গবেষণা দিয়ে শুরু: নোবেল জয়ে বাঙালি স্বামীই হলেন এসথেরের গুরু

ইতিহাসবিদ হতে চেয়ে হয়ে গেলেন অর্থনীতিবিদ। অধ্যাপক-গবেষক, সহকর্মী অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই তার এমন বদলে যাওয়া। যার ফল পেলেন সোমবার। অর্থনীতিতে নোবেল জিতলেন এসথের ডুফলো। 

বিশ্বে দারিদ্র্য দূরীকরণ নিয়ে স্বামী অভিজিতের সঙ্গে নোবেল পেয়েছেন তিনিও। এসথেরই অর্থনীতিতে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নোবেল প্রাপক। অর্থনীতিতে একই সঙ্গে একই বছর স্বামী-স্ত্রী যুগ্মভাবে নোবেল প্রাপ্তি এ প্রথম। 

১৯০৩ সালে পদার্থবিদ্যায় তেজস্ক্রিয়তার উপর গবেষণায় স্বামী পিয়ের কুরির সঙ্গে নোবেল পেয়েছিলেন তার স্ত্রী মেরি কুরি।
মাইক্রো-ইকনমিক্স নিয়েই মূলত গবেষণা এস্থেরের। উন্নয়নশীল দেশগুলির আর্থ-সামাজিক অবস্থাও তার গবেষণাপত্রের অন্যতম বিষয়। যার মধ্যে রয়েছে গার্হস্থ্য সমস্যা, শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থা, স্বাস্থ্যসহ অনেক কিছু। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডিন কারলান, মাইকেল ক্রিমার, জন এ লিস্ট এবং সেনধিল মুল্লাইনাথান, অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন এস্থের। 

সেই সময় তিনি সেন্টার ফর ইকনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের ডিরেক্টর এবং ব্যুরো অব রিসার্চ অ্যান্ড ইকনমিক অ্যানালিসিস অব ডেভেলপমেন্ট (BREAD)-এর বোর্ড অব ডিরেক্টরের সদস্য।

নোবেল কমিটির ঘোষণার পরে এসথের ডাফলো ও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় একই সঙ্গে বলেন, ‘বিশ্বে ৭০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করছেন। পাঁচ বছর বয়সের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই ফি বছর মৃত্যু হয় ৫০ লাখ শিশুর। যার অন্যতম কারণ অপুষ্টি, স্বাস্থ্যহানি, এমন রোগ যা চিকিৎসার মাধ্যমে সারানো সম্ভব অথচ অর্থ এবং সচেতনতার অভাবে সেটা সম্ভব হয় না।’

১৯৭২ সালে প্যারিসে জন্ম এসথেরের। বাবা মাইকেল ডাফলো অঙ্কের অধ্যাপক। মা ডাক্তার। ছোট থেকেই ইতিহাসের নানা বিষয় টানত তাকে। 

জানিয়েছেন, যখন বয়স আট বছর, চেয়েছিলেন ইতিহাসবিদ হবেন। ইউনিভার্সিটিতে তার বিষয়ও ছিল ইতিহাস। ১৯৯৩ সালে মস্কোতে দশ মাস থেকে তিনি অধ্যাপনা করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস, রাজনীতি নিয়ে চর্চা শুরু হয়। একই সঙ্গে তার আকর্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে অর্থনীতি। ইউনিভার্সিটি থেকে একই সঙ্গে ইতিহাস ও অর্থনীতি নিয়ে ডিগ্রি লাভ করেন এসথের।

১৯৯৯ সালে ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা শেষ করেন। রিসার্চ স্কলার থাকার সময়েই তার পছন্দের অধ্যাপক ছিলেন অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জোসুয়া অ্যাঙ্গরিস্ট। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানেই বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এমআইটিতেই অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতা ও গবেষণা পাশাপাশি, সমান্তরালভাবে চলতে থাকে।

২০০৩ সালে এমআইটিতেই ‘পোভার্টি অ্যাকশন ল্যাব’ তৈরি করেন। স্যর, বন্ধু, সহকর্মী অভিজিতের সঙ্গে এই ল্যাবেই অর্থনীতির নানা বিষয় নিয়ে অন্তত ২০০টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এস্থার। পেশা এবং গবেষণা ছাপিয়ে সম্পর্কের গভীরতা আরও গাঢ় হয়। একসঙ্গে জীবনের পথে চলার সিদ্ধান্ত নেন এসথের-অভিজিৎ। 

২০১০ সালে কম বয়সে অর্থনীতিতে অন্যরকম ভাবনা ও পথপ্রদর্শনের জন্য ‘জন বেটস ক্লার্ক মেডেল’ পান এসথের। ওই বছরই ইউনিভার্সিটি অব ক্যাথলিক দে লাওভেন থেকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়ে যান এসথের। সমাজ বিজ্ঞান এবং অর্থনীতিতে ইনফোসিস পুরস্কার তার ঝুলিতে ওঠে ২০১৪ সালে। জীবনের যে কোনও পর্যায়েই শক্ত খুঁটির মতো পাশে ছিলেন স্বামী অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০০৮ সালে  বিশ্বের ১০০ জন মেধাবী মানুষের মধ্যে সামনের সারিতেই এসথের ডুফলোর নাম লেখে আমেরিকার ম্যাগাজিন ‘ফরেন পলিসি’। ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর তালিকায় বিশ্বের সেরা আট অর্থনীতিবিদের মধ্যে নাম ওঠে তার। ২০১১ সালে ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এর প্রকাশিত বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায়ও প্রথম সারিতেই দেখা যায় তাকে।

সূত্র ভারতীয় গণমাধ্যম।