ত সাপের কামড় খায়। বিষক্রিয়ায় মারা যায় এক লাখ ৩৮ হাজার জন।

সাপের কামড় থেকে মানুষকে বাঁচাতে এক অব্যর্থ ওষুধ তৈরির গবেষণায় নিজেকে উৎসর্গ করেন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের টিম ফ্রেডি।

দুইশ’রও বেশিবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বেচ্ছায় বিষাক্ত সাপের কামড় খেয়েছেন তিনি। কমপক্ষে ৭০০ বার সাপের বিষ শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে ঢুকিয়েছেন।

সাপের বিষের প্রক্রিয়ার ভিডিও করে সেই ফুটেজ তিনি ইউটিউবে প্রকাশ করেছেন।

ইউটিউবে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিষধর একটি মাম্বা সাপের পরপর দুটো কামড় খেয়েই টিম ফ্রেডি ক্যামেরায় তার অভিজ্ঞতার কথা বলছেন। সে সময় তার হাত দিয়ে দরদর করে রক্ত ঝরছে।

বিবিসিকে তিনি বলেন, “ব্ল্যাক মাম্বা কামড়ালে সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়ে যায়। আপনার মনে হবে এক হাজার মৌমাছি যেন আপনাকে একসঙ্গে কামড়েছে। একটি মৌমাছির হুলে বিষের পরিমাণ থাকে সাধারণত এক থেকে দুই মিলিগ্রাম। কিন্তু একটি মাম্বা কামড়ালে শরীররে ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিগ্রাম বিষ ঢুকে যেতে পারে। কামড়ের পরপরই জায়গা ফুলে যায়। কতটা বিষ ঢুকেছে ফোলার মাত্রা দেখে দেখে আমি বুঝতে পারি। খুবই যন্ত্রণা হয়।”

লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ড. স্টুয়ার্ট এইনসওয়ার্থ বিবিসিকে বলেন, “বুঝতে পারি না কেন কিছু মানুষ এগুলো করে। প্রথমত, এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, তাছাড়া এটা অনৈতিক। আমরা এ রকম মানুষের সঙ্গে কাজ করি না।”

বিশ্বের যে সব প্রতিষ্ঠান নতুন অভিন্ন একটি বিষ কাটানোর ওষুধ তৈরির চেষ্টা করছে, যুক্তরাজ্যের লিভারপুলের এই প্রতিষ্ঠান তাদের একটি।

সাধারণত নতুন কোনো ওষুধ গবেষণাগারে ইঁদুর বা অন্য কোনো প্রাণীর ওপর প্রয়োগ করা হয়। যখন তা কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়, তখনই তা নিয়ন্ত্রিত একটি পরিবেশে মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হয়।

ড. এইনসওয়ার্থ বলেন, “কিন্তু এ ধরনের প্রক্রিয়ায় মানে টিম ফ্রেডি যা করছেন তাতে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এটা করা উচিত নয়।”

এদিকে ওষুধ শিল্পে সাপের বিষ প্রতিরোধী ওষুধ নিয়ে গবেষণায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালারও অভাব রয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়েলকাম ট্রাস্ট, যারা সাপে কাটার চিকিৎসায় নতুন একটি ওষুধ তৈরির জন্য গবেষণা করছে, তাদের মতে, “উৎপাদন, নিরাপত্তা এবং ওষুধের কার্যকারিতার ব্যাপারে আন্তর্জাতিকভাবে অভিন্ন কোনো মানদণ্ড নেই।”

এদিকে অনেকের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেতে ফ্রেডি নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছেন। তবে এই অভিযোগ নাকচ করেছেন এই মার্কিন নাগরিক।

তিনি বলেন, “শুধু ইউটিউব ভিডিও বানানোর জন্য আমি এটা করিনি। আমি জীবন বাঁচাতে চেয়েছি। যাদের সঙ্গে আমি কাজ করব এমন চিকিৎসক খুঁজে পাওয়ার জন্য আমি ইউটিউবকে ব্যবহার করেছি। আমি এক ধরনের বাজি ধরেছিলাম যেটা কাজে লেগেছে।”

বিশ্বের সাপের প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৩০০০। এদের মধ্যে দুইশ’র মতো প্রজাতি এতটাই বিষধর যে তারা কামড়ালে মানুষের মৃত্যু হতে পারে বা মানুষ অঙ্গ হারাতে পারে। বিষধর এই প্রজাতির অনেকগুলোর সঙ্গেই পরিচিত ফ্রেডি।

কেউটে হোক, ভাইপার হোক বা ব্ল্যাক মাম্বা, গত ২০ বছরে দুইশ’ বারেরও বেশি স্বেচ্ছায় বিষধর এসব সাপের কামড় খেয়েছেন  তিনি।

সাপে কামড়ালে শরীরে কত বিষ ঢুকবে তার পরিমাণ একেক সময় একেক রকম। কখনো কখনো সাপ কামড়ালেও বিষ ছাড়ে না। কী পরিমাণ বিষে কেমন প্রতিক্রিয়া তা বুঝতে ইনজেকশন করে শরীরে বিষ প্রয়োগের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

ফ্রেডি বলেন, “আপনার শরীর যদি ব্ল্যাক মাম্বার মত সাপের বিষ-প্রতিরোধী না হয়, তাহলে এটা আপনার স্নায়ুতন্ত্রকে আঘাত করবে। আপনি শ্বাস নিতে পারবেন না, আপনার চোখ বন্ধ হয়ে আসবে। কথা বলতে পারবেন না, এবং ধীরে ধীরে আপনি অসাড় হয়ে পড়বেন। কিন্তু একইসঙ্গে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনি সবকিছু বুঝতে পারবেন।”

সাবেক এই ট্রাকচালক তার বাড়িতে বেশ কয়েক প্রজাতির বিষধর সাপ রাখেন এবং তাদের কামড় খেয়ে প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, “আমার কাছে আফ্রিকান জল কেউটে রয়েছে। এর কামড় ভয়াবহ। জল কেউটের বিষে দেহের স্নায়ুতন্ত্র অবশ করে ফেলে। অন্য কিছু জাতের কেউটে সাপের বিষে সাইটোটক্সিন থাকে যার ফলে অঙ্গহানি হতে পারে।”

৫২ বছর বয়সী সাবেক এই ট্রাক ড্রাইভার কোনো বিজ্ঞানী নন। কখনো তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি। কিন্তু সাপের কামড়ে মৃত্যুর ভীতি থেকে গত ২০ বছর ধরে তিনি ব্যতিক্রমী এই কাজে লিপ্ত হয়েছেন।

প্রথমে তিনি পরীক্ষা শুরু করেন মাকড়সা এবং বিছা দিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে কেউটে সাপ এবং ব্ল্যাক মাম্বা সাপ নিয়ে কাজ শুরু করেন।

তার শরীরে এখন অনেক ক্ষত। কয়েকবার মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছেছিলেন।

ফ্লেডি বলেন, “প্রায় ১২ বার আমাকে কঠিন সংকটে পড়তে হয়েছে। প্রথম বছরে দুটো কেউটের কামড়ে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আপনাকে শিখতে হবে। কোনো ডাক্তার বা বিশ্ববিদ্যালয় এটা আপনাকে শেখাতে পারবে না।”

দুই বছর আগে টিম ফ্রেডির এই ইউটিউব ভিডিও নজর কাড়ে প্রখ্যাত রোগতত্ববিদ জেকব গ্ল্যানভিলের। ওষুধ নির্মাতা ফাইজারের প্রিন্সিপাল বিজ্ঞানী ছিলেন গ্ল্যানভিল। চাকরি ছেড়ে নিজেই অ্যান্টি-ভেনম তৈরির জন্য কোম্পানি খুলেছেন।

তিনি বলেন, “টিম যা করছে তা অসামান্য। কিন্তু এটা বিপজ্জনক। এটা করার জন্য আমি অন্য কাউকে পরামর্শ দেব না।”

ফ্রেডির রক্তের নমুনা ব্যবহার করে নতুন একটি অ্যান্টি-ভেনম তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছে গ্ল্যানভিলের কোম্পানি।