আশিকুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে ফিরে গেছেন খুলনার দূরের গ্রাম কয়রাতে। সেখানে বাঘবিধবাদের কাজ শিখিয়ে সেলাই মেশিন দেন। আদিবাসী মুণ্ডা শিশুদের জন্য স্কুল গড়েছেন। তাদের সামাজিক সংগঠন ‘ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)’। লিখেছেন সহ-প্রতিষ্ঠাতা জসীম উদ্দীন
আমাদের প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)’। কাজ করে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় উপজেলা খুলনার কয়রাতে। সেখানে আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলমগ্ন বন ‘সুন্দরবন’। নদী তীরে, পুরো উপজেলাতে কাজ করে আইসিডি। ভালো কাজ না পাওয়ায় সুন্দরবনের গহীনে নানা ধরনের জীবিকায় আছেন অনেক অসহায় মানুষ। তাদের কেউ মৌয়াল হয়ে মধু আহরণ করেন, কেউ বনের কাঠুরে, কারও পেশা জেলে। এই মানুষদের অনেকে বাঘ সম্পর্কে না জেনে বাঘের শিকার হন কোনো কোনো সময়। বাঘের থাবায় স্বামী হারানো এসব বিধবা নারীদের সে অঞ্চলে ডাকা হয় ‘বাঘবিধবা’। তাদের পেশা তৈরি, জীবনের বদল করে আইসিডি। এখানে বঙ্গোপসাগরের তীরে আছেন আদিবাসী মুণ্ডা সম্প্রদায়। তারাও খুব পিছিয়ে আছেন। তাদের ছেলেমেয়েরা যেন লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হতে পারেন সে জন্যও নানাভাবে চেষ্টা করছেন আইসিডির বন্ধুরা। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান আশিকুজ্জামান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে চিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই ‘আশিক’। কয়রা ইউনিয়নের ছয় নম্বর কয়রা গ্রামের ছেলে। সরকারি এমএম কলেজের ছাত্র; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১১-’১২ সেশনে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে চলে গেছেন বাড়িতে। কয়রাতে বাড়ি বলে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম এক ছুটিতে। তাদের অফিস কয়রার ৫ ও ৬ নম্বর লঞ্চঘাটের পাশে। ছোট্ট অফিসে ছিলেন অন্য তরুণ সদস্যরাও। গল্পে গল্পে আশিক ভাই বললেন, ‘আমাদের আনুষ্ঠানিক শুরু ২০১৭ সালের দুই ডিসেম্বর। শুরুতে বাঘবিধবাদের নিয়ে কাজ করতাম। এখনো করি। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি বলে আয়, রোজগার ছিল না। অনেকগুলো টিউশনি করতাম। সেগুলো থেকে নিজে যেমন চলতাম, তেমনি জমিয়েও রাখতাম এই বিধবাদের সাহায্য করব বলে। ছুটিতে বাড়ি গিয়ে কয়রার বাড়ি বাড়ি ঘুরে তাদের সঙ্গে দেখা করেছি। জমানো টাকা দিয়ে প্রথমে ১০ জনকে সেলাই মেশিন কিনে দিলাম। ফেইসবুকে সেই গল্প লেখা ও ছবি দেওয়ার পর অসংখ্য লাইক, শত শত কমেন্ট এলো। ফলে ভীষণ অনুপ্রাণিত হলাম। বিশ্বখ্যাত দক্ষিণ কোরিয়ান ইলেকট্রনিক পণ্য প্রস্তুত প্রতিষ্ঠান এলজি’র বাংলাদেশ পরিবেশক ও প্রস্তুত কোম্পানি এলজি ইলেকট্রনিক্স বাংলাদেশের তখনকার দেশীয় প্রতিনধি ডি কে সন তাদের প্রতিষ্ঠানের হয়ে চার লাখ টাকা অনুদান দিলেন। সেই টাকার পুরোটাই বাঘবিধবাদের জীবন বদলে ব্যয় করেছি। ৩০ জন নারীকে এক মাস ধরে দর্জির কাজের প্রশিক্ষণ দিয়েছি আমরা। এরপর তাদের সবাইকে সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছি। শিট কাপড় দিয়েছি আরও নানা সেলাইয়ের উপকরণ দেওয়া হয়েছে।’ আশিক ভাই বলতে ভুললেন না, ‘তখন আমাদের দেওয়া টাকায় চালের কুঁড়ো কেনা-বেচা ও গরু পালনের ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনজন বাঘবিধবা। এখন তারা সবাই আগের চেয়ে অনেক ভালো আছেন। প্রত্যেকের পরিবার বদলে যাচ্ছে।’
আরও একটি গল্পের নায়ক আইসিডির এই বন্ধুরা। মুণ্ডারা ছড়িয়ে আছেন বাংলাদেশ ও ভারতে। আড়াইশ বছর আগে ব্রিটিশরা ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্য ও রাঁচি শহর থেকে অসহায় অনেক মুণ্ডাকে জোর করে ধরে আনেন সুন্দরবনে। তাদের কাজ হলো, গভীর বন কেটে আবাস গড়া। পরে আরও নানা ছোট কাজে জীবনের তাগিদে জড়িয়ে পড়েন মানুষগুলো। এখন তারা বাস করেন সু্ন্দরবনের পাশে ছয় নম্বর কয়রা গ্রামে। লোকে তাদের পাড়াকে মুন্ডা পাড়া নামে চেনে। তাদের ১০ নারীকে পুঁতির মালা তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আইসিডির বন্ধুরা গেল বছরের ৬ সেপ্টেম্বর ৩ হাজার স্কুলের ছাত্রছাত্রীর রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে তাদের গ্রুপ জানিয়েছেন। ফলে তারা যেকোনো প্রয়োজনে রক্ত নিতে পারবেন। এছাড়াও ‘স্বপ্ন পাড়ি’ নামের একটি সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে তাদের স্কুলসহ ছয় নম্বর কয়রা গ্রামের মোট ১শ জন স্কুলের মুণ্ডা ছাত্রছাত্রী, বাঘের থাবায় বাবা হারানো এতিম স্কুল ছাত্রছাত্রী, নানাভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার ছাত্রছাত্রীকে ১১টি শিক্ষা উপকরণ বিলিয়েছেন। দেওয়া হয়েছে– বই, খাতা, রাবার, পেন্সিল ইত্যাদি। এছাড়াও ঈদের সময় তারা ঈদের পোশাক ও সেমাই, মিষ্টি, চিনি ইত্যাদি বিলিয়ে দেন তাদের।
মুণ্ডাদের পাশে আছেন তারা বিরসা মুণ্ডা প্রভাতী স্কুলের মাধ্যমে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মুণ্ডাদের উলুগোলানের নায়ক ছিলেন বিরসা মুণ্ডা। তিনি মুন্ডাদের মহাবিদ্রোহ (উলুগোলান)’র ডাক দেন। অসাধারণ শক্তিশালী বিরসা দেবতার সম্মান পেয়েছিলেন। মুণ্ডারা মনে করতেন বিরসা মরতে পারে না। তিনি ইংরেজি স্কুলেও পড়েছিলেন। ছোটকাল থেকে কোন বনে, বনের কোথায় কী পাওয়া যাবে নখদর্পণে ছিল। ফলে তাকে অনেক খুঁজেও কোনোভাবে ধরতে পারছিল না ইংরেজ সেনারা। পরে কলেরাতে আক্রান্ত হয়ে জেলখানাতেই বিরসার ২৮ বছর বয়সে মৃত্যু হয়। তার নামেই আইসিড’র এই বিদ্যালয়। ওপরে টিন, চারপাশে বাঁশের খুঁটি; ব্ল্যাকবোর্ড বাঁশের ছোট দুটি খুঁটিতে টানিয়ে পড়ালেখা চলে। চারপাশে বেড়া দেওয়ার সামর্থ্য হয়নি কারোর-ই। তাতে তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, অক্ষরজ্ঞান, সামান্য লেখাপড়া শেখানো হয়। সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত প্রভাতী স্কুল চলে। তাদের বেশিরভাগ মা-বাবার সামান্য বিদ্যাশিক্ষাও নেই। ছেলেমেয়েদের তারা কাজে যুক্ত করে ফেলেন। এই অবস্থা কাটানোর জন্যই বিদ্যালয়। পড়ান বাসন্তী মুণ্ডা নামের এক মুণ্ডা শিক্ষক। এখনো স্কুল গড়ার মতো কোনো ব্যবস্থা করতে পারেননি আইসিডির তরুণ সমাজকর্মীরা। ফলে এক মুণ্ডা বাড়ির আঙিনাতে স্কুল বসছে। তবে শিক্ষককে ১ হাজার টাকার মাসের বেতন আশিক টিউশনির টাকা থেকে জোগাড় করে দিচ্ছেন। আশিকের অভাব ও মুক্তি মেলেনি। তবে বাসন্তী মুণ্ডার নিয়মিত ছাত্রছাত্রী আছেন ৬৫ জন। আইসিডির আরও কাজ আছে। কয়রার ৫ ও ৬ নম্বর লঞ্চঘাটের তীরে শাকবাড়িয়া নদীর ওপারে কেওড়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র নামের একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার সংগ্রামে আছেন তারা। আশিকের নেতৃত্বে এলাকার যুবকরা ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে আজও প্রচার, ব্যানার, মানববন্ধন, স্মারকলিপি, আলোচনার মাধ্যমে নানাভাবে চাইছেন সেখানে এটি হোক। জায়গাটির পাশে সাইনবোর্ডও টানিয়েছেন তারা। কয়রা উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে খুলনা জেলা প্রশাসন পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাছে পর্যটন কেন্দ্রটি গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে। আশিকের যুক্তি হলো–আইলা, সিডরে ভেঙে পড়া কয়রার অর্থনৈতিক শক্তিকে এই কেন্দ্র আবার বাঁচিয়ে তুলবে। ঘূর্ণিঝড়গুলোতে কয়রার বিশাল এলাকার অনেক পুকুর পাড় ভেঙে বিলীন হয়েছে, আবাদি জমি পানির নিচে গিয়ে লবণে ভরে গেছে। এখন আর চাষ করা যাচ্ছে না। পর্যটন কেন্দ্র হলে অনেকের কাজের ব্যবস্থা হবে। নদী উপকূলেরও উন্নয়ন ঘটাবে। তবে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না। এত এত কাজ ও উদ্যোগের ফলাফল দেখতে গেলাম সবাই মিলে আবার। কয়রা সদর উপজেলাতেই থাকেন জরিনা বেগম। বাঘের কামড়ে জেলে স্বামীকে হারিয়েছেন এক রাতে চার বছর আগে। বাঘের থাবা থেকে তাকে বাঁচাতে না পারলেও কর্মজীবী সাথীরা তার লাশ নিয়ে ফিরেছেন। এরপর থেকে দুই মেয়ে ও এক ছেলে আর নিজের জীবন বাঁচাতে সুন্দরবনের নদী, খালে জেলের জীবন শুরু হলো তার। পুরুষের মতো প্রচণ্ড গরমে, নানা বাধা সয়ে কাজ করতে খুব অসুবিধা হতো। মাছ ভালোই পেতেন, বিক্রি করতে হতো কম দামে। তাতে কোনোভাবে সংসার চললেও ছেলেমেয়েদের বন্ধ হওয়া লেখাপড়া শুরু হলো না। এখন তিনি সেলাই মেশিনে জামা বানান। তাতে আয় ভালোই হয়, ছেলেমেয়েরাও লেখাপড়া শেখে। ফলে তার যেমন জীবন বদলেছে, তেমনি আশিকদেরও কাজের অনেক সাড়া পড়েছে। বাঘবিধবারা ভালো আছেন, তাদের ভাগ্য বদলাচ্ছে জেনে ও দেখে অনেকে মোবাইলে তাদের সাহায্য করতে চাইছেন। কয়রার গ্রামগুলোর দুইশর বেশি এমন বিধবার পাশে দাঁড়াতে চান তারা। আরও এমন নারী আছেন রামপাল, মোড়লগঞ্জ ও দাকোপ উপজেলাতে। বাকি ৪০ জনের মতো তাদেরও ভাগ্য বদলে দেবেন তারা, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখাবেন; অলক্ষুনে, অপয়া দোষ কাটাবেন। তাকে সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে ঢাকা ওয়ার্কিং ক্লাব এবার। তাদের ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ ২০১৯ পেয়েছেন তিনি। দুই নভেম্বর তাদের ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ সামিট ২০১৯-এ সম্মাননাটি পাবেন। তরুণরা আলোচনার পাশাপাশি তার উদ্যোগের গল্প জানবেন। সারা বিশ্বের তরুণদের কাজ করার প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ইয়ুথ লিডারশিপ পার্লামেন্টের ‘সাউথ এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০১৯’ও পাবেন।
এত কাজ কীভাবে করলেন, সেই জীবন? আশিক বললেন, ‘আমার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা মাস্টার্স করেছে, তাদের বেশিরভাগই ভালো চাকরি পেয়েছে। সমাজসেবার মাধ্যমে মানুষের ভাগ্য বদলানোর চেষ্টা করছি বলে এসব কী করছিস- বলে মা-বাবা সারাক্ষণ বকেন, ভাবেন। ২০১৭ সালের মাঝ থেকে যখন কাজ শুরু করি, তখন তো একাই ছিলাম। কারও কাছ থেকে অনেক দিন কোনো অর্থ সাহায্য পাইনি। ফলে দুটি টিউশনির টাকাই সম্বল ছিল। কয়রাতে অসহায়দের টাকা দিয়ে নিজে ভালোভাবে চলতে পারতাম না। আমরা বিভিন্ন স্কুল, উপজেলা পরিষদের মিলনায়তন, খালি ঘরে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমত বলে সেই পথ পেরিয়ে নারীরা আসতে পারতেন না। তাদের কোলের ছোট সন্তানের রোগ হয়ে যেত। তাদের নিয়ে আসতেও হয়েছে। এখনো এসব মানুষকে সাহায্য করতে আমাকে টিউশনি করে চলতে হচ্ছে।’ তাকে সাহায্য পাঠানোর ঠিকানা-০১৯১৮৭৮৮০১৮। ফেইসবুকে পাবেন