মানবপাচারের অভিযোগে এক শিশুর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয় গত বছরের ৩০ অক্টোবর। এ মামলার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। অথচ বাদী মামলার নথিপত্রে তার বয়স দেখিয়েছেন ২২ বছর।
দুটি ঘটনার (২০১৪ সালের জুনে একটি ও ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে একটি) প্রেক্ষিতে দায়ের মামলার প্রথম ঘটনার সময় তার বয়স ছিল সাত বছরেরও কিছু কম।
চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে গত বছরের ১৮ নভেম্বর গ্রেপ্তারি পরোয়ানার জারি হয় ওই শিশুর বিরুদ্ধে। সে থেকে পিতৃহারা দরিদ্র এ শিশুর জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ।
অবশেষে তার দুর্বিষহ জীবনে সোমবার কিছুটা স্বস্তি এসেছে। মানবপাচারের মামলায় তাকে আট সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়েছে হাইকোর্ট।
আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট তাকে এ জামিন দেয়।
আদালত এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছে, ‘যে এখনো পরিপূর্ণ মানবই হয়ে ওঠেনি, সে কীভাবে মানবপাচারের মতো অপরাধ করে, এটি অবিশ্বাস্য ও অমানবিক।’
আদালতে শিশুর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী জামান আকতার বুলবুল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী।
সোমবার হাইকোর্টে উপস্থাপন করা ইপিআই টিকাদান কার্ড অনুযায়ী তার জন্ম ২০০৭ সালের ১০ আগস্ট। স্থানীয় একটি কওমি মাদ্রাসায় ইয়াজদহম শ্রেণিতে পড়ছে। সাত বছর আগে তার বাবা মারা যান। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত হিসেবে থাকেন।
তিনি জানান, মামলার বাদীর দাবি অনুযায়ী টাকা না দেওয়ায় যে বাড়িটিতে তিনি থাকতেন তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে দখল করে নিয়েছে মামলাবাজ লোকেরা।
আইনজীবী জামান আকতার বুলবুল দেশ রূপান্তরকে জানান, কক্সবাজারে মানবপাচার ও মাদকদ্রব্য, ‘ইয়াবা পাচারের ঘটনা যেমন বেড়েছে, তেমনি অর্থ হাতিয়ে নিতে এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগের মামলায় কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষকে জড়াচ্ছে একটি চক্র। এমন বেশ কিছু মামলার নথিপত্র তাদের কাছে এসেছে। যাতে তাদের কাছে মনে হয়েছে, যাদের অনেকেই ঘটনা বা মামলা সম্পর্কে কিছুই অবগত নন। বাদীকে কেউ চেনেন না। আর যাদের আসামি করা হচ্ছে তাদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে এ চক্রটি।
এ মামলাও সেই চক্রের কারসাজি বল তিনি মনে করছেন।
তিনি জানান, এ মামলায় ওই শিশুসহ মোট ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। এদের প্রায় সবার কাছে মামলা তুলে নেওয়ার শর্তে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে।
এ আইনজীবী আরো বলেন, ‘২০১৪ সালের ২০ জুন এবং গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর দুটি ঘটনায় মানবপাচার আইনে দায়ের করা মামলায় এ শিশুকে আসামি করা হয়। প্রথম ঘটনার সময় তার বয়স ছিল সাত বছরের কিছু কম। আর দ্বিতীয়টির সময় ছিল ১১ বছর। অথচ আদালতে মামলা করার সময় নথিতে তার বয়স দেখানো হয়েছে ২২ বছর’।
তিনি বলেন, ‘নিতান্তই একজন শিশু যে কি না এখনো বুঝতে শেখেনি তাকে কীভাবে মানবপাচারের মামলায় আসামি করা হয়েছে এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট।’
আইনজীবী জানান, মামলার সময় শিশুটি আদালতে ছিল না। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর পুলিশ যখন তাকে গ্রেপ্তার করতে যায় তখন পুলিশও তার বয়স দেখে বিস্মিত হয় এবং গ্রেপ্তার করতে ইতস্তত বোধ করে।
মা জানান, আইনগত বাধ্যবাধকতার পরও শিশু বিবেচনায় তারা উদারতা দেখায়। এমনকি তারা খাবারের টাকাও দেয়। পুলিশের মনেও তখন প্রশ্ন জাগে এ শিশু কোনোভাবে এ ধরনের অপরাধে জড়িত নয়।
গত বছরের ৩০ অক্টোবর রামুর হাজিপাড়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে এ মামলা দায়ের করেন।
অভিযোগে বলা হয়, মালয়েশিয়া কাজ দেওয়ার কথা বলে ২০১৪ সালের জুনে বাদীসহ অন্যান্য ভিকটিমদের কক্সবাজারের লামুনীরচর থেকে একটি জাহাজে তুলে দিলে কয়েক দিন পর থাইল্যান্ডের উপকূলে পাহাড়ের মধ্যে জঙ্গলে তাদের জাহাজ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাদের মারধর করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই শিশুসহ মামলার আরো দুজন আসামি তাদের স্বজনদের ফোন করে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়েছে।