১১ অক্টোবর শুক্রবার ছিল ‘আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস’। পৃথিবীজুড়ে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর প্রথম এ দিবসটি পালন করা হয়। মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনি সহায়তা ও ন্যায্য অধিকার, চিকিৎসা সুবিধা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, নারীর বিরুদ্ধে হিংসা ও বলপূর্বক বাল্যবিয়ে বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে এ দিবসের সূচনা হয়। শিশুদের প্রতি সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ কন্যা শিশুর অগ্রযাত্রার পথে এক মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা। দেশে যখন শিশুদের ওপর নানারকম সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন বাড়ছে; সে সময়ে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালনের দিনটিতেই দেশের নানা সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে রাজধানীর এক স্কুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার মামলায় একমাত্র আসামির মৃত্যুদণ্ডের খবর। দৃষ্টান্তমূলক এ রায় শিশুদের ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে ইতিবাচক বার্তা দেবে বলে আশা করা যায়।
শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘একমাত্র আসামির ফাঁসির আদেশ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে এই রায়ের খবর প্রকাশিত হয়। এতে জানানো হয়েছে, রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে ছুরিকাঘাতে হত্যার দায়ে একমাত্র আসামি ওবায়দুল হককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে কান্নায় ভেঙে পড়েন রিশার মা তানিয়া হোসেন। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমার মতো যেন আর কোনো মায়ের কোল খালি না হয়।’ মায়ের এ আর্তনাদ দেশের সব মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যাক, সমাজে শুভ বোধের সঞ্চার করুক এবং শিশু নির্যাতন ও হত্যা বন্ধে মানুষকে জাগ্রত করুকÑ সেটাই প্রত্যাশা।
কতটা আকস্মিক ও নির্মমভাবে একটা কন্যা শিশুকে নির্যাতনের শিকার হতে হয় এমনকি প্রাণ হারাতে হয়, সুরাইয়া আক্তার রিশার মৃত্যু যেন তারই এক নির্মম দৃষ্টান্ত। ২০১৬ সালের শুরুর দিকে মায়ের সঙ্গে রাজধানীর একটি বিপণিবিতানে দর্জির দোকানে পোশাক বানাতে দিতে গিয়েছিল রিশা। রসিদ থেকে ফোন নম্বর সংগ্রহ করে ওই দোকানের কর্মচারী ওবায়দুল হক বিভিন্ন সময় ফোন করে রিশাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বিরক্ত করত। এক পর্যায়ে রিশার মা তাকে সতর্কও করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয় ওবায়দুল। ওই বছরই আগস্ট মাসের ২৪ তারিখে রিশা পরীক্ষা শেষে এক বন্ধুর সঙ্গে স্কুলের পাশের পদচারী সেতু পার হচ্ছিল। এ সময় ওবায়দুল এসে রিশাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। প্রত্যাখ্যান করায় তৎক্ষণাৎ রিশাকে ছুরিকাঘাত করে ওবায়দুল। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮ আগস্ট রিশা মারা যায়। রিশার এই মর্মান্তিক মৃত্যু সে সময়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
রিশা হত্যার ঘটনা সমাজে ব্যাপক অবক্ষয়ের একটা চিত্র মাত্র। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মেয়েদের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রা দৃশ্যমান হলেও অগ্রগতির এই চিত্রকে ম্লান করে দিচ্ছে একের পর এক নারী ও শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। সামাজিক এই অবক্ষয় যে কোন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে তার একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে শিশু নির্যাতনের কিছু পরিসংখ্যান থেকে। বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর এক প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৮ সালে দেশে ধর্ষণের শিকার হয় মোট ৩৫৬ শিশু, যার মধ্যে ২২ শিশুই ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে। এসব খবর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শিশুরা প্রতিবেশী, উত্ত্যক্তকারী, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন বা অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে উত্ত্যক্তকারী দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১০ শিশু আর প্রতিবেশীর দ্বারা ১০২ শিশু। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৩৭ শিশু এবং শিক্ষক দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৭ শিশু।
মনোরোগ চিকিৎসক, আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, শিশুদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম বলে তারাই বেশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। পাশাপাশি ধারণা করা হয়, শিশুরা অপরাধীকে শনাক্ত করতে পারবে না এমন ধারণা থেকেও নির্যাতকরা নিপীড়নের জন্য শিশুদের বেছে নেয়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র ও বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দেশে ধর্ষণের শিকার অর্ধেক শিশুর বয়সই ১২ বছরের কম। সমাজকে এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে মুক্ত করতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সচেতন নাগরিকসহ গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সংবাদমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রতিদিনই অগণিত নেতিবাচক সংবাদের ভিড়ের মধ্যে ইতিবাচক সংবাদও হারিয়ে যায়। এমনিতেই দেশে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো মারাত্মক সহিংসতার তুলনায় বিচার ও শাস্তির হার কম। তাই নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে এ ধরনের যেকোনো সহিংসতার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির খবরও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করতে হবে। তাতে সমাজে এমন অপরাধের প্রবণতা কমবে বলে আশা করা যায়।