বন্ধুরা বদলান গ্রাম

রংপুরের বদরগঞ্জের তিন ইউনিয়ন ও দিনাজপুরের পার্বতীপুরের অনেক গ্রাম বদলের সংগ্রামে নেমেছে ‘বন্ধু সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’। লিখেছেন ও ছবি তুলেছেন সোহেল সানী

তারা মোট ৫১ জন, তরুণ-তরুণীর দল। শুরুতে ছিলেন ২০ জন। গত বছরের ২০ আগস্ট সরকারি নিবন্ধন লাভ করে ‘বন্ধু সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’। কাজ করেন তারা রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে– গোপীনাথপুর, রাধানগর ও রামনাথপুর। পরে ছড়িয়েছেন পাশের জেলা ও বন্ধুদের থাকার জায়গা বলে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে। তাদের প্রাণের প্রতিষ্ঠানটি অন্যদের চেয়ে আলাদা– ধূমপান করেন এমন কোনো মানুষ সদস্য হতে পারেন না। ভালো কর্মী, কিন্তু ধূমপানে আসক্ত এক কী দুজন বন্ধুর অনুরোধে সদস্য হয়েছেন। পরে তাকে বুঝিয়ে, জোর করে ধূমপান থেকে ফিরিয়েছেন। গর্বের সঙ্গে তারা বলেন, একজনও নেই আমাদের সিগারেট, তামাকে। ফলে ক্যানসারসহ নানা রোগের কারণ হই না মোরা। মাদকের হাত থেকে মুক্ত তাদের দল। আরেকটি লক্ষ্য তাদের– কোনোদিন কেউ চাকরি করবেন না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান–বসুন্ধরা, গাজী, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, লুবজোন লুব্রিকেন্টসহ আরও দুটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তেমন সদস্যরা চাকরি ছেড়ে এক সময় হবেন অনুকরণীয় সামাজিক উদ্যোক্তা। তারা মেলা আয়োজন, পণ্য বিক্রি, ব্যবস্থাপনা থেকে শেখা শিক্ষাগুলো অন্যদের শেখাচ্ছেন। নিজেরা তেমন আয় করতে পারলে এখানেই চলে আসবেন। ফলে আরেকটি লক্ষ্য দাঁড়িয়েছে, চাকরির দরখাস্ত কোনোদিন আমরা কেউ করব না। বেশিরভাগ তাদের ছাত্র, ছাত্রী।

একটি স্কুলকে কলেজে রূপ দিয়ে সেখানে তারা কর্ম করে খাবেন বলে প্রাথমিকভাবে কাজ করছেন। বিদ্যালয়টির নাম ‘নিডস স্কুল’ (প্রয়োজনগুলো বিদ্যালয়)। বদরগঞ্জের রাধানগর ও গোপীনাথপুর দুই ইউনিয়নের মাঝে; বিখ্যাত লালদিঘী বাজারের ৩শ গজ উত্তরে, গোসমোটা ঈদগাহ মাঠের পাশে আছে। প্রতিটি সদস্য অনেক কষ্টে, লেখাপড়ার খরচ বাঁচিয়ে ৩শ থেকে সাড়ে তিনশ টাকা করে চাঁদা দিয়ে গড়েছেন। মোট খরচ হয়েছে সাত লাখ, পুরোটা তাদেরই দেওয়া। বিদ্যালয়ের ঠিকানা–নিডস স্কুল, লালদিঘী; তারাগঞ্জ রোড, লালদিঘী বাজার, বদরগঞ্জ, রংপুর। ২০১৮ সালে তৈরি বিদ্যালয় ও তাদের যেকোনো সাহায্য করতে ফোন করতে পারেন–০১৭১৭৫৫৫৯৬৭।

সৃজনশীল লেখাপড়ার মাধ্যমে এখনই বিদ্যালয় পুরো বদরগঞ্জে লেখাপড়ার মানকে আরও ভালো করেছে। ১৫৬ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ২০ জনকে মেধার বিচারে তারা সরকারের উপবৃত্তির টাকা দিচ্ছেন। তাতে অন্যরাও ভালো ফল করতে উৎসাহী হচ্ছে। ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ক্লাস চলে। উপজেলার গ্রামগুলোর অনার্স, মাস্টার্স কী বিএ, বিএসসি, বিকম পাস সমিতির সদস্য ছেলে, মেয়ে; তারা সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; এমন ১৮ জন শিক্ষকতা করছেন। বাইরের শিক্ষকের মাধ্যমে নয়, নিজেরাই ছাত্র পড়িয়ে লেখাপড়ার মতো প্রধান অস্ত্র হাতে নিয়ে সমাজ বদলের চেষ্টা করছেন। তারা কোনো টাকা নেন না, উল্টো স্বেচ্ছাসেবা দেন। স্কুলটিকে তারা কলেজে রূপ দেবেন। সেজন্যই কাজ করছেন মনেপ্রাণে। সংগঠনের হিসাবরক্ষক ও নিডসের সহকারী প্রধান শিক্ষক হাবিবুল ইসলাম বললেন, ‘আগামী দিনের আদর্শ সংগঠন হবে আমাদেরটি, সেজন্য এখানে অন্য কাজগুলোর মতো নিজেরাই বিনা বেতনে পড়িয়ে যাচ্ছি।’ প্রধান শিক্ষক শাহজাহান প্রামাণিক ‘বন্ধু সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমিতি লিমিটেড’র প্রধান–‘সভাপতি’। তিনি বললেন, ‘সমিতি যেমন সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে চালাই, তেমনি বিদ্যালয়কেও সেভাবে পরিচালনা করে উন্নত, ভালোমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করে তুলব।’ ছাত্রছাত্রীরা প্লে বা প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া কর।

ভালো স্কুল হিসেবে তারা নাম কুড়িয়েছেন। ২০২০ সালে অষ্টম শ্রেণি চালু হবে। ছাত্র, ছাত্রীরা জেএসসি (জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট এক্সামিনেশন) দিতে পারবে বলে আশা প্রধান শিক্ষকের। তিনিই তাদের শরীরচর্চা, জাতীয় সংগীতের ক্লাস নেন। পরে গানের আলাদা ক্লাস করান। প্রতিদিন পরিষ্কার, ভালো পোশাক পরে যেকোনো ভালো শিক্ষকের মতো বিদ্যালয়ে আসেন। সব ছাত্র, ছাত্রীকে এত কষ্টেও পোশাক দিয়েছেন। তাদের স্কুল ঘর আছে, সামনে বড় উঠান। নিয়মের প্রতি নিষ্ঠ সবাই। নারী শিক্ষকরা বন্ধু গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেডের পোশাক পরে ক্লাস নেন। ফলে সমাজের মতো শ্রণিকক্ষেও তারা আলাদা সম্মান পান।

তাদের বিদ্যালয়ের জন্য জমিটুকু দিয়েছেন জয়নব বানু। চার সন্তানের মা মানুষটি একেবারেই সাধারণ। তবে লেখাপড়ায় ভীষণ টান। বড় সন্তান বাংলায় মাস্টার্স; সরকারি চাকরি করেন পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে। পরের ছেলে এই শাহজাহান। চমকে গেলেন? তিনিও মাস্টার্স পাস। তৃতীয় সন্তান ঢাকার গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (জিইউবি)-এ ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (‌ইইই)-এ ফাইনাল ইয়ারে পড়েন। মেয়েটিকে এইচএসসির বেশি পড়াতে পারেননি। গ্রামের এই মা আদর্শ বিদ্যানুরাগী। লেখাপড়া ও নিয়মের প্রতি তার ভালোবাসা এত প্রবল যে ছেলেকেও বলেছেন, ‘যতদিন স্কুলের কাজে আমার ভবন ও জমি ব্যবহার করবে, কোনো ভাড়া বা খরচ লাগবে না। বিনা পয়সায় থাকবে, উল্টো সব ধরনের সাহায্য করব।’

তাদের বিদ্যালয়ের বিশেষত্ব–সিলেবাসের বাইরে নিয়মিত বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। প্রধান শিক্ষক গর্ব করে বললেন, ‘আমাদের ভালো ফলাফলের আরেকটি কারণ–পড়া দিয়ে ক্লাসেই পড়া বুঝে নেওয়া হয়। যারা উপস্থিত ভালো করতে পারে না, তাদের স্কুল শেষে বিকেলের আগ পর্যন্ত পড়িয়ে আমরা ভালো শিক্ষার্থী করে তুলি। এই নিয়মিত চর্চাটির মাধ্যমে ছাত্র, ছাত্রীদের মেধা, যোগ্যতা, পড়ালেখার প্রতি ভালোবাসা বেড়েছে।’ তাদের একজন চতুর্থ শ্রণির ছাত্রী জান্নাতুন নাঈম। বলল, ‘শিক্ষকরা আমাদের গুরুত্ব দিয়ে পড়ান। সব বিষয়ই সবাইকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বোঝান। প্রয়োজনে বারবার পড়া বোঝান।’ নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পাঠ দেন বলেও জানাল সে। বিদ্যালয়ের পরিবেশ খুব ভালো লাগে তার। স্কুলে চারুকলার বিষয়গুলোকেও বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। নৈতিক শিক্ষা ইংরেজি, বাংলাসহ সব বিষয়ের মতো শিখতে হয়। তবে নিডস স্কুলের সভাপতি কামরুজ্জামান দুঃখ করলেন, ‘এখনো দরজা-জানালা তৈরি করতে পারিনি। টাকাই তো জোগাড় হয়নি। তারপরও বিনা বেতনে পড়িয়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছি। ছাত্র, ছাত্রীরা গরিবের সন্তান, অপুষ্টির শিকার। ওদের জন্য ভাবনা হয়।’

‘বন্ধু সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর আরেক সাফল্য– বদরগঞ্জের রাধানগর ইউনিয়নের পাঠানহাট থেকে ঝড়ুয়াহাট পর্যন্ত সাত কিলোমিটার বিরাট সড়কের দুপাশে ৩০ জুন থেকে ২৫ জুলাই মোট ২৬ দিন খেটে সাড়ে সাত হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন তারা। সেগুলো এলাকার মানুষদের সাহায্যে নিয়মিত যত্ন করেন। গাছগুলো বেশ বড় হয়েছে। নিচে নানা ধরনের ঘাস রোপণ করেছেন ভূমিক্ষয় রোধে। পাকা পথের দুধারেই যে পানি। তাদের এ কাজে সব ধরনের সাহায্য করেছেন স্থানীয় বন বিভাগের শাখা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপর আরও উদ্দীপ্ত হয়ে তারা ৭ জুলাই থেকে ১০ সেপ্টেম্বর–৬৩ দিন খেটে টানা দফায় দফায়, দলে ভাগ হয়ে আরেক ইউনিয়ন গোপীনাথপুরের সড়কগুলোর দুপাশে বন বিভাগের সাহায্য পেয়ে ১৭ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন। প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক তাজুল ইসলাম গর্ব করলেন, ‘মোট ২৫ কিলোমিটার জুড়ে আছে আমাদের ফল, ওষুধের ও নানা ধরনের প্রয়োজনের গাছ আছে। বনের গাছও আছে।’ গাছগুলো দেখভাল ও যত্নের জন্য বন বিভাগের দুই হাজার টাকা করে বেতনের ১৪ জন কর্মী আছে তাদের। গ্রামের এই মানুষদের গাছের যত্ন নেওয়ার প্রশিক্ষণ দেন তারা বন কর্মকর্তাদের সাহায্যে, নিজেরাও শেখেন। গাছগুলো এলাকা ও তাদের সম্পদ।

আছে তাদের ‘আইনি সহায়তা’। গ্রামের দিনমজুর, গরিব নারীরা নানা ধরনের অন্যায়ের শিকার হলে সংগঠনের সদস্য ও আইনজীবী আশরাফুল ইসলাম বিনা খরচে সব ধরনের আইনি সহায়তা দেন। মেয়েদের সচেতন ও সাহায্য করতে শুরু থেকে এই পর্যন্ত তারা মোট পাঁচটি বাল্যবিয়ে ঠেকিয়েছেন। তাদের গড় বয়স ছিল ১৫ কী ১৬। গরিব এই উপজেলাগুলোর নারীদের জন্য তারা বিসিকের (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) শাখা অফিস থেকে নানা ধরনের হাতের কাজের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। গেল বছরের ২০ নভেম্বর লালদিঘীতে স্কুলের ঘরে গরিব নারীদের বিনা খরচে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। গ্রামের সেই নারীরা পুঁতির মালা, আঙ্গুর, আপেল, আনারস ইত্যাদি খুব ভালো বানাতে পারেন। তারাই রংপুর থেকে উপকরণ কিনে দেন। বিভিন্ন হাটে সেগুলো বিক্রি করেন। সেই টাকায় জনপ্রতি ১৫শ টাকা মজুরি দেন। তবে কাঁচামাল কেনার পয়সা জোগাড় ও বিক্রি ভালো না হওয়ায় প্রকল্পটি এখন বন্ধ। তারা আবার শুরু করতে সাহায্য চান। এভাবে ধীরে ধীরে আরও সাহায্য পেয়ে, অন্যদের সাহায্যে অন্য কাজগুলোও শুরু করবেন। সেগুলো হলো– তাদের গ্রামগুলোতে কোনো গরিব ভিক্ষুক রাখবেন না, সবার কাজের ব্যবস্থা করবেন। গ্রামের কোনো মেয়েকে যেন ১৮ বছরের নিচে বিয়ে না দেওয়া হয়, তাই সচেতনতা গড়ে তুলছেন। কোনো বিয়েতেই কনে পক্ষকে যেন যৌতুক দিতে না হয় সেজন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ছেন। নারী নির্যাতন ঠেকাচ্ছেন। প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত মানুষদের সুন্দর ও পরিশীলিত সমাজ তারা গড়ে দেবেন। বয়স্কদের লেখাপড়া শিখিয়ে অশিক্ষা দূর করবেন। কোনোভাবেই যেন কোনো সড়কে মানুষ–বিশেষত নারী, শিশু ও বয়স্করা বিপদে না পড়েন সে জন্যও কাজ শুরু করেছেন।

তাদের সব কাজের সঙ্গী উপজেলার ক্রীড়া সংগঠক হাসান তবিকুর চৌধুরী বললেন, ‘সমিতির কাজে যতটা পারি সাহায্য করি।’ উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা শামছুন্নাহার বেগম এভাবে বললেন, ‘তারা খুব ভালো কাজ করছেন। কাজ দেখে বনায়ন প্রকল্পে আমরা সাহায্য করেছি। প্রকল্পটি তাদের সমস্যা অনেকটাই মেটাবে। আমরা আরও পারলে করব।’