সিনেমা শিল্পে দুর্দিন চলছে। এই অবস্থায় চলচ্চিত্রের সুদিন ফেরাতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। এরই ধারাবাহিকতায় সিনেমা নির্মাণের ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রযোজক পরিচালকরা। এ লক্ষ্যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি তৈরি করেছেন নতুন নীতিমালা। প্রযোজক নেতারা জানিয়েছেন তাদের গৃহীত নতুন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে নির্মাণ ব্যয় কমবে ৪০ শতাংশ।
প্রযোজক নেতা খোরশেদ আলম খসরু জানিয়েছেন, চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, ক্যামেরাম্যান অ্যাসোসিয়েশন ও চলচ্চিত্র এডিটরস গিল্ড’র মোট দশজন সদস্য নিয়ে গঠন করা হয় ‘চলচ্চিত্র নির্মাণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি’। এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয় প্রযোজক নেতা কামাল কিবরিয়া লিপুকে এবং পরিচালক বদিউল আলম খোকনকে করা হয় মহাসচিব। এই কমিটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে।
নতুন নীতিমালা প্রণয়ন উপলক্ষে সোমবার দুপুরে এফডিসিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রযোজক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু, সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম, ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি পদে কামাল মো. কিবরিয়া লিপু, সহকারী সাধারণ সম্পাদক পদে আলিমুল্লাহ খোকন, কোষাধ্যক্ষ পদে মেহেদী হাসান সিদ্দিকী, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে ইলা জাহান। অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, মহাসচিব বদিউল আলম খোকন, উপ-মহাসচিব শাহীন সুমন, সাংগঠনিক সচিব কবিরুল ইসলাম রানা (অপূর্ব রানা) প্রমুখ। নতুন নীতিমালা পাঠ করে শোনান প্রযোজক কিবরিয়া লিপু।
বদিউল আলম খোকন বলেন, ‘সিনেমা নির্মাণে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ও ব্যয় কমাতে আমরা সংশ্লিষ্ট সকল সংগঠনের সহযোগিতায় নতুন নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। আশা করছি এর ফলে কমে যাবে প্রায় ৪০ শতাংশ নির্মাণ ব্যয়।’
যেসব নীতিমালা গ্রহণ করছে কমিটি, সেগুলো হলো-
শুটিং টাইম: প্রতিদিন সকাল ১০ টায় অবশ্যই ক্যামেরা ওপেন (শুটিং শুরু) করতে হবে, চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। এর মধ্যে যোহরের নামাজ ও দুপুরের খাবারের জন্য এক ঘণ্টা বিরতি থাকবে। কোনো শিল্পী কিংবা কুশলী যদি সময় মতো শুটিং সেটে না আসেন, তার জন্য যদি শুটিং শুরু না হয় এবং আর্থিক ক্ষতি হয় সেই দায়-দায়িত্ব দেরিতে আসা শিল্পী বা কুশলীকে বহন করতে হবে। শিল্পী আসার পরেও সময়মতো শুটিং শুরু করতে না পারলে তার দায় নিতে হবে পরিচালককে। সকাল ১০ টায় ক্যামেরা ওপেনের পর কোন শিল্পী কখন আসবে সে সময় নির্ধারণ করবেন পরিচালক।
শুটিং কল টাইম: শুটিংয়ে কল টাইম থাকবে সকাল ৮টায়। তবে শিল্পীদের প্রয়োজনে কল টাইম নির্ধারণ করে দিবেন পরিচালক।
চুক্তি স্বাক্ষর: শিল্পী ও কুশলীদের অবশ্যই প্রযোজকের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। চুক্তির সময় প্রথম কিস্তি ২৫ শতাংশ, পরবর্তী কাজের অগ্রগতির ভিত্তিতে বাকি ৭৫ শতাংশ পারিশ্রমিক পরিশোধ করা হবে। মোট তিন কিস্তিতে পারিশ্রমিক পরিশোধ করা যাবে। কোনোভাবেই এককালীন পারিশ্রমিক প্রদান গ্রহণযোগ্য হবে না।
কনভেন্স: এক লাখ টাকার উপরে যাদের পারিশ্রমিক তারা কোনো প্রকার কনভেন্স (যাতায়াত ভাতা) পাবেন না।
আউটডোরে শুটিং: যেসব কলাকুশলী দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করে পারিশ্রমিক পান, তারা আউটডোরেও সেই পরিমাণ পারিশ্রমিক পাবেন। আউটডোরে শুটিং চলাকালীন সহকারী পরিচালক ও সহকারী চিত্রগ্রাহকরা কনভেন্সের অর্ধেক হাত খরচ পাবেন।
কস্টিউম/ড্রেস (পোশাক): ড্রেসের জন্য কোনো শিল্পীকে আলাদা কোনো টাকা প্রদান করা হবে না। গল্পের প্রয়োজনে শিল্পীদের ড্রেস প্রোডাকশন থেকে তৈরি হবে, শুটিং শেষে সকল ড্রেস শিল্পীকে প্রোডাকশনের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। কোনো ড্রেস কোনো শিল্পীর পছন্দ হলে সেটা ক্রয়মূল্য দিয়ে শিল্পী শুটিং শেষে নিতে পারবেন।
চলচ্চিত্রের প্রমোশন: চলচ্চিত্র মুক্তির আগে প্রমোশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ (প্রধান) শিল্পীদের কমপক্ষে ৫ দিন শিডিউল দিতে হবে।
শিল্পীদের সহকারী: নায়ক, নায়িকা, ভিলেন (প্রধান চরিত্র) যারা কাজ করেন তারা একজন করে সহকারী সঙ্গে নিতে পারবেন। যেটির ব্যয় প্রোডাকশন বহন করবে। অতিরিক্ত কেউ থাকলে তাদের ব্যয়ভার প্রোডাকশন বহন করবে না।
চলচ্চিত্র নির্মাণের নতুন নীতিমালা আগামী ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম।
চলচ্চিত্র নির্মাণের এই নতুন নীতিমালা পর্যবেক্ষণ করার জন্য গঠন করা হয়েছে ১১ সদস্যের মনিটরিং কমিটি। আহ্বায়ক হিসেবে থাকছেন শামসুল আলম, এবং সদস্য সচিব বদিউল আলম খোকন। অন্যান্য সদস্যরা হলেন জায়েদ খান, আবদুল লতিফ বাচ্চু, আবু মুসা দেবু, সোহানুর রহমান সোহান, এমডি ইকবাল, আলিম উল্লাহ্, আসাদুজ্জামান মজনু, কবিরুল ইসলাম রানা, সুব্রত।
এদিকে প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতি শিগগিরই প্রদর্শক সমিতি (সিনেমা হল মালিক)র সঙ্গেও বসবে। তৈরি করা হবে আলাদা নীতিমালা। যাতে করে সিনেমা হলের দুর্নীতি, মেশিন ভাড়া সবকিছুই দূর হবে।
উল্লেখ্য, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতি এবং পরিচালক সমিতির নির্বাচিত কমিটির সদস্যরা চলচ্চিত্রের সমস্যা নিয়ে ২৪ আগস্ট এক যৌথ সভায় বসেন। সেখানেই নতুন নীতিমালা প্রণয়নের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই মাসের ২৮ তারিখ চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে এবং সমাধানের জন্য নীতিমালা তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত সকল সংগঠনের নেতারা গত ৬ অক্টোবর প্রযোজক সমিতির অফিসে বসে চূড়ান্ত সভা করেন।