২০১৬-তে ফিফার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেভাবে এশিয়ার ফুটবলে দৃষ্টি দিতে পারেননি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ফুটবলের বিশ্ব সংস্থার খোলনলচে পাল্টে ফেলার উদ্দেশ্যে একটি নতুন অবকাঠামো গড়তেই কেটেছে তার প্রথম মেয়াদ। এ সময়টায় সদস্য দেশগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। খেলার সুযোগ বাড়াতে বিশ্বকাপের মতো আসরে দলসংখ্যা বাড়ানোর মতো যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এ বছর জুনে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দৃষ্টি দিচ্ছেন ফুটবলে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর দিকে। ফুটবল যাতে সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে, সেই ব্রত নিয়েই তিনি বের হয়েছেন এশিয়ার পিছিয়ে থাকা দেশগুলো সফরে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে প্রায় ১৫ ঘণ্টা কাটিয়ে গেলেন। নানামুখী ব্যস্ততা তো ছিলই, সেই সঙ্গে পরিচিত হলেন ঢাকার ট্রাফিক জ্যামের সঙ্গেও। তবে ঢাকা এসে যে অভিজ্ঞতাটা নিলেন ইনফান্তিনো, তা তিনি কল্পনাও করেননি। মঙ্গোলিয়া থেকে উড়াল দেওয়ার আগে সম্ভাব্য ঢাকা সফরের সফলতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন ছিল পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই এই ইতালিয়ান বংশোদ্ভ‚ত সুইস ভদ্রলোকের। সহকর্মীদের কাছ থেকে আগেই জেনে ছিলেন এদেশের মানুষের ফুটবলের চেয়ে বেশি আগ্রহ ক্রিকেট নিয়ে। সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছেÑ দাবি করে ইনফান্তিনো বলে দিয়েছেন, এদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তার ধারেকাছে নেই ক্রিকেট।
ফুটবল বিশ্ব যিনি শাসন করেন, সেই ইনফান্তিনোর ফুটবলের তলানিতে থাকা সদস্য দেশ বাংলাদেশে খেলাটির খোঁজ যে খুব রাখবেন, তা আশা করা ঠিক নয়। তবে খানিকটা খবর তিনি ঠিকই রেখেছেন। বিশেষ করে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারত হারতে হারতে ড্র করেছেÑ এই ফলাফল নিয়ে যে বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয়েছে উন্মাদনা, তা চোখ এড়ায়নি ইনফান্তিনোর। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মহিলা ফুটবলে বাংলাদেশের সাফল্যের খবরও তার কাছে অজানা নয়। তাই তো ১৭ কোটি মানুষের দেশে ফুটবলের অপার সম্ভাবনা দেখছেন ইনফান্তিনো।
গতকাল ভোরে ঢাকায় নামার পর সকালেই তিনি গণভবনে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে। সেখান থেকে একই গাড়িতে চড়ে বাফুফে ভবনের দিকে যাত্রা শুরু করেন ইনফান্তিনো এবং বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। যানজটে পড়ে নির্ধারিত সময়ের বেশ খানিকক্ষণ পর বাফুফে ভবনে পৌঁছান ফিফা বস। বাফুফের কর্তাদের সঙ্গে খানিকক্ষণ সময় কাটানোর পর তিনি ভবনের পাশে ফিফার অর্থায়নে স্থাপিত কৃত্রিম টার্ফ ঘুরে দেখেন এবং খুদে ফুটবলারদের সঙ্গে মিলিত হন। এরপর তিনি হোটেলে ফিরেই মুখোমুখি হন সংবাদ সম্মেলনে। যেখানে বাংলাদেশ নিয়ে তার অনুভ‚তিগুলো খুলে বলেন।
‘আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই এ কারণে যে আমি আসলে এতটা আশা করিনি। এখানে আসার আগে ভেবেছি আমি এমন একটি দেশে যাচ্ছি, যেখানে ফুটবল নিয়ে মানুষের তেমন উন্মাদনা নেই। কারণ অন্য একটি খেলা এদেশে খুব জনপ্রিয়। ভেবেছি সেই খেলাটিই এদেশের
সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু এখানে আসার পর আমার ভুল ভেঙে গেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে এদেশের মানুষ কেবল ফুটবল খেলে না, ফুটবলেই বসবাস করে। আর নতুন ফিফার নতুন গানই হলো ফুটবলের সঙ্গে মিশে যাওয়া। যে ইতিবাচক ধারণা এখানে এসে পেলাম, তা আমার ধারণাই বদলে দিয়েছে। ফুটবল নিয়ে এ দেশের ১৭০ মিলিয়ন মানুষ গর্ব করতে পারে, কারণ তারা বিশ্ব ফুটবলে ধীরে ধীরে ভালো একটা পর্যায়ে যাচ্ছে। দু’দিন আগে তারা ভারতের সঙ্গে জিততে জিততে ড্র করেছে। বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে ফুটবলে যেকোনো কিছু হতে পারে, যা সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।’
মহিলা ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে ইনফান্তিনো বলেন, ‘গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভালো ফলাফল রয়েছে পুরুষ ও মহিলা ফুটবলে। বিশেষ করে মেয়েরা অনেক ভালো করছে। আমি মনে করি মেয়েদের ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। কারণ এখানে অনেক সম্ভাবনা আছে। কারণ মেয়েদের ফুটবল এখনো ছেলেদের ফুটবলের মতো ততটা কঠিন হয়ে ওঠেনি। এখানে অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ব পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ আছে এবং আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশ সেই পর্যায়ে যাবে।’
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার ইঙ্গিত মিলেছে ইনফান্তিনোর কথায়, ‘আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে এ অঞ্চলের ফুটবল নিয়ে। আমরা চাই এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ফিফাকে আরও কাছাকাছি নিয়ে যেতে। তার জন্য বেশি বেশি খেলার সুযোগ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭০ মিলিয়ন। আজ চলে যাওয়ার সময় আমার একটি চোখ কাঁদবে এ কারণে যে, আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। আরেকটা চোখ হাসবে, কারণ আমি এখানে অনেক সম্ভাবনা দেখে গেলাম, যা এখানে কাজ করার ক্ষেত্রে আমাকে অনুপ্রেরণা জোগাবে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় ফিফাও আরও বেশি বিনিয়োগ করতে চায়। পাশাপাশি আমি বিশ্বাস করি সরকারও ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়াবে। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি তিনি নিজেও ফুটবলকে এগিয়ে নিতে চান। তিনিও চান আরও বিনিয়োগ করে বাচ্চাদের খেলার সুযোগ করে দিতে। এই অঞ্চলে নতুন নতুন আসর আয়োজন নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে এ দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা এবং ফুটবল আগ্রহে ভাটা পড়াবিষয়ক প্রশ্ন ছিল ইনফান্তিনোর কাছে। এই প্রশ্নকে যেন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাইলেন ফিফা সভাপতি, ‘আমি মনে করি না এদেশে ক্রিকেট ফুটবলের চেয়ে জনপ্রিয়। ফুটবল মানে বিশ্ব, ফুটবল হচ্ছে হৃদস্পন্দন। হয়তো এটা ঠিক ক্রিকেটে কিছু সফলতা এখন এসেছে এদেশে। যেখানে ২১১টি দেশ ফুটবল খেলে, সেখানে আমি ঠিক জানি না কটি দেশ ক্রিকেট খেলে। যখন অল্প কটি দেশের মধ্যে খেলা হবে, তখন আপনার শীর্ষে চলে যাওয়াটা সহজ। কিন্তু যখন ২১১টি দেশ ফুটবল খেলে তখন প্রতিদ্ব›িদ্বতাও থাকে অনেক। আমি মনে করি প্রতিদ্ব›িদ্বতা না থাকলে উন্নতি সম্ভব নয়। এদেশে হয়তো ফুটবলের প্রতিদ্ব›দ্বী ক্রিকেট। এটাকে ইতিবাচক হিসেবে নিতে হবে। ফুটবলের জনপ্রিয়তায় হয়তো খানিকটা ভাটা পড়েছিল অতীতে, কিন্তু সেটা এখন ফের ফিরে আসছে। আমি ফুটবল নিয়ে এখানে যে উন্মাদনা দেখেছি, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে ম্যাচের পর মানুষের যে উচ্ছ¡াস চোখে পড়েছে তাতে আমি নিশ্চিত ফুটবল ওপরের দিকে উঠবেই। তখন ক্রিকেটের কোনো সুযোগই থাকবে না।’
ইউরোপ থেকে চোখ সরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ফুটবল উন্নয়নে দৃষ্টি দেওয়ার কথা বলেছেন ইনফান্তিনো। নিজে দীর্ঘদিন উয়েফার গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করলেও স্বীকার করলেন ফিফা একটা সময় ইউরোপকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল, ‘এটা ঠিক যে বিশ্ব সংস্থা ফিফা কিছুটা হলেও বিশ্বের কিছু অঞ্চলে সেভাবে গুরুত্ব দিতে পারেনি। ফিফা খুব বেশি ইউরোপনির্ভর হয়ে পড়েছিল। ইউরোপকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। যার কোনো কারণ নেই। এখন আমি গোটা বিশ্বে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমরা ফুটবলের উন্নয়নের জন্যই কাজ করছি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্বকাপে দলসংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। ক্লাব বিশ্বকাপেও দল বাড়াতে প্রস্তাব দিয়েছি। সেটা হলে খেলার সুযোগ আরও বাড়বে।’
বাংলাদেশ অধিনায়ক জামাল ভুঁইয়া সম্পর্কে ধারণা রয়েছে ইনফান্তিনোর। উল্লেখ করলেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে লিস্টার সিটির হয়ে খেলা বাংলাদেশ বংশোদ্ভ‚ত ফুটবলার হামজা চৌধুরীর কথা। ফিফার প্রধান হয়ে কোনো দেশে সফরে গেলে খানিকটা তো জেনে যেতেই হয়। তবে বাংলাদেশে কয়েক ঘণ্টার এই সফর ইনফান্তিনোকে দিয়েছে অন্যরকম বার্তা। তাই তো সরাসরি কিছু না বললেও এদেশের বয়সভিত্তিক ফুটবল উন্নয়নে সহায়তা বাড়ানোর একটা ইঙ্গিত ঠিকই দিয়েছেন ফিফা সভাপতি। ‘গুড উইল’ সফরে এসে এটাইবা কম কিসের।