বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী নিহত আবরার ফাহাদের মা রোকেয়া বেগম ছেলের হত্যার বিচার চেয়ে রাজপথে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা চেয়ে বলেছেন, এক ছেলেকে হারিয়েছি আর কোন ছেলেকে হারাতে চাই না। আমি ওদের নিরাপত্তা চাই।
শুক্রবার কুষ্টিয়ায় আবরার ফাহাদের কুলখানি অনুষ্ঠানে দোয়া-মোনাজাত শেষে তার মা রোকেয়া বেগম এ কথা বলেন। এর আগে, বাদ জুম্মা কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গা জামে মসজিদে মিলাদ ও মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে আবরার পরিবারের আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ছাড়াও গ্রামবাসী অংশ নেন।
মা রোকেয়া বেগম বলেন, আমরা ছেলের জন্য সব ছেলেরা রাজপথে নেমেছে। আমি চাই না আমার মতো আর কোন মায়ের বুক খালি হয়। আমার এক ছেলে নেই, এখন সব বিশ^বিদ্যালয় কলেজের ওরাই আমার ছেলে। ওদের ওপর যেন কোন অত্যাচার না হয়। এক ছেলেকে হারিয়েছি আর কোন ছেলেকে হারাতে চাই না। আমি ওদের নিরাপত্তা চাই।
বুয়েট ক্যাম্পাসে ভিসির সাথে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে দেশ রূপান্তরকে আবরার ফাহাদের পিতা বরকত উল্লাহ বলেন, এই বহিষ্কার যেন স্থায়ী বহিষ্কার হয়। আবরার হত্যার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে দিয়ে দ্রুত বিচার সম্পন্ন পূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। চরম নিরাপত্তাহীনতায় থাকা পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বুয়েট ক্যাম্পাস থেকে আর কোন পিতা-মাতার সন্তান হারানো কষ্ট যেন বইতে না হয় তার স্থায়ী সমাধান চাই।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে আবরারের গ্রামের বাড়ি রায়ডাঙ্গাতে পরিবারের সাতে দেখা করতে যান কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জজ। সেখানে আবরারের দাদা আব্দুল গফুর, পিতা বরকত উল্লাহ, মা রোকেয়া খাতুনের সাথে দেখা করে সমবেদনা জানান। সাংসদকে কাছে পেয়ে দাদা আব্দুল গফুর বলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর সাংসদ সেলিম আলতাফ জর্জের দাদা গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছিলেন।
পরে সাংসদ সেলিম আলতাফ পরিবারের ইচ্ছে অনুযায়ী আবরারের স্মৃতি স্মরণে বাড়ির সামনের আধা কিলোমিটার সড়ক পাকাকরণসহ ‘আবরার ফাহাদ সড়ক’ নামকরণের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে আরবারের কবর পাকা ও সেখানে সোলার লাইট লাগিয়ে দেবেন, বাড়ির সামনের মসজিদও উন্নয়ন করে দেবেন বলে জানান তিনি।
এ সময় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ সাংসদকে বলেন, তার ছোট ছেলে ঢাকা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আবরার ফায়াজ ঢাকায় যেতে ভয় পাচ্ছে। সে ঢাকায় পড়তে যেতে চাচ্ছে না। একথা শুনে সাংসদ আশ্বস্ত করে বলেন, ফায়াজকে ঢাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ পড়ালেখা সম্পন্ন করার সব ব্যবস্থা করে দেবেন।
পরে সাংসদ সেলিম আলতাফ জর্জ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি রাজনীতি করতে সেখানে যাইনি। প্রথমত আমি মানুষ, মানবিক দিক বিবেচনা করে সেখানে গেছি। আমি জানি তারা আওয়ামী লীগের। ওর (আবরার) দাদা আবদুল গফুর বিশ্বাস আমার দাদা গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে ’৭০ সালে নির্বাচন করেছে। ওর বাবাকে চিনি, ওর চাচাকে চিনি। তারা আওয়ামী লীগ করে। তারা আমাদের রক্তের লোক। কে কী বলে, সেটা দেখার বিষয় না। আবরার হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিতে সারা দেশের মানুষের সঙ্গে আমি একমত।’
বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। রবিবার মধ্যরাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের নিচতলা ও দোতলার মাঝামাঝি সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
একাধিক শিক্ষার্থী ও এক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে হামলাকারীদের নির্মম নির্যাতনের মুখে আবরার দুবার বমি করেন। সঙ্গে প্রস্রাবও করেন।
এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বুয়েট ছাত্রলীগ নেতাকর্মীসহ ১৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
আবরার হত্যাকাণ্ডে ১৯ জনকে আসামি করে গতকাল রাতে চকবাজার থানায় মামলা করেছেন তার বাবা বরকত উল্লাহ। তবে এজাহারের বাইরে বেশ কয়েকজন এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বুয়েট শাখার ১১ জন নেতাকর্মীকে স্থায়ী বহিষ্কার করেছে ছাত্রলীগ।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ফেনী নদীর পানি বণ্টন ও বন্দর ব্যবহারসহ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন চুক্তির সমালোচনা করে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় শিবির সন্দেহে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।