বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে সমাজের জন্য যে কাজ করছেন, সেগুলোর মাধ্যমে অনেক অর্জন জান্নাতুল মাওয়ার। লিখেছেন আবু সালেহ সায়েম
মেয়েটি নিজেকে বলেন মানুষ– জানান আমি বুদ্ধিমান। পাঁচ ফিট চার ইঞ্চির বেশি হবেনই। সমাজসেবী হিসেবে নাম করেছেন। জান্নাতুল মাওয়া নানা সংগঠনে নিজেকে ছড়িয়ে দিলেও শুরুটি করেছিলেন ‘অল ফর ওয়ান’ নামের মেয়েদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনে। প্রথম চারজনের একজন, মূল প্রতিষ্ঠাতা কামরুন্নেসা মীরা। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং ও অ্যাকাউন্টিং ডাবল মেজর নিয়ে বিবিএ। সিজিপিএ ৩.৬২। প্রথম থেকে এত ভালো ফলাফল করেছেন যে প্রতি সেমিস্টারে ১০ শতাংশ করে শিক্ষাবৃত্তি পেয়েছেন। ২০১৬ সালে গ্রামীণফোনের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ইন্টার্ন করেছেন। তারও আগে লেখাপড়া করেছেন চট্টগ্রামের হাজী মুহম্মদ মুহসীন কলেজে। বিখ্যাত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। পাস করেছেন ২০১১ সালে, জিপিএ ‘ফাইভ’।
এখন যে সমাজ পরিবর্তনের নানা ক্ষেত্রে কাজ করেন, সেই মাওয়ার ছোটবেলা ছিল অন্যরকম। বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতেন স্কুলের গাড়িতে। একা কোথাও যেতেন না। ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলেন। তবে ফলাফল বরাবরই ভালো ছিল, ক্লাস ক্যাপ্টেন হতেন। বাবা মোহাম্মদ মাহবুবুল হক পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। সিআইডিতে চাকরি করতেন। মা নুরুন্নাহার গৃহিণী ছিলেন। বড়বোন জান্নাতুন নাঈম এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়েছেন। বিশ্ববিখ্যাত আন্তর্জাতিক এই নারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্স, ফিলসফি অ্যান্ড ইকোনমিকস বিভাগে পড়ালেখা করছেন ফুল ফ্রি স্কলারশিপে। ছোটবোন জান্নাতুল আদন পাস করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ইইই (ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগে। পাস করে লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিন বোনের এত ভালো পড়ালেখা ও ফলাফলের কারণ? মাওয়া বললেন, ‘‘বাবা ছোটবেলা থেকে আমাদের মেয়ে হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে বড় করেছেন। লেখাপড়ার দিকে খুব মনোযোগী ছিলেন। ভালো ফলাফল ভালো করলে দামি কলম উপহার দিতেন। সবুজ রঙের একটা কলমের কথা এখনো মনে আছে।’ বাবার কথা মনে করে স্পষ্ট সুরে বলেন, ‘আব্বু সবসময় বলতেন, লেখাপড়াই মানুষের শক্তি। সবকিছু চলে গেলেও লেখাপড়া থেকে যাবে’।” বাবার কথাগুলোই তার মেয়েরা জীবনের পাথেয় করেছেন। তিনি আরও বলতেন, ‘শোককে শক্তিতে রূপ দিতে হবে।’ তখন কথাটির অর্থ বুঝতেন না, এখন বুঝেন জীবন চলার প্রতিটি মুহূর্তে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যোগ দিলেন আর্ট ক্লাবে। প্রথমে সাধারণ সদস্য, পরে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, সেক্রেটারি, ভাইস প্রেসিডেন্ট হলেন। ছিলেন ২০১৬ সাল পর্যন্ত। বার্জারের ‘তোমার রঙে রাঙাও ক্যাম্পাস’ প্রতিযোগিতায় প্রধান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এনেছেন ৫০ হাজার টাকার প্রথম পুরস্কার। আরও পরিচয় আছে– তিনি উদ্যোক্তা। মেয়েদের জন্য অনলাইনের পোশাক বিক্রির দোকান বা শপটির নাম ‘মাওয়া’। ব্যবসাটি শুরু করেছিলেন ২০১৭ সালে। মেয়েদের মার্জিত ও স্বকীয় ডিজাইন করেন। পরেও স্বাচ্ছন্দ্য লাগে। কুর্তি, কামিজ, কটি, আবায়া বিক্রি হয়। সবই মাওয়ার নিজের ডিজাইনের। ছোটবেলায় যে স্কুলের খাতায় নানা ধরনের ডিজাইন করতেন, সেগুলোই আস্তে আস্তে তাকে পোশাকের ডিজাইনার বানিয়ে দিল। ব্যবসাটি থেকে যে লাভ আসে, সেসব টাকা জমাচ্ছেন। টাকা দিয়ে মানুষের জন্য কোনো কিছু করার পরিকল্পনা আছে। স্বপ্নটি তার এসেছে অষ্টম শ্রেণির সেই বালিকাবেলাতে। তবে সে ভালোবাসা পূরণ করতে পারলেন কলেজে। পড়ার সময় শীতকালে বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে টাকা উঠিয়ে নিউমার্কেট থেকে পোশাক কিনে আনতেন। সেগুলো চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে ঘুরে ঘুরে রিকশাচালকসহ নানা শ্রেণির ভাসমানদের দান করতেন। কাজ করেছেন লিপিং বাউন্ডারিজে মেন্টর হয়ে। মাদ্রাসার ছাত্রীদের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়নে তারা কাজ করেছেন। নানা ধরনের গল্প ও খেলার ছলে তাদের হতাশা, নানা ধরনের স্ট্রেস বা চাপ সামলানো, রাগ নিয়ন্ত্রণ, শান্তিপূর্ণ নেতৃত্বদান, চারপাশে সীমানা গড়ে তোলা, ঠিক সময়ে ঠিকভাবে ‘না’ বলতে শেখা শিখিয়েছেন। যেকোনো মানুষের জন্য তার পরামর্শ, সামনে কী হতে পারে চিন্তাটি মাথায় রেখে রুটিন করে কাজ করলে কোনো মানুষ তার স্ট্রেস বা চাপগুলো থেকে মুক্তি পাবেন। জীবনের বা যেকোনো কাজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকলে, উদ্দেশ্য ও কেন সেটি করছেন ভেবে কাজ করতে হবে। মানুষকে জীবনযাপনের জন্য পরামর্শ, কোনো সময়ই দুশ্চিন্তা না করা, ধৈর্য ধরা, লক্ষ্যে আবিচল থেকে স্রষ্টার ওপর বিশ্বাস রেখে এগুতে হবে।
অল ফর ওয়ানে সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের মাসিক স্বাস্থ্য প্রোগ্রামের প্রজেক্ট হেড হিসেবে কাজ করেছেন। প্রথম ছিলেন ঢাকার মিরপুরের ধামালকোট স্কুলে। মাসিক হলে কী খেতে হয়, কীভাবে নিজের যত্ন করতে হয়, কীভাবে পরিষ্কার কাপড় পরতে হয়, স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপযোগিতা বুঝিয়েছেন কোমল মেয়ে শিশুদের। তাদের জন্য পরামর্শ, মেয়েদের জীবনে মাসিক একটি শক্তি। প্রাকৃতিকভাবেই তারা এই গুণটি বহন করেন ও পরে সন্তানের জন্ম দেন। কোনো অসুবিধা হলে মা না থাকলে বাবাকে বলতে হবে, না হলে ভাইকে। নানা বয়সের এই মানুষদের জন্য তাদের আরও বলার আছে– নিজেকে বদলাতে হবে, ভালো থাকতে হবে। আশপাশের মানুষকেও ভালো রাখতে হবে। এরপর সমাজকে ভালো রাখতে হবে। মাসিককে স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে গিয়েছেন সারা দেশের ২০টি স্কুলে; ঢাকার কড়াইল, নাখালপাড়া বস্তিতেও। তারা অল ফর ওয়ানের হয়ে দেখেছেন মেয়েরা মাসিক নিয়ে কথা বলেন না, লজ্জা পান। পরে তাদের লজ্জা ভাঙিয়েছেন। ছোট ছোট শিশুদের সচেতন করেছেন যৌন নির্যাতন নিয়েও।
ধামালকোট স্কুলে তাদের ‘প্যাড ব্যাংক’ আছে। স্কুলের আয়ার কাছে রেখেছেন তারা। মেয়েরা সেখান থেকে বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড নিতে পারেন। শিক্ষকদের ছাত্র, ছাত্রীদের সাহায্য করতে অনুরোধ করেছেন। তাদের তারা গঠনমূলক পরামর্শ দেন। ছেলেদের বলেন, যেন মেয়েদের সাহায্য করেন। সিলেটের জমশেদ নগরেও গিয়েছেন। সেখানে দুইশ মেয়েকে, যাদের বেশিরভাগ চা শ্রমিক; এই নারীরা বালু সরিয়ে টয়লেট করেন। পিরিয়ড বা মাসিকের সময় নোংরা, বাজে কাপড় ব্যবহার করেন। নানা ধরনের রোগ, সার্ভিক্যাল ক্যানসারে ভোগেন। তাদের সচেতন করেছেন। স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে সচেতন করেছেন। অনেকেই ন্যাপকিন ব্যবহার করেন অথচ বলতেই লজ্জা পেতেন আগে।
কাজ করেছেন হাসিমুখে। গেল বছর মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর কী অক্টোবর পর্যন্ত ছিলেন। ঢাকার পরীবাগের এই বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণিতে কাজ করেছেন। ওদের ইংরেজি বর্ণমালা, জীবনমুখী নানা ধরনের গান ও জীবনের বোধ জানিয়েছেন। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়–কথাটিই বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। তারা তাকে ‘এ, বি, সি, ডি’ মিস ডাকতেন।
নানা সংগঠনে কাজের সূত্রে স্বীকৃতিও জুটেছে। ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার জার্মান দূতাবাস ‘ইওর এনগেজমেন্ট কাউন্টস’ নামের তরুণদের উদ্যোগের প্রতিযোগিতা করে। সেরা নয়জনের একজন ছিলেন। জাগো ফাউন্ডেশন, স্কুল অব হোপ, মালায়া ফাউন্ডেশনের সঙ্গে তাকেও পুরস্কার দেওয়া হয়। ২২ নভেম্বর দেশের সেবা করা সমাজকর্মী, উদ্যোক্তা, খেলোয়াড়, শিক্ষক মিলিয়ে মোট ১৫০ জন নির্বাচিত তরুণ-তরুণীকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়। আয়োজনটির নাম ছিল ‘লেটস টক উইথ প্রাইম মিনিস্টার অব বাংলাদেশ- শেখ হাসিনা’। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, কীভাবে আমাদের দেশের দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব? বঙ্গবন্ধুর মেয়ে উত্তরে বলেছেন, ‘আমরা মানুষের উপার্জনের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এই ক্ষেত্রে আমাদের ধারাবাহিক কাজ আছে। তাহলেও মানুষ কেন দুর্নীতি করছেন? তরুণরা এখন দুর্নীতি নিয়ে ভাবছেন, ফলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাধ্যমে আমাদের দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে।’ বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে এ বছরও তিনি রমজানে তহবিল জোগাড় করে দিয়েছেন গরিব ও অসহায়দের। পথশিশুদের বিদ্যালয় হাসিমুখের জন্য দেড়শ শিশুর একদিন ইফতারির আয়োজন করে দিয়েছেন। চট্টগ্রামের বায়ান্ন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে ১২শ গরিব মানুষের জন্য ইফতারি ও সাহরির আয়োজন করে দিয়েছেন। এছাড়াও সাজেদা ফাউন্ডেশনের জন্য ঈদের সময় শিশুদের জন্য ঈদবস্ত্র কিনে তাদের মধ্যে বিলির ব্যবস্থা করেছেন। রংপুরের ‘সোনালী স্বপ্ন’ ক্লাবের জন্য আড়াইশ মানুষের ঈদের পোশাক বিলির অনুষ্ঠানে সাহায্য করেছেন। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের শিশুদের ইফতারের আয়োজনের কাজেও অংশ নিয়েছেন। ঈদ শেষে পরিবর্তন ফাউন্ডেশনের সচ্ছলতা প্রকল্পের কাজ দেখতে সাভার গিয়েছিলেন। গেল মাসে সিআরআই ও ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশন অব রিফিউজির লেটস টক অন দি ফিউচার অব রোহিঙ্গা প্রোগ্রামের মাধ্যমে তারা ১০ জন ছিলেন রোহিঙ্গা শিবিরে। এই শরণার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় জেনেছেন, দেশে ফিরতে চান তারা। তবে বসত, নিরাপত্তা, কর্মের সুযোগ থাকতে হবে। তাদের জন্য আলাদা বার্মিজ বর্ণমালার স্কুল আছে। ইংরেজি শেখানো হচ্ছে। সেই আলাপ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমকে জানিয়েছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে অংশ নিয়েছেন সিটি ব্যাংকের সিটি আলো ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন মাসের নারী উদ্যোক্তা কোর্সে। এক্সেপশনাল স্টুডেন্ট নামের ক্রেস্ট পেয়েছেন। ঢাকার গুলশানে সিটি আলোর অফিসে তারা দুইদিনের মেলা করেছেন বিনা খরচে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের লেখাপড়া শেষে এখন অ্যালামনাই তিনি। ক্যারিয়ার ও অ্যাকাডেমিক কমিটির সহ-সমম্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন জুনিয়রদের নিজের অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে।