কয়েকজন শিশু শিক্ষার্থী বেশ হেলেদুলে শনিবার দুপুরে ঝুলন্ত সেতুটি পার হলো। সেতুটি যে ঝুঁকিপূর্ণ সেটি অনুধাবনের বা বোঝার জ্ঞান তাদের নেই।
খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার তপ্ত মাস্টার পাড়াস্থ ধলিয়া খালের ওপর এলাকাবাসীর উদ্যোগে নির্মিত হয় এই ঝুলন্ত সেতু। তপ্ত মাস্টার পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ ১৫ গ্রামের মানুষকে প্রতিদিন এই সেতু দিয়েই যাতায়াত করতে হয়।
প্রায় চার মাস আগে এই সেতু নির্মাণে নেওয়া হয়নি কোনো বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীর পরামর্শ।
প্রতিদিন শত শত মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে এই সেতু। সেতুটি বর্তমানে খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কের ধারে মাটিরাঙ্গা উপজেলার তপ্ত মাস্টার পাড়ায় ধালিয়া খালের ওপর ২০০১ সালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করে দিয়েছিল।
গত বছর ১২ জুন প্রবল স্রোতে সেটি ভেঙে যায়। এরপর থেকে মাটিরাঙ্গা ইউনিয়নের দুইটি ওয়ার্ডের ১৫টির অধিক গ্রামের মানুষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
প্রথমে গাছের ভেলা দিয়ে খালটি পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। নিরূপায় হয়ে এলাকাবাসীর উদ্যোগে একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করা হয়। ঝুলন্ত সেতু নির্মাণে কোনো উপযুক্ত উপাদান ব্যবহার করা হয়নি। এমনকি কোনো প্রকৌশলীর পরামর্শও নেওয়া হয়নি।
সাধারণত ঝুলন্ত সেতু নির্মাণে বিশেষভাবে তৈরি অ্যালুমেনিয়ামের তারের রশি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই সেতুতে সেটির পরিবর্তে ১২ মিলিমিটার ব্যাসের লোহার রড় ব্যবহার করা হয়েছে। আর সেতুর দুই পাশে চারটি পাকা পিলারের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে চারটি লম্বা গাছ। এর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল। সেতুটি একদিকে সামান্য হেলে পড়েছে। সেটি যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
তপ্ত মাস্টার পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম জানান, খুবই ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন ঝুলন্ত সেতুটি পার হতে হয়। সেতুর উপর উঠলে সেটি নড়ে উঠে। এ কারণে বর্ষাকালে বেশি বৃষ্টি হলে অনেক ছাত্রছাত্রী স্কুলে আসে না।
স্কুলটির পাকা দ্বিতল ভবন নির্মাণের জন্য সরকারি অনুমোদন এসেছে। কিন্তু সেতুটি নির্মাণ না হলে দ্বিতল ভবনের কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাটিরাঙ্গার দলদলী মৌজা প্রধান দ্বীন মোহন ত্রিপুরা জানান, সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর এই এলাকার মানুষ তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে পারছিল না। খালটি পারাপারে জনগণের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। তাই এলাকার মানুষের সহযোগিতায় অস্থায়ীভাবে ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুটি খালের পানির স্তর থেকে অন্তত ২০ ফুট উপরে নির্মাণ করা হয়েছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই সেতুতে বাড়ছে ঝুঁকি। তবুও এই সেতুর ওপর আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে। কারণ শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে ও এলাকাবাসীদের বাজারে যাওয়ার বিকল্প কোনো রাস্তা নেই।
মাটিরাঙ্গা ইউনিয়ন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অমৃত কুমার ত্রিপুরা বলেন, সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর আমরা উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। সেতুটি পুনঃনির্মাণের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে আবেদন করেছি।
এই সেতুর কারণে এলাকার উন্নয়ন কাজ বন্ধ রয়েছে। এরমধ্যে রাস্তার ব্রিক সলিং এর কাজ, দুইটি বক্স কালভার্ট নির্মাণ, বৈদ্যুতিক লাইন সম্প্রসারণের কাজ বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী জানান, সেতুটি পুনঃনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা আমাদের জানা আছে। ইতোমধ্যে সেটি অগ্রাধিকার প্রাপ্ত প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর্থিক বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সেটি পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।