বহুল আলোচিত মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় থাকা আসামিরা নিস্তব্ধ হয়ে রায় শোনেন। পরে প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ অন্য আসামিরা হাউমাউ করে কেঁদে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।
বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১১টায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ এই রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল।
রায় ঘোষণার সংবাদ শুনে কোর্ট চত্বরে আসামির স্বজনরা আহাজারি শুরু করেন। আদালত প্রাঙ্গণে হত্যা মামলার আসামি হাফেজ আবদুল কাদেরের বাবা আবুল কাশেম খান, জাবেদ হোসেনের ভাই জাহেদ হোসেন, নুর উদ্দিনের মা রাহেলা বেগম, আবদুর রহিম শরীফের মা নুর নাহার ও ইফতেখার উদ্দিন রানার বাবা জামাল উদ্দিন প্রকাশ্যে এ রায়ের বিরোধিতা করেন।
তারা নুসরাত হত্যা মামলাটি মিথ্যা ও তাদের সন্তানদের বিনা দোষে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। এ সময় স্বজনরা উচ্চ স্বরে কাঁদতে থাকেন।
এদিকে রায় ঘোষণার পর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী ও নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, বাবা একেএম মূসা মানিক ও ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান।
তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার মামলার বিচারে তিন যুগেরও বেশি সময় লেগেছিল সেখানে নুসরাত খুব ভাগ্যবতী। মাত্র ৬১ কর্মদিবসে ও ঘটনার ৬ মাসের মধ্যে তার মামলা বিচার সম্পন্ন হয়। মামলার রায়সহ কাগজপত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে পাঠানো হবে বলেও জানান মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহজাহান সাজু।
অন্যদিকে রায়ে সন্তুষ্ট নয় জানিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা।
নুসরাত হত্যা মামলার আসামি মো. শামিমের আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম জানান, হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১২ আসামি জবানবন্দি দিলেও আদালত ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। তাছাড়া রাষ্ট্রপক্ষ আসামিরা এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি তার মক্কেল মো. শামীমের পক্ষে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানান।
এর আগে সকাল ৯টা থেকে আদালত প্রাঙ্গণে আসামি পক্ষের স্বজন, গণমাধ্যমকর্মী ও শত শত উৎসুক জনতা ভিড় করেন। র্যাব ও পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে ১০টা ৫০ মিনিটে আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। বেলা ১১টায় বিচারক মো. মামুনুর রশিদ এজলাসে উপস্থিত হয়ে মামলার রায় পড়া শুরু করেন। টানা পনেরো মিনিট ধরে ৩ পৃষ্ঠার রায়ের মূল অংশ পাঠ করে এজলাস ত্যাগ করেন।
এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সোমবার বিকেলে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ও বাদী পক্ষের খণ্ডন শেষে ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রায়ের দিন-তারিখ ঘোষণা করেন।
ফেনী জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট হাফেজ আহমেদ জানান, গত ৩০ মে বৃহস্পতিবার ফেনীর আমলি আদালতের বিচারক জাকির হোসাইন নুসরাত হত্যা মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের পর ৪৮ কর্মদিবস পর্যন্ত এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা অনুষ্ঠিত হয়। ৬১ কর্মদিবসের দিন আলোচিত এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন আদালত। গত ২৭ জুন মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এ মামলার ৯২ আসামির মধ্যে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার, বাবা একেএম মূসা ও ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানসহ ৮৭ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। বাকি চার জনের পক্ষে নথিপত্র আদালতের পেশ করা হলে আদালত তা সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করেন।
নুসরাত হত্যা মামলায় জড়িত থাকার সন্দেহে পুলিশ ও পিবিআই অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ২১জনকে বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করে। পরে ২৯ মে ১৬ জনকে আসামি করে ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় নূর হোসেন, আলা উদ্দিন, কেফায়েত উল্যাহ জনি, সাইদুল ও আরিফুল ইসলামের নাম অভিযোগপত্রে রাখেননি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৬ এপ্রিল ওই মাদ্রাসা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যান নুসরাত জাহান রাফি।
এর আগে বিভিন্ন সময় আদালতে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।