ভারতের ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেওয়ায় কুষ্টিয়ায় বন্যার পানি বিপদ সীমা অতিক্রম করে জেলার ৫টি উপজেলার আংশিক লোকালয়ে প্লাবিত হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত বিপদ সীমা অতিক্রমের মাত্রা রেকর্ড করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ।
আকস্মিক এই প্লাবনে কৃষি জমির ফসল বিনষ্টের সঙ্গে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন দুর্গত এলাকার মানুষ। আক্রান্তদের অভিযোগ, চরম বিপদ সংকুল অবস্থায় ন্যূনতম জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও পাননি এখনো।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রথমদিকে দৌলতপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ৪টি ইউনিয়নের প্রায় ৩৭টি গ্রামের ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়। কিন্তু এখন এই বন্যায় আর নিম্নাঞ্চলই নয় আরও ৪টি উপজেলার আংশিক লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। বন্যার বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী পীযূষ কৃষ্ণ কণ্ডু জানান, ভারতের উত্তরাঞ্চলে অব্যাহত ভারী বর্ষণের ফলে গঙ্গা অববাহিকায় গত প্রায় ১৫ দিন ধরে পানি বাড়তে থাকে। শুরু থেকেই পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও গড়াই নদীর গাড়াই রেল ব্রিজ পয়েন্ট থেকে পানি বৃদ্ধির মাত্রা সংগ্রহ করা হচ্ছিল। সংগৃহীত তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে দশমিক ৪ থেকে ৮ সে.মি. পানি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কুষ্টিয়ার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে সোমবার পানি বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১৪.১০ সে.মি.। যেখানে নির্ধারিত বিপদ সীমা ১৪ দশমিক ২৫ সে.মি.। কিন্তু আকস্মিক ভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় পানি বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার সকাল ১০টায় তা বিপদ সীমা অতিক্রম করেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার বেলা ৩টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে কাউন্ট হয়েছে ১৪ দশমিক ২৮ সে.মি.। এই বৃদ্ধির মাত্রা অব্যাহত রয়েছে। পূর্বাভাষ মতে এই বৃদ্ধির মাত্র আগামী আরও ৭দিন থাকবে বলে জানালেন এই কর্মকর্তা।
হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে পীযূষ কৃষ্ণ কণ্ডু জানান, গতকাল দুপুর পর্যন্ত পানি বৃদ্ধির মাত্রা আগের মতো থাকলেও পরে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে পানি দ্বিগুণেরও বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি পেতে থাকে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ফারাক্কা বাঁধের সবগুলো গেট একসঙ্গে খুলে দেওয়ায় পানির এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হচ্ছে বলে ধারণা করছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার উপপরিচালক শ্যামল কুমার বিশ্বাস জানান, গত ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবাদি কৃষি জমির ১৩শ ৫৯ হেক্টর জমিতে থাকা বিভিন্ন ফসল সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে। সর্বশেষ পানি বৃদ্ধির মাত্রা হঠাৎ যেভাবে দ্বিগুণ হারে দেখা দিয়েছে এবং পূর্বাভাসেও তথ্যমতে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে আরও দ্বিগুণ বা তারও বেশি কৃষি জমির ফসল বিনষ্টের আশঙ্কা করা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখনো আক্রান্ত এলাকায় অবস্থান করে নিবিড় ভাবে তথ্য সংগ্রহ করছেন। তবে ক্ষয়ক্ষতির মোট আর্থিক পরিমাপ এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।
এদিকে উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শনকালে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন জানান, তাৎক্ষণিকভাবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আক্রান্তদের সম্ভাব্য সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন মহলে অবগত করা হয়েছে এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তার জন্য।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত উপজেলা দৌলতপুর-কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জাহান বাদশা বলেন, বন্যায় আক্রান্তদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণসহ তাদের সম্ভাব্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। বন্যায় আক্রান্তরা যাতে ন্যূনতম জীবন যাপন করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ চাওয়া হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ত্রাণ সহায়তাসহ সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।