১.
যদি স্পষ্ট মনে পড়ে ১৯৯৬ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলাকালে কোন এক খেলা শুরুর আগে অথবা মধ্যভাগে বিটিভির পর্দায় ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস ওরফে নগরবাউল ওরফে গুরুরে প্রথম দর্শন। শ্রবণও। তখনও তিনি নগরবাউল হন নাই। অথবা হইতেছেন, কারণ যেই গানটা ওইদিন প্রচারিত হয় সেইটা ওই গানটাই। যান্ত্রিক নগরে এখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে... কিছু জেগে থাকা প্রজাপতি আর প্রহরীর হুঁশিয়ারি... আমি এক নগরবাউল জেগে আছি বড় একা...।
ক্লাস সিক্সে পড়া ক্রিকেট পাগল এক কিশোরের জন্য কথাগুলি একটু বেশিই দূরবর্তী (কাব্যিক?) হওয়ার কথা। গায়কের বেশভূষাও। ততদিনে একটা প্যানাসনিক ক্যাসেট প্লেয়ারের মালিক সে। তাতে হিন্দি গানই বেশি চলে। তখনকার সুপারহিট রঙ্গিলাসহ নানাবিধ টপ-টেন ক্যাসেটে আশ্রিত হিন্দি সিনেমার হিট গানগুলি মুখস্থ প্রায়। হানিফ সংকেতের রঙ্গ-কৌতুক, শুভ্রদেব, রবি চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ কিংবা পলাশ-রিজিয়ার হিন্দি গানের অতি-মূলানুগ বাংলা তর্জমা ইত্যাদি এইসবও চলে। মাঝে মধ্যে বিটিভিতে আব্দুন নূর তুষারের শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে প্রচারিত ব্যান্ডের গান, যেমন: এলআরবির আইয়ুব বাচ্চু বা আর্কের হাসানসহ আরো কয়েকজনের গানও রেকর্ড করে রাখা হইতো পরে আবার শোনা যাবে এমন প্রত্যাশায়, যাতে গান চলাকালে ঘরের সবার কথাবার্তা, এমনকি বাইরে কুকুরের গর্জনও শ্রবণযোগ্য হইতো কখনো কখনো! আলিফ লায়লার টাইটেল সং অথবা আলিবাবা-মারহাবা, শুক্রবারের বাংলা সিনেমার কিছু গানও এই পন্থায় ফিতায় জমতো। আর বাপের ইচ্ছায় পুরনো দিনের কিছু ‘মন জুড়ানো, ওল্ড ইজ গোল্ড’ বাংলা-হিন্দি গান যেমন: রবীন্দ্রনাথ, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ভূপেন হাজারিকা, জগন্ময় মিত্র ইত্যাদিও বাধ্য হইয়া শুনতে হইতো।
কিন্তু যেই গানটা ওইমাত্র শোনা হইলো আর গায়কের নামও জানা হইলো না তারে পাওয়া যাবে কেমনে? কয়দিন পর বাপে শ্রীনগর বাজারে যাবে শুনে একটা ক্যাসেটের আবদার জানিয়ে হাতে একটা চিরকুট ধরায় দেয়া হয়। তাতে লেখা থাকে ‘নগরবাউল/ আর্ক’। কিন্তু যেই ক্যাসেটটা বাপে নিয়া ফিরলো তাতে দলের নাম হিসেবে ফিলিংস লেখা থাকলেও প্রাথমিক বিভ্রাট উপলব্ধিতে খুব বেশি আসে যায় নাই। কারণ ওই এক ক্যাসেটেই তার সঙ্গীতের রূচি প্রায় সারাজীবনের জন্য বদলায় যায়!
২.
কিন্তু জেমসের অভিনবত্ব কিসে? বা আরো স্পষ্ট কইরা বললে, কেন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জেমসরে নিল? কণ্ঠ, গায়কি, সুর আর সঙ্গীত তো আছেই। কিন্তু যেইখানে তিনি একটা গুণগত পরিবর্তন আনেন, আমার ধারণা সেইটা লিরিক। সম্ভবত জেমসই প্রথম বাংলাদেশে ব্যান্ডের গান বইলা যে জিনিস চালু আছে তারে মধ্যবিত্তের পোয়েটিক্সের কাছাকাছি নিয়ে আসেন। এর আগে ব্যান্ড নিয়া রবীন্দ্রকাতর ও আধুনিক সাহিত্য কি কাব্যের নামে আকুপাকু করা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নাক শিটকানো ভাব ছিল। ব্যান্ডের গানে সেই অভিষ্ট কাব্যপনার অনুপস্থিতি ছিল তাদের বেদনার এবং একই সাথে প্রত্যাখ্যানের কারণ। কিন্তু জেমস খুব ‘কৌশলে’ তাদের ভিতরে জায়গা করে নেন। তার গানের কিছু অনুষঙ্গ এইক্ষেত্রে সহায়ক হইছে।
যেমন: তিনি শামসুর রাহমান, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আবুল হাসানের কবিতায় সুর বসাচ্ছেন। গানের কথায় পল সেজানের ছবি, লোরকার কবিতার অনুষঙ্গ আসতেছে। অনেক গানের লিরিক ওই সময়কার লিটিল ম্যাগাজিনের পাতার পাশে রাখলে কিছু সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া অসম্ভব না। ‘বুনো অর্কিড হৃদয়ে তোমার আদিম হিংস্রতায় মেতে ওঠে/ যখন আমার সবুজ আঁধার তোমাকেই শুধু শুধু ছুঁয়ে ছুঁয়ে/ জঙ্গলে ভালোবাসা’। ইত্যাদি। প্রিয় আকাশিতে স্বঘোষিত বোহেমিয়ান বাঙালি ভদ্রলোকের যে বিশ্বভ্রমণের বর্ণনা পাই সেইটা এখনকার ফোলা ফাঁপা মধ্যবিত্তেরও বাসনার বিষয়। বিশ্বের আধুনিক মেট্রোপলিটনে পশ্চিমা দুনিয়ার আর্ট-কালচারের কেন্দ্রগুলির অনুষঙ্গ এইখানে উপস্থিত। ফ্রাঙ্কফুটের বইমেলার নতুন বইয়ের গন্ধ, সিস্টিন চ্যাপেল, মিকেলেঞ্জেলোর পেইন্টিংস, মোজার্ট, বিটোভেন, ভ্যানগগ ইত্যাদি। মধ্যবিত্ত আগে খালি বই-পুস্তকের ভ্রমনকাহিনীতেই এইসব পড়ছে। নতুন যুক্ত হইছে হয়তো, প্যারিসে জিম মরিসনের সমাধি। তো, জেমস তো তখন নতুন সেক্সি। তারে কেন শুনবে না মধ্যবিত্তের আর্ট-কালচার? এমন আরো অনেক গানের কথাই বলা যায়।
মধ্যবিত্তের সঙ্গে জেমসের সেই সাক্ষাৎ প্রেম বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় নাই। কারণ মধ্যবিত্তের বাজার ছোট। আবার পাগলা হাওয়ার তরে মাটির পিদিম নিভু নিভু করে—এই জিনিস তো আর তারা খাবে না! কিন্তু আগের সেই জেমসরে নিতে হয় নব্বইয়ের শেষের দিকে আর্ট-কালচার করতে আসা প্রায় সবাইরেই।
(লেখাটির বানান ও ভাষারীতি লেখকের নিজস্ব)