পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে আপনার ছবি কেউ ফেইসবুকে পোস্ট করলে জেনে যাচ্ছেন আপনি। জেনে যাচ্ছে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। রাস্তায় হাঁটলে আপনি জানছেন না আপনার চেহারা দেখেই যাবতীয় তথ্য রেকর্ড করছে কোনো প্রতিষ্ঠান। কখনো কখনো অন্য কোনো পক্ষও সেসব তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। আধুনিক যুগের এমন গোয়েন্দা নজরদারিকে বলা হয় ফেসিয়াল রিকগনিশন বা চেহারা দেখে শনাক্ত করার প্রযুক্তি, যা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন অমৃত মলঙ্গী
লন্ডনের কিং ক্রস কমপ্লেক্সের গ্রানারি স্কয়ার এলাকায় পা রাখলেই আপনার সব তথ্য সেখানকার প্রশাসন জানতে পারবে। সিসিটিভি ক্যামেরায় আপনার ছবি দেখে অনলাইনের বায়োমেট্রিক ডেটা কিংবা ফেইসবুকের প্রোফাইলের তথ্য চোখের পলকে তাদের হাতে চলে যাবে। নিরাপত্তার অজুহাতে এভাবে পথচারীদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেয় সেখানকার প্রশাসন। তাদের কারিগরি সহায়তা করে আর্জেন্ট নামের একটি কোম্পানি।
বিষয়টি নিয়ে কয়েক মাস ধরে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। শুধু যে লন্ডনে এমন হচ্ছে তা নয়, অধিকাংশ দেশেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে এসব করা হচ্ছে।
যেভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি
ফেসিয়াল রিকগনিশন হচ্ছে একটি বায়োমেট্রিক পদ্ধতি। চেহারার মাধ্যমে মানুষকে শনাক্ত করতে মূলত এটি কাজ করে। এর কর্মপদ্ধতি বোঝার জন্য ফেইসবুকের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আপনার বন্ধু তালিকার বাইরে থেকেও কেউ যদি আপনার ছবি পোস্ট দেয়, তাহলে আপনার কাছে একটি নোটিফিকেশন আসে। ছবিতে আপনার মুখের ওপর একটি বক্স আঁকা থাকে।
ফেইসবুকের কেন্দ্রীয় সার্ভারে আপনার সব ছবি সংরক্ষিত থাকে। ‘আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশেষ টুল ব্যবহার করে আপনার চেহারা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন ডেটা রেখে দিয়েছে ফেইসবুক। যেখানেই আপনার ছবি আসুক না কেন, তারা সেটি ধরতে পারে। এসব তারা করে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে। এখন বিভিন্ন দেশের সরকার রাস্তায় রাস্তায় ফেসিয়াল রিকগনিশনে সক্ষম ক্যামেরা বসাচ্ছে।
তাদের কী লাভ
আপনার তথ্য দিয়ে ফেইসবুক কী করে, সেই প্রশ্ন তুলতে পারেন আপনি। সোজা কথায় তারা লাখ লাখ টাকা আয় করে। আপনি কাদের সঙ্গে মিশছেন, আপনার চলাফেরার অঞ্চল কতটুকু, আপনার পছন্দ-অপছন্দ কী, আপনার আইডি থেকে কোন পেজে বেশি ঢোকা হয়Ñ এসব ফেসিয়াল রিকগনিশনের ডেটা দিয়ে ফেইসবুক বুঝতে চেষ্টা করে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে আপনার নিউজফিডে বিজ্ঞাপন পাঠানো হয়।
ফেইসবুকের এই ফিচারটি আসে ২০১৭ সালের দিকে। তখন সবার আইডিতে ফিচারটি ‘অন’ ছিল। সমালোচনার মুখে তারা এখন ‘বন্ধ’ করার অপশন রেখেছে। অর্থাৎ ব্যবহারকারী চাইলে ফিচারটি ‘অফ’ করে দিতে পারবেন।
যারা আগে ‘ট্যাগ সাজেশন’ ফিচারটি চালু রেখেছিলেন, তাদের কাছে নোটিফিকেশন পাঠাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি। নতুন ব্যবহারকারীরাও এ নোটিফিকেশন পাচ্ছেন।
এটি বন্ধ করতে ফেইসবুকের ডানদিকের নিম্নমুখী তির চিহ্নে ক্লিক করে সেটিংসে যান। সেখান থেকে ফেস রিকগনিশনে যান। সেখানে ‘ডু ইউ ওয়ান্ট ফেইসবুক টু বি এবল টু রিকগাইজ ইউ ইন ফটোজ অ্যান্ড ভিডিওজ’ নামের অপশনটির পাশে ‘এডিট’ অপশন পাবেন। এখানে ক্লিক করুন। এরপর ড্রপডাউন বক্স থেকে ‘নো’ নির্বাচন করে ফেসিয়াল রিকগনিশন বন্ধ করে দিন। এরপর ‘ক্লোজ’ ক্লিক করুন।
ফেইসবুক অ্যাপ থেকে এ অপশন বন্ধ করতে মূল স্ক্রিনের ডান কোনায় তিনটি ডট আইকনে ক্লিক করুন। স্ক্রল করে সেটিংস অ্যান্ড প্রাইভেসি অপশনে যান। তারপর সেটিংস থেকে প্রাইভেসি ও সেখান থেকে ফেসিয়াল রিকগনিশন অপশনে যান। সেখানে ‘ডু ইউ ওয়ান্ট ফেইসবুক টু বি এবল টু রিকগাইজ ইউ ইন ফটোজ অ্যান্ড ভিডিওজ’ বক্সে চাপ দিন। পরে স্ক্রিনে ‘নো’ নির্বাচন করে দিন। এতে ফিচারটি বন্ধ হবে।
রাস্তায় এই প্রযুক্তি কেন
চীনে এই ধরনের প্রযুক্তি অলি-গলিতে। বিদ্রোহীদের দমিয়ে রাখতে শৃঙ্খলার কথা বলে দেশটির সরকার এমন করে থাকে।
চীনের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘এটি নিরাপত্তাপ্রযুক্তি। কয়েক জায়গায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ব্যবহারকারীর মুখ শনাক্ত করা যায়। তাই রাস্তায় চলাচলকারী কোনো ব্যক্তিকে সহজে বের করা সম্ভব।’
কিন্তু প্রযুক্তিবিদরা বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। কারণ রাস্তার ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে বলে অভিযোগ আছে। ওপেন ডেমোক্রেসি নামক একটি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, লন্ডনের পুলিশ ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি দিয়ে অপরাধীদের ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্য দেশের অবস্থাও তাই।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ৭৫টির মতো দেশে এই ধরনের ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। তবে কোন কোন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাদের নাম জানানো হয়নি।
বাংলাদেশের রাস্তায় সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবহারের কথা শোনা গেলেও এই ধরনের ক্যামেরার কোনো খবর এখনো পাওয়া যায়নি।
মুক্তির উপায় কী
যুক্তরাজ্যে এ ধরনের প্রযুক্তি সহজে ব্যবহার করতে পারে না প্রশাসন। যেসব এলাকায় ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো গোপনে। আর সেটি নিয়ে চলছে মামলা। দেশটির আইনে বলা হয়েছে, এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করার আগে সাধারণ মানুষকে অবহিত করতে হবে।
এই প্রযুক্তিতে নৈতিকতা ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল। ওই পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপকসহ আট সদস্য রয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ফেসিয়াল রিকগনিশনের মতো প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা যাবে, সে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে। গত বছরে গুগলের তৎকালীন ক্লাউড কম্পিউটিং বিভাগের প্রধান ডিয়ান গ্রিন বলেন, বিভিন্ন তথ্যের অভাবে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্ক আছে। সেই বিতর্ক আমরা দ্রুততম সময়ে দূর করতে চাই।