মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে লড়াইয়ে জিততে চলেছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখেও মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি অর্জনে ইরানের তৎপরতা থেমে নেই।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে ভয়াবহ ক্রুজ মিসাইল হামলা আরব রাষ্ট্রটির অন্তরে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে রীতিমতো।

এখন পর্যন্ত এই হামলার পেছনে দায়ী করা হচ্ছে ইরানকেই। হুথিদের নাম সামনে আসলেও ইরানের সহায়তায় ইয়ামেনি শিয়া বিদ্রোহী গ্রুপটি এই হামলা চালায়। যদিও ইরান এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে যাচ্ছে বলে ফরেইন পলিসির এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে এই ধরনের হামলাগুলো বড় লক্ষ্য হতে পারে, অঞ্চলটি থেকে মার্কিন সামরিক আধিপত্য হটানো। চীন, রাশিয়া সহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির পাশাপাশি ইরানও এমন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বলতে গেলে।

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এই মুহূর্তে ইরানের তৎপরতা ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশ নীতিকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।

তবে বিদেশের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের অতীতের হস্তক্ষেপ এবং যুদ্ধসহ আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে নিজেকে জড়িয়ে ফেলার ঘটনায় এটি তার জন্য শিক্ষা হতে পারে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে যাওয়ার আগেই সেখান থেকে ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তি গুটিয়ে ফেলাই উপযুক্ত সিদ্ধান্ত হবে। সেই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।

মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের শক্তি অর্জনের পেছনে আছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের অভিজাত বাহিনী কুদস ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সুলেইমানি।

ইরানের রহস্যময় এবং অন্যতম প্রভাবশালী এই সামরিক কর্মকর্তা মার্কিন-ইসরাইল শক্তির অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। তাকে হত্যা করার একাধিকবার গোপন চেষ্টা চালানো হয়, যদিও সবগুলোই ব্যর্থ হয়।

২০ বছরেরও আগে একটি দুর্লভ সাক্ষাৎকারে তিনি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি পরিবর্তনের রূপরেখা দিয়েছিলেন, যার ভিত্তিতে ২০০৬ সালে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ সংগঠিত হয়।

ইরানকে ঘিরে কয়েক হাজার মার্কিন এবং পশ্চিমা সেনা সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের প্রধানতম দেশগুলো, ইসরায়েল এবং আরব শক্তির কড়া অবস্থানের কারণে সুলেইমানির দায়িত্ব হয়ে পড়েছিল ইরানের শক্তিমত্তাকে প্রকাশ করা। যেহেতু তিনি দেশটির আঞ্চলিক নীতি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রয়েছেন।     

তার মতে, ইরানকে ঘিরে পশ্চিমা শক্তির এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ এবং ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান ছিল ইরান ও সিরিয়ার জন্য হুমকি। এই অভিযানের ফলে সিরিয়া এবং হিজবুল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল ইরান। দুই লাখ সেনা, কয়েকশ যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার এবং হাজার হাজার সাঁজোয়া যান ইরানের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।  ইসরায়েলকে ভূ-রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।  

২০০৬ সালে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহর মধ্যে ৩৩ দিনের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের পরিকল্পনার জন্য সুলেমানিকেই ইঙ্গিত করে থাকে।

তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস সেই যুদ্ধকে  ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম-যন্ত্রণা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ঠিক এক দশক পর দেখা যাচ্ছে, এর মধ্যে আরও বেশি কিছু ঘটে গিয়েছে।

লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্ত অবস্থান, ইরাক সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ, ইয়েমেনে হুথিদের দিয়ে সৌদি জোটের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ, হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে হামলা, সৌদি তেলক্ষেত্রে হামলা-সব দিক দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে বড় শক্তি অর্জনে ইরানের তৎপরতা স্পষ্ট।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ভূ-রাজনীতিতে ইরানের এই মুহূর্তের অবস্থান বলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে জিততে চলেছে ইরান।