পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। জমি বিক্রি করে টাকা দিলেও প্রার্থীকে নিয়োগ না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপাচার্য এম রোস্তম আলীর বিরুদ্ধে।
এ ঘটনার অডিও সূত্রে জানা যায়, নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলে ভুক্তভোগী প্রার্থী নিজের নাম না দেখে ফোনে কারণ জানতে চাইলে ঘটনা অস্বীকার করে তাকে হুমকি দেন উপাচার্য।
বৃহস্পতিবার বিকেলে উপাচার্যে সঙ্গে নিয়োগ প্রার্থীর কথোপকথনের অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর প্রথমে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল এবং পরে মৌখিক পরীক্ষায় কোনো প্রার্থীই উত্তীর্ণ হয়নি বলে জানান উপাচার্য। ঘুষ গ্রহণের কথা অস্বীকার করে বিষয়টি ষড়যন্ত্র বলেও দাবি করেন উপাচার্য এম রোস্তম আলী।
পাবিপ্রবি সূত্র জানায়, ইতিহাস বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে আহ্বান করা বিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ২৮ প্রার্থী অংশ নেন।
লিখিত পরীক্ষা শেষে ছয়জনকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করে তালিকা প্রকাশ হয়। তারা সবাই রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ নিয়োগ প্রার্থী মনিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, পাবিপ্রবির ইতিহাস বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আবেদন করেন তিনি। চলতি বছরের জুন মাসে কর্তৃপক্ষ নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করলে পরিচিত এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তার। সে সময় দু’দফা সাক্ষাতের পর উপাচার্য শিক্ষক হিসেবে মনিরুলকে নিয়োগ দিতে ১২ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। নিয়োগ পরীক্ষার আগেই জমি বিক্রি করে উপাচার্যকে ঢাকার ফার্মগেটে পাবিপ্রবির রেস্ট হাউসে গিয়ে দু’দফায় প্রথমে পাঁচ ও পরে তিন মিলে আট লাখ টাকা দেন। নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আগের দিনও মুঠোফোনে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে বলেন উপাচার্য।
মনিরুল অভিযোগ করেন, বৃহস্পতিবার নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়েই পূর্বনির্ধারিত কয়েকজন প্রার্থীর পরীক্ষায় বিশেষ সুবিধা প্রাপ্তি ও গতিবিধি দেখে সন্দেহ হয়। পরে ফলাফল তালিকায়ও তাদের নাম প্রকাশ করা হয়। এ সময় উপাচার্যকে ফোন দিয়ে আমাকে নিয়োগ না দেওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে স্যার হুমকি দেন।
নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক আইরিন আক্তার অভিযোগ করেন, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ১০ প্রার্থী নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ উত্তীর্ণ হতে পারিনি। যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন তারা প্রত্যেকেই রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের। নিয়োগ বোর্ডে থাকা শিক্ষকরা সবাই রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এমনকি লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ঘোষিত শরিফুল ইসলাম পাবিপ্রবির উপ-উপাচার্য আনোয়ারুল ইসলাম স্যারের আপন ভাগনে জামাই হলেও তিনি নীতিমালা ও নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে নিয়োগ বোর্ডে থেকে তাকে পাস করান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরীক্ষায় অংশ নেয়া একাধিক প্রার্থী অভিযোগ করেন, পাবিপ্রবির উপাচার্য রোস্তম আলী, উপ-উপাচার্য আনোয়ারুল ইসলাম, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ও ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম নির্দিষ্ট প্রার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে চুক্তি করেন। সে অনুযায়ী চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজেদের ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়ে নিয়োগ পরীক্ষার বোর্ড সাজিয়ে পূর্বনির্ধারিত প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দেখান।
এ বিষয়ে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য এবং কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. হাবিবুল্লাহ বলেন, নিয়োগ বোর্ড নীতিমালা মেনেই সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। লিখিত পরীক্ষায় ফলাফলে ছয়জনকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হলেও মৌখিক পরীক্ষায় বোর্ড সন্তুষ্ট না হওয়ায় কাউকে চূড়ান্ত উত্তীর্ণ ঘোষণা করেনি।
অভিযোগের বিষয়ে পাবিপ্রবি উপ-উপাচার্য ড. আনোয়ারুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে ঘুষ গ্রহণ ও নিয়োগ পরীক্ষায় অস্বচ্ছতার সব অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে পাবিপ্রবি উপাচার্য ড. রোস্তম আলী বলেন, নিয়োগ পরীক্ষায় ফেল করে কতিপয় প্রার্থী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। অভিযোগকারী মনিরুলের সঙ্গে নিয়োগ পরীক্ষার আগে একাধিকবার ফোনে কথোপকথন ও সাক্ষাতের বিষয়টি স্বীকার করলেও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেন।