ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি এখন মৃত্যু-আতঙ্কের নাম। নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে রাজ্যজুড়ে ঘটছে একের পর এক মৃত্যু। প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তো আছেই, এখন পর্যন্ত আত্মহত্যা করেই প্রাণ গেছে অন্তত ১২ জনের মতো ব্যক্তির।
আনন্দবাজার পত্রিকার এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে দেশটির রাজ্যজুড়ে এই আতঙ্ক এই মুহূর্তে কী রূপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
মূলত আসামে এনআরসি থেকে ১৯ লাখ মানুষ বাদ পড়ার পর এ আতঙ্ক ছড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের মধ্যে। এর মধ্যে আছে এনআরসি নিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতা-মন্ত্রীদের একের পর এক বিস্ফোরক বক্তব্য। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহেই অন্তত ১২ জন আত্মহত্যার খবর পাওয়া গিয়েছে রাজ্যটিতে।
মুর্শিদাবাদ, উত্তর চব্বিশ পরগনা, জলপাইগুড়ি, ময়নাগুড়ি, বালুরঘাট থেকে একের পর এক মৃত্যুর সংবাদ আসছে। একদিনেই তিনজন আত্মহত্যা করেছেন এমন খবরও পাওয়া গিয়েছে।
মৃতদের পরিবারের দাবি, রাজ্যে এনআরসি হতে পারে সেই আতঙ্কেই মৃত্যু হয়েছে তাদের। নিজেদের এবং পরিবারকে নাগরিকত্ব প্রমাণে জরুরি নথিপত্র, জমির দলিল খুঁজে না পাওয়া থেকে তারা মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন।
জলপাইগুড়িতে এখন পর্যন্ত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। মুর্শিদাবাদের আনাচকানাচেও ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। ইতিমধ্যে উৎকণ্ঠা ও ভয়ে সেখানকার ডোমকলের এক যুবক আত্মঘাতী হয়েছেন।
নিজের ভিটের পুরনো দলিলপত্র জোগাড় করতে না পেরে দিন কয়েক ধরে প্রবল দুশ্চিন্তায় ভুগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন মাঝবয়সী এক ব্যক্তিও। অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার বা উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যা থেকে রেহাই পেতে অনেক মানুষ এখন ভিড় করছেন মনোবিদদের কাছে।
রাজ্যে এখনও এনআরসি চালু না হলেও উটকণ্ঠা ও উদ্বেগে মানুষের দিন কাটছে। ডোমকলের শিবনগর গ্রামের আত্মঘাতী যুবক মিলন মণ্ডলের (২৭) বাবা দিস্তার মণ্ডল বলছেন, “কেরালা কাজ করত ছেলে। ঘরে ফিরে ভোটার আর আধার কার্ডে নামের ভুল বানান আর ঠিকানার গন্ডগোল দেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিল। সপ্তাহ দুয়েক ধরে সারা দিন সরকারি অফিসে তদ্বির করে বেড়াত। ভুল সংশোধন করাতে না-পেরে ছেলেটা মনমরা হয়ে গিয়েছিল।’’
মিলনের স্ত্রী রেণুকা বলছেন, ‘‘খালি বিড়বিড় করত, ভিটেমাটি-পরিবার সব উচ্ছেদ হবে। সে সবের আগে ও নিজেই শেষ হয়ে গেল।’’
মিলনের মা আদরা বিবিই ছেলের ঝুলন্ত দেহ দেখতে পান। স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য তৃণমূলের জুলেখা বিবির দাবি, ‘‘শুধু মিলন নয়, গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই নাগরিক তালিকার আতঙ্কে ভুগছেন।’’
হরিহরপাড়ার সলুয়া গ্রামের গিয়াসউদ্দিন শেখও সেই একই মানসিক চাপ থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন বলে পরিবারের দাবি।
কলকাতাতেও পৌরসভা, মুখ্যমন্ত্রী কার্যালয় ও স্বাস্থ্য ভবনে প্রয়োজনীয় নথি জোগাড় করতে লাইন দিতে দেখা গিয়েছে উদ্বিগ্ন শহরবাসীকে। যদিও কলকাতা পৌরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিম আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘‘এনআরসি নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।’’ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আগে বারবার জানিয়েছেন, এ রাজ্যে এনআরসি করতে দেওয়া হবে না। এরপরেও মানুষের ভেতর থেকে কাটছে না আতঙ্ক।
ডোমকলের হাসপাতাল মোড়ের কাছে মনোবিদ সেলিম মালিকের ব্যক্তিগত চেম্বার। তিনি বলছেন, ‘‘এ তো গণ-ভয়! এটাকে বলা হয় অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার। ভয় ছড়ালে গ্রামের পর গ্রাম তাতে আক্রান্ত হয়। তীব্র ভয় অনেককে আত্মহননের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।’’
ডোমকলের ব্লক ডিভিউশনাল (ডিভিও) অফিসার পার্থ মণ্ডলেরও একই পর্যবেক্ষণ। তিনি বলছেন, ‘‘এনআরসি’র ভয় যেন গণ-হিস্টিরিয়ার চেহারা নিচ্ছে! আমরা প্রতিটি পঞ্চায়েত প্রধান, এমনকি স্কুল শিক্ষকদেরও বলেছি, বিভ্রান্তি কাটাতে মানুষকে বোঝান, অভয় দিন।’’
এনআরসি আতঙ্ক কাটাতে ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের নিয়ে প্রচারের কথাও ভেবেছে জেলা প্রশাসন। সম্প্রতি বেলডাঙা ১ ব্লক দফতরে ৩৫ জন ইমাম-মোয়াজ্জিনকে নিয়ে সভাও করেছেন কর্তারা। সেখানে তাদের জানানো হয়েছে, সরকারি নির্দেশ মেনে রেশন কার্ড ও ভোটার কার্ড সংশোধনের কাজ চলছে। এর সঙ্গে এনআরসি-র কোনও সম্পর্ক নেই।
আরেক ডিভিও বিরূপাক্ষ মিত্র বলেন, “আপনারা জুম্মাবারে মসজিদে আসা মানুষদের বোঝান। এনআরসি নিয়ে গুজবে যেন তারা কান না দেন।”
শুধু মসজিদ নয়, প্রয়োজনে ইমামদের গ্রামে নিয়ে গিয়েও প্রচার করানো হবে বলে জানান জেলার এক শীর্ষ কর্মকর্তা।
এর মধ্যে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন উদ্বেগের স্বীকার মানুষ। গ্রামবাসীদের হাতে ভুয়া কার্ড তুলে দেওয়ার অভিযোগও আসছে জেলা প্রশাসনের কাছে। ইতিমধ্যে জাল ভোটার ও আধার কার্ড তৈরির অভিযোগে বেশ কয়েক জন ধরাও পড়েছে।
যাদের একজনের স্বীকারোক্তি, ‘‘দু’টি কম্পিউটার কিনে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। কিন্তু গ্রামগঞ্জে তো এসব চলে না। মাছি তাড়িয়ে হাতে ব্যথা হয়ে গিয়েছিল। এনআরসি-র ভয় রুজির দরজা খুলে দিল।’’
ডোমকল, রানিনগর, জলঙ্গি, জঙ্গিপুরের অনেকেই বলছেন, ‘‘এমন কারবার ফেঁদে বসেছে অনেকেই। এই বিপদের সময় তারাও দু’পয়সা বাড়তি আয় করছে।’’ জেলাপ্রশাসক জগদীশ প্রসাদ মিনা বলছেন, ‘‘ভোটার, আধার ও রেশন কার্ড সরকারি ভাবেই করা হয়। এ ব্যাপারে আমরা সবাই সচেতন করছি।’’
আবার অনেকেই আছেন সপ্রণোদিত হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। গ্রামে গ্রামে গিয়ে অনেক তরুণ মানুষের নথিপত্রে কোথায় ভুল আছে সেটা দেখে, ফর্মও পুরণ করে দিচ্ছেন। তাদের একজন, প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলছেন, ‘‘এনআরসি নিয়ে যা চলছে তা তো বুঝতেই পারছেন। লোকজন বড় দুশ্চিন্তায়। এখন পাশে না দাঁড়ালে চলে?’’
কিন্তু এই গণ-হিস্টোরিয়া থেকে মুক্তির উপায় কী? জেলাপ্রশাসক বলছেন, ‘‘ভোটার তথ্য যাচাই বা রেশন কার্ডের আবেদনের সঙ্গে নাগরিক তালিকা বা ডি-ভোটারের সম্পর্ক নেই। আমরা ব্লকে ব্লকে প্রচারও করছি।’’
এরপরেও মন থেকে ভয় তাড়াতে পারছে না মানুষ। টেঁয়া রামপুরের আশরাফ আলী বলছেন, ‘‘সাত পুরুষের ভিটে ছাড়ার ভয় কি আর মুখের কথায় কাটে!’’
পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, ‘‘’মৃত্যুর ঘটনা মর্মান্তিক। বিজেপির এনআরসি নিয়ে প্রচারণার কারণে মানুষ আতঙ্কে ভুগছেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘নথি জমা দেওয়ার ভিড়ের কারণে সরকারি দপ্তরের কর্মীদের রাত জেগে কাজ করতে হচ্ছে। ভিড় ঠেকাতে গিয়ে দপ্তরের কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আমরা মানুষের পাশে আছি।’’
সিপিএম রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রও হুগলির চুঁচুড়ায় এনআরসি নিয়ে দলীয় কর্মীদের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
এনআরসি নিয়ে তৃণমূল, সিপিএম এবং কংগ্রেসের বিরোধিতার পাল্টা প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সরসংঘচালক মোহন ভাগবত।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ জানান, আরএসএস প্রধান সংঘ পরিবারের সকলকেই এনআরসির পক্ষে প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘‘সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস না করিয়ে এনআরসি করা হবে না। এ বিল পাস হলে হিন্দুরা রক্ষাকবচ পাবেন। কোনো হিন্দুকেই দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে না। সুতরাং, হিন্দুদের কোনো ভয় নেই।’’