কিং লিয়ার নয়, এটা কিং লিওর গল্প। লিওনেল মেসি তো সংক্ষেপে কিং লিও-ই। আদ্যোপান্ত সাফল্য মোড়ানো ফুটবলের চলমান এক মহানাটকও বলতে পারেন!
ভার্জিল ফন ডাইক ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে পেছনে ফেলে এবারের ফিফা ‘দ্য বেস্ট’ পুরস্কার পেয়েছেন আর্জেন্টিনা এবং বার্সেলোনা তারকা লিওনেল মেসি। এই নিয়ে ষষ্ঠ বারের মতো ফিফার বর্ষসেরার পুরস্কার পেলেন তিনি। ২০১৫ সালের পর আবারও পেলেন বর্ষসেরার পুরস্কার। কিন্তু ফিফা ‘দ্য বেস্ট মেনস প্লেয়ার’ নামের পুরস্কারটি এবারই প্রথম জিতেছেন মেসি। তিন বছর পর আবারও বর্ষসেরা মেসি জানিয়েছেন অনেকদিন পর ব্যক্তিগত পুরস্কার পেয়ে ভালো লাগছে। তবে দলগত সাফল্যই তার মূল আনন্দ।
গেল বছর ক্লাব বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন লা লিগা শিরোপা। সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫৮ ম্যাচে ৫৪ গোল করে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুটের পুরস্কারও পেয়েছিলেন আগেই। অবশেষে অধরা ফিফা ‘দ্য বেস্ট’ পুরস্কারটিও নিজের করে নিলেন ৩২ বছর বয়সী তারকা। পুরস্কার পাওয়ার পর মেসি বলেন, ‘অনেকদিন হয়ে গেল ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো পুরস্কার জিতিনি। প্রথমবার এই পুরস্কার জিতলাম। এটা পেয়ে ভালো লাগছে। আমাকে এই পুরস্কার দেওয়ার জন্য যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাদের আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমার কাছে দলীয় পুরস্কারগুলোই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আজকের রাতটা আমার জন্য খুবই বিশেষ।’
ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারদের পুরস্কৃত করে আসছে সেই ১৯৯১ সাল থেকে। ২০১০ সালে ফিফার বর্ষসেরা পুরস্কার আর ফ্রান্সের ফুটবল সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ এর বর্ষসেরা পুরস্কার ‘ব্যালন ডি’অর’ একীভূত হয়। দু’পক্ষের চুক্তি শেষ হওয়ার পর ২০১৬ সাল থেকে দুটি পুরস্কার আলাদাভাবে দেওয়া হচ্ছে। পুরস্কারটি প্রথম দু’বার ঘরে তোলেন রোনালদো। গেলবার জিতেছিলেন ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডার লুকা মদ্রিচ। তাই মেসির এবার প্রথম ফিফার ‘দ্য বেস্ট’ ট্রফিটি নিজের করে নিলেন। এমন অর্জনের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশংসায় ভাসছেন তিনি। কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকার বলেছেন, ‘রোনালদো বিস্ময়কর ফুটবলার। কিন্তু মেসি এবার গোল সংখ্যায় অনেক এগিয়ে গেছেন। সে অন্য পর্যায়ের ফুটবল খেলেছে।’ ডাচ তারকা প্যাট্রিক ক্লাইভার্ট বলেছেন, ‘কিছু বলার নেইÑ সিম্পলি দ্য বেস্ট। ধন্যবাদ মেসি।’ ফিফার পুসকাস অ্যাওয়ার্ড জয়ী সাবেক তারকা ওয়েন্ডেল লিরা বলেছেন, ‘এটা তার প্রাপ্য। মেসি দারুণ ঘটনাবহুল সেশান কাটিয়েছেন।’ ফ্রাঙ্কি ডি জং বলেছেন, ‘আমার কাছে মেসি সব সময়ই দুনিয়ার সেরা ফুটবলার। আমি অনেকবার এই বিষয়টা পরিষ্কারভাবে বলেছি।’
সোমবার ইতালির মিলানের অপেরা হাউস লা স্কালায় ফিফার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আসেননি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পাঁচ বার ফিফার বর্ষসেরা হয়েছেন তিনি। এবার মেসি বর্ষসেরা পুরস্কার জেতায় রোনালদোর চেয়ে সংখ্যায় এক ধাপ এগিয়ে গেলেন।
বার্সেলোনার হয়ে গত মৌসুমে অসাধারণ খেলেন তিনি। লা লিগায় সর্বোচ্চ ৩৬ গোল করে জিতেছিলেন পিচিচি ট্রফি ও ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু। গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। করেছিলেন ১২ গোল। তবে বার্সেলোনাকে চ্যাম্পিয়ন করতে পারেননি। সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে লিভারপুলের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল স্প্যানিশ জায়ান্টরা। ক্লাবের জার্সিতে ভালো খেললেও জাতীয় দলের হয়ে গত মৌসুমে মেসি ছিলেন আগের মতোই ফ্লপ। কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে তার দেশকে ব্রাজিলের কাছে হারতে হয়েছিল। তবে সেই হার তার পুরস্কার পাওয়ার পথে বাধা হতে পারেনি। স্রেফ বার্সেলোনার জার্সি গায়ে যে পারফরমেন্স করেছেন তার জেরেই ফিফার বর্ষসেরা হলেন মেসি।
সব ব্যক্তিগত পুরস্কার নিয়েই একটু বিতর্কের ছোঁয়া থাকে। এবারও যে থাকবে তা বলাই বাহুল্য। প্রশ্ন উঠবে কেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ফন ডাইককে দেওয়া হলো না, কেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো নেই। তবে সব বিতর্ক পাশে সরিয়ে ফিফা বর্ষসেরা হয়ে মেসি প্রমাণ করলেন বিপণন আর সেলিব্রিটি সংস্কৃতির জন্য তিনি রীতিমতো নমস্য এক চরিত্র। এই টিম স্পোর্টসের যুগেও তিনি একক প্রতিভায় গোটা দুনিয়াকে মুগ্ধ করে রাখতে পারেন। সত্যিকার ফুটবল সৌন্দর্যের উদাহরণ তিনি। পুরস্কৃত করার জন্য মেসি এখন এত বড় ব্র্যান্ড যে, ফিফার মনেই থাকে না চলতি বছর কোপা আমারিকায় রেফারির সঙ্গে গ-গোল করে তিন মাস আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাইরে রয়েছেন তিনি। অবশ্য একটু ঘুরিয়ে বলা যেতে পারে-মেসির অনির্বচনীয় ফুটবল প্রতিভা আসলে সব ভুলিয়ে দেয়। এটার নামই মেসি ম্যাজিক। মিলানের অপেরা হাউজে সেই ম্যাজিশিয়ানকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।