নায়িকার উত্থান: শারমীন আক্তার নিপা থেকে মাহিয়া মাহি

রাজশাহীর মেয়ে মাহিয়া মাহি। জন্ম ২৭ অক্টোবর। মাহির আসল নাম শারমীন আক্তার নিপা। সিনেমায় নাম লেখানোর পর মাহিয়া মাহি নাম ধারণ করেন। বাবা মায়ের আদরের মেয়ে মাহি’র স্কুল কলেজের দিনগুলো কেটেছে ঢাকায়। কলেজে পড়াকালীন পা বাড়ান মডেলিংয়ের দিকে। মডেলিং নিয়েই যখন ধ্যানজ্ঞান ঠিক সেই সময়েই পেয়ে যান সিনেমায় কাজ করার প্রস্তাব। সিনেমায় প্রস্তাব পাওয়ার ঘটনা নিয়েও রয়েছে মাহির মজার অভিজ্ঞতা। জাজ মাল্টিমিডিয়া কেবল তাদের কাজ শুরু করেছে। সেই সময়ে জাজের কাছ থেকে কাজের প্রস্তাব পান মাহিয়া মাহি। মাহি ভেবেছিলেন জাজ হয়তো কোনো একটা ইভেন্ট কোম্পানি। কিন্তু ভুল ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। তারপর তো রীতিমতো নায়িকার প্রস্তাব পেয়ে সুযোগটা আর হাত ছাড়া করেননি তিনি।

২০১২ সালে মাহি ও বাপ্পি চৌধুরীকে নায়ক-নায়িকা করে সিনেমা বানানো শুরু করে জাজ মাল্টিমিডিয়া। এই দুজনকে দীর্ঘদিন গ্রুমিংও করান তারা। শাহীন-সুমন পরিচালিত ‘ভালোবাসার রঙ’ ছবি দিয়ে মাহির যাত্রা শুরু। ছবি মুক্তির আগেই জাজের মার্কেটিং পলিসির কারণে আলোচনায় চলে আসেন মাহি। শুধু তাই নয়, হলে হলে জাজের ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবসাও ভালোবাসার রঙ ছবির মাধ্যমেই শুরু করে। এই মহা কর্মযজ্ঞের প্রথম ছবি হিসেবে বাড়তি সুবিধায় পায় মাহির ভালোবাসার রঙ। এই ছবির সফলতার পরেই চলচ্চিত্র জগতে একটা রমরমা অবস্থা শুরু হয়ে যায়। সেই রমরমা অবস্থার প্রথম নায়িকা মাহিয়া মাহি।

২০১০ সালের পরের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর প্রথম জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে মাহির যাত্রা শুরু করা তাকে রাতারাতি তারকা খ্যাতি এনে দেয়। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মাহি পরিণত হন রীতিমতো হার্টথ্রুব নায়িকায়। ২০১৩ সালে মাহি অভিনীত ‘পোড়ামন’ ছবিটি ব্যাপক ব্যবসা সফল হয়। ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখার এক বছরের মধ্যেই সুপারহিট ছবি উপহার দেওয়া মাহির ভাগ্যকেই একধাপ এগিয়ে দেয়। ‘পোড়ামন’ ছবিতে মাহির স্নিগ্ধতা, সাবলীল অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত- মাহি মানেই সিনেমা হিট। যেকোনো নায়কের বিপরীতেই মাহির সাবলীল অভিনয় হৃদয় ছুঁয়ে যায় দর্শকের। ‘ভালোবাসার রঙ, ‘অন্যরকম ভালোবাসা’, ‘পোড়ামন’, ‘ভালোবাসা আজকাল’, ‘তবুও ভালোবাসি’, ‘অগ্নি’, ‘অনেক সাধের ময়না’  প্রত্যেকটি ছবিই কমবেশি হিট। কোনোটা হয়তো কম কোনোটা হয়তো বেশি।

মাহি বলেন, ‘অভিনয়ের স্বপ্ন ছিল কিন্তু সেটা নাটক বা মডেলিংয়ের কিন্তু এত রাতারাতি সিনেমার নায়িকা হয়ে যাব তা ভাবিনি। তবে সবার যেরকম প্রশংসা পেয়েছি, এখনো পাচ্ছি তাতে আমি লাকি।’

জাজের সঙ্গে ভালোভাবেই চলছিল সবকিছু। কিন্তু ২০১৫ সালে এসে ছন্দপতন ঘটে মাহির জীবনে। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মাহির সঙ্গে টানাপোড়েন শুরু হয় জাজ মাল্টিমিডিয়ার। সেই টানাপোড়েন চলে বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। ফলে ২০১৫ সালের মে মাসে এসে জাজ ছাড়তে হয় মাহিকে। জাজ মাল্টিমিডিয়া ছাড়ার পর মাহি দীর্ঘদিন আর কাজে ফেরেননি। জাজ ছাড়ার এক বছর পর মাহি শুরু করেন জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস। ২০১৬ সালের ২৪ মে সিলেটের ব্যবসায়ী মাহমুদ পারভেজ অপুকে বিয়ে করেন মাহি। জাজের সঙ্গে বিচ্ছেদ ভুলে ২০১৬ সাল থেকে আবারও জীবনের ছন্দ ফেরানোর চেষ্টা করেন মাহি। তবে সেই ছন্দেও কখনো কখনো ঢুকে যায় কালো মেঘ। সমস্ত বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে ২০১৬ সাল থেকে আবারও ছন্দে ফেরার চেষ্টা করেন মাহি। সেই বছর মুক্তি পায় ‘কৃষ্ণপক্ষ’। পরের বছর মুক্তি পায় ‘ঢাকা অ্যাটাক’। ঢাকা অ্যাটাক ছবিটি মাহিকে আবারও আলোচনায় আনে। যদিও ছবিটিতে মাহি নিজের উপস্থিতি নিয়ে ততটা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। 

মাহির ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা বৃথা যায়নি। ২০১৮ সালে এসে মাহি আবারও তার পুরোনো ছন্দে ফিরে যান। জাজ বা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই মাহি ঘুরে দাঁড়ান এই বছর। এ বছর মুক্তি পায় মাহির উল্লেখসংখ্যক ছবি।  তার মুক্তি প্রাপ্ত পাঁচটি ছবিই কমবেশি ব্যবসা করে। সবচেয়ে বড় কথা মাহি ভক্তরা আবারও তাদের প্রিয় নায়িকার ওপর ভরসা করতে শুরু করে। ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলোর মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান মানিক পরিচালিত ‘জান্নাত’ ছবির জন্য প্রশংসিত হন মাহি। এই ছবিতে গতানুগতিকতার বাইরে দাঁড়িয়ে ন্যাচারাল অভিনয় করার চেষ্টা করেন মাহি। মাহি নিজেও এই ছবিটিকে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ছবি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

২০১৯ সালে এসে মাহি আরও দৃঢ় মনোবল নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যেনতেন ছবিতে আর অভিনয় করবেন না। এ কারণে বছরের প্রথম কয়েক মাস অভিনয় থেকেও দূরে ছিলেন। এদিকে এ বছর থেকেই মাহি সিনেমার বাইরে ওয়েবের বিশাল দুনিয়াতেও পা রেখেছেন। মিউজিক্যাল ফিল্মে কাজ করছেন তিনি। মাহি বলেন, ‘নিজের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। চেষ্টা করছি সামনে যেন আর কোনো ভুল না করি।’

সবশেষ মাহি অভিনীত ‘অবতার’ ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে দর্শকেরা দেখেছেন। সম্প্রতি রায়হান রাফির স্বপ্নবাজি সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন মাহি। আগামী ডিসেম্বর মাসে সিনেমাটির শুটিং শুরু হবে।

২০১২ সালের একেবারে আনকোরা মাহি সময়ের বিবর্তনে হয়ে উঠছেন অভিজ্ঞ।  ইতিমধ্যেই গুণীজনরা বলা শুরু করেছেন শাবনূর-মৌসুমীর পর মাহি আরেকটা আইকন।