ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রগতিশীল বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী, সাধারণ শিক্ষার্থী ছাড়াও আওয়ামী-বিএনপি-বামপন্থী কয়েকজন শিক্ষককেও অংশ নিতে দেখা যায়।
মানববন্ধনে বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, শিবির করার জন্য কাউকে মেরে ফেলা যায় কি না? ভারতের সমালোচনা করলে সেটা অপরাধ হয়ে যায় কি না?
এমন প্রশ্ন তুলে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) জাবি শাখার সভাপতি মাহাথির মুহাম্মদ বলেন, ‘আবরারের ফেইসবুক পোস্টটি দেখেছি। সে বাংলাদেশের সম্পদ ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার সমালোচনা করেছে, এটা কি তার অপরাধ ছিল? সে লিখেছে বাংলাদেশকে ভারত এক সময় তাদের সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেয়নি। আজকে ভারতকে বাংলাদেশের দুই সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে। ভারতকে খুশি রেখে যে ক্ষমতায় টিকে থাকবার প্রয়াস, এই প্রয়াসের সমালোচনা করেছিল বুয়েটে আমাদের বন্ধু আবরার। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে তার এ অধিকার রয়েছে। কিন্তু বুয়েটে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা তাকে এ জন্য ডেকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। ফেসবুকে পোস্ট করার জন্য তাকে ওরা ডাকতেই পারে না। হত্যা করার পর তাকে শিবির হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।’
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী কাব্য কৃত্তিকা বলেন, ‘একজন মানুষকে তার আদর্শিক পরিচয়ের কারণে মেরে ফেলা যায় না। সে যদি শিবির করে আর শিবির করা যদি ঘৃণ্য হয় তাহলে দেশে আইন আছে। আইন তার বিচার করবে। একজন মানুষ সে যেকোনো আদর্শেরই হোক না কেন নাস্তিক বা শিবির বলে তাকে হত্যা করা জায়েজ হতে পারে না।’
শাখা ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সুস্মিতা বলেন, ‘ভারতের দুটি রাজ্য যখন কোনো বিনিময় ছাড়া একে অপরকে কিছু দিতে রাজি হয় না সেখানে বাংলাদেশ কোনো বিনিময় ছাড়া ভারতকে আমাদের সমস্ত সম্পদ তুলে দিচ্ছে। এই নতজানু নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে আবরার খুন হয়েছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে সমস্ত জাতি তাকিয়ে থাকে যে এখান থেকে জাতির ভবিষ্যৎ মাথারা বের হবেন, সে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন এমন নৃশংস খুন হয় তখন আমাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না বাংলাদেশ কী অবস্থায় রয়েছে। এই খুন শুধু বুয়েটের বিষয় নয়। সারা দেশের মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ খুনের বদলা নিবে।’
জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আশিকুর রহমান বলেন,‘লক্ষ শহীদের রক্তে কেনা এমন এক স্বাধীনতা আমরা পেলাম যেখানে মুক্ত চিন্তার কোনো দাম নেই। আজ শিবির সন্দেহ হওয়ায় আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে। আমার প্রশ্ন এই অধিকার তাদের কে দিয়েছে?’
নৃবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, আজকে আপনারা দেখছেন এ দেশে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই, গণতন্ত্র নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বলেন, পাড়া-মহল্লায় বলেন আর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বলেন, অপরাধীরা অপরাধ করে নির্বিঘ্নে পার পেয়ে যায়। আমরা জানতে চাই, ভারতের সঙ্গে যে কয়েকটি চুক্তি করা হয়েছে, তার মধ্যে একটাও কি বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক চুক্তি হয়েছে? একটাতেও কি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা হয়েছে? যত দিন পর্যন্ত না আমরা রাষ্ট্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারব, সত্যিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তত দিন পর্যন্ত এ অন্যায় চলতে থাকবে। বাংলাদেশ ক্রমে ক্রমে সে জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে আপন সন্তানকে যদি মেরে ফেলা হয় বাবা প্রতিবাদ করতে ভয় পাবে। আমি আগামী প্রজন্মকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাহস নিয়ে দাঁড়াতে বলি।’
মানববন্ধন শেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে গিয়ে মিছিলটি শেষ হয়।
রোববার রাত ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হলের একতলা থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মাঝ থেকে আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
জানা যায়, রাতে বুয়েটের শের-ই বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে আবরারকে পেটান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। পরে দিবাগত রাত তিনটার দিকে হল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
মারা যাওয়া আবরার বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি কুষ্টিয়া শহরে।