ভারতের মাটিতে প্রথমবারের মতো পুরো সিরিজ খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর আগে প্রতিবেশীদের মাঠে একটি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা আছে সাকিব-মুশফিকদের। কিন্তু নানা কারণে এই সফর আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিরিজ তো আছেই সঙ্গে সাম্প্রতিক আন্দোলন শেষে সিরিজটিতে ক্রিকেটাররা কেমন করেন সেটাও দেখার বিষয়। এসব নিয়েই বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচক হাবিবুল বাশার কথা বলেছেন ভারতীয় দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর সঙ্গে। সেই সাক্ষাৎকার দেশ রূপান্তর পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো–
এটা ভারতে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সফর এবং এই দুই টেস্ট বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশও। সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান নির্বাচক হিসেবে সিরিজটিকে কীভাবে দেখছেন?
বাশার : অবশ্যই যে কোনো সিরিজ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই সিরিজ একটু আলাদা। ২০০০ সালে টেস্ট খেলা শুরু করলেও ১৯ বছর পর আমরা ভারতের মাটিতে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে যাচ্ছি। দুই বছর আগে হায়দরাবাদে একটি টেস্ট খেলেছিলাম। কিন্তু এবার পুরো সিরিজ, যা বাংলাদেশের জন্য সিরিজটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ করে দিচ্ছে। আমরা সত্যিই রোমাঞ্চিত, ইডেন গার্ডেনসে টেস্ট খেলার উত্তেজনা আমাদের রোমাঞ্চকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। লর্ডসে টেস্ট খেলা যেমন গর্ব ও সম্মানের তেমনি ইডেনেও সেই অনুভূতিটা আসে। আমরা খেলতে পারিনি কিন্তু বর্তমান ক্রিকেটারদের সামনে এই সুযোগ এসেছে। তাছাড়া এই সিরিজ দিয়ে আমাদের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ অভিযানও শুরু হবে। সব মিলিয়ে অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ।
বাংলাদেশি সমর্থকরা কেমন উচ্ছ্বসিত? গত মাসে ফুটবল বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচে সল্ট লেক স্টেডিয়ামে দু’দলের লড়াইটা কিন্তু জম্পেশ ছিল। সে ম্যাচে পুরো ৬০ হাজার দর্শক উপস্থিত হয়েছিলেন। ইডেনেও কি তেমনটা আশা করেন?
বাশার : সমর্থকরা সত্যিই রোমাঞ্চিত। আমি নিশ্চিত বাংলাদেশ থেকে অনেক সমর্থক কলকাতা টেস্ট দেখতে যাবেন। বিশেষ করে যশোর ও খুলনার অনেকেই ইডেনে যেতে পারেন। কারণ ঢাকার চেয়েও এই দুটি জায়গা থেকে কলকাতা আসা কম সময়ের ব্যাপার। এছাড়া কলকাতার সঙ্গে বাংলাদেশের এই দুটি জায়গার আলাদা সম্পর্ক আছে। কারণ কলকাতার অনেকের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশে ছিল। বাংলাদেশের অনেকেই কলকাতাকে সেকেন্ড হোম মনে করেন। কলকাতারও অনেকে এমনটাই মনে করেন। আমার অনেক বন্ধুই ইডেন টেস্ট দেখার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। যদি এই টেস্টে ৬ হাজারের মতো বাংলাদেশি সমর্থক চলে আসেন তবে আমি অবাক হব না।
ইডেন টেস্ট গোলাপি বলে হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদিও এখনো তা নিশ্চিত হয়নি। ভারতের আমন্ত্রনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কি সাড়া দেবে?
বাশার : আমরা গোলাপি বলে দিন-রাতের টেস্ট খুব একটা খেলিনি কিন্তু আমি নিশ্চিত বিসিবি ভারতের ডাকে সাড়া দেবে। এটা কোনো সমস্যা না।
শোনা যাচ্ছে ইডেন টেস্টে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকতে পারেন। ভারত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারতের ডে নাইট টেস্ট এই সিরিজের ওজন অনেক বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করেন?
বাশার : ওনারা থাকলে অবশ্যই ভালো হবে। তবে এখনো কিছু নিশ্চিত হয়নি। অবশ্য এটা নিশ্চিত যে নতুন নির্বাচিত ক্রিকেট বোর্ড প্রেসিডেন্ট সৌরভ এই টেস্টকে আলাদা মর্যাদায় নিয়ে যাবেন। আমি শুধু এটাই আশা করব যেন আমরা ভালো খেলি।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ধারাবাহিকতা রাখতে পারেনি, পরে শ্রীলঙ্কা সিরিজে এবং ঘরের মাঠে অফগানিস্তানের বিপক্ষে বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছে। অন্যদিকে ভারত উইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে টেস্টে এক নম্বর দল হয়ে আছে। এই মুহূর্তে দেশে ক্রিকেটারদের আন্দোলনের পর এবং সাকিবের কোড অব কন্ডাক্ট ভাঙার ঘটনার পরও এই সিরিজের জন্য বাংলাদেশ কতটুকু প্রস্তুত বলে মনে করেন?
বাশার : দেখুন ক্রিকেটারদের আন্দোলন খুব বেশি দিন ছিল না। বিসিবি পেশাদারিত্বের সঙ্গে দুই দিনেই ব্যাপারটা মীমাংসা করে ফেলেছেন। তবে আমরা ওই সময়ে কোনো অনুশীলন বা ম্যাচ খেলতে পারিনি। আর সাকিবের ব্যাপারে বলব এটা দলের ওপর প্রভাব ফেলছে না। মাঝেমাঝে এমন বিষয় সামনে চলে আসে যা দলকে সমস্যায় ফেলবে না বলেই মনে করি। তবে আমরা তামিমকে মিস করব। অনেকদিন ধরেই সে আমাদের সেরা ব্যাটসম্যান। আর এটা ঠিক এই মুহyর্তে ঘরের মাঠে ভারত অসম্ভব শক্তিশালী। তাই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ তাদের মাঠে শুরু করা আমাদের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। আমরা জানি আমাদের জন্য কঠিন সিরিজ অপেক্ষা করছে। তবে এটাও ঠিক যে এই সিরিজে ভালো করলে বাংলাদেশ ক্রিকেট অনেক এগিয়ে যাবে। ব্যাটিং-বোলিং সব দিক থেকেই ভারত এগিয়ে। এই সিরিজে আমাদের সেরাটাই দিতে হবে।
কিন্তু বিসিবির সঙ্গে সাকিবের মুখোমুখি হয়ে যাওয়াটা কি দলের পরিবেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না?
বাশার : না, আমি মনে করি না। কারণ ক্রিকেটাররা এখন খুব খুশি। কারণ তারা যা চেয়েছিল সবই পেয়েছে। সাকিবের সঙ্গে বিসিবির যে ঝামেলাটা হচ্ছে তা একটি চুক্তির বিষয় নিয়ে। এখানে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। তাই দলে কোনো প্রভাব পড়বে না।
আপনারা কি দল ঠিক করে ফেলেছেন?
বাশার : একটা প্রাথমিক দল ঠিক করেছি। আমাদের বর্তমান প্রথম শ্রেণির ম্যাচের পর দল ঠিক করব।
বাংলাদেশ খুব ভালো ব্যাটিং সাইড। দলে অনেক ভালো মানের স্পিনারও আছে। কিন্তু আপনার কি মনে হয় না আরও এগিয়ে যেতে হলে ভালো মানের পেসারও দরকার?
বাশার : হ্যাঁ, পেস বোলিংয়ে আমাদের উন্নতির জায়গা আছে, এদিকটায় আমরা বিপদে আছি। আমাদের আক্ষরিক পেসার নেই। তবে আমি আশাবাদী যে তাসকিন সময়মতো ফিট হয়ে উঠবে। সে এখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ম্যাচ ফিটনেস আনার চেষ্টা করছে। সে ফিট হয়ে গেলে আমাদের জন্য খুব ভালো। আমরা আল-আমিন হোসেনকেও ফিরিয়ে এনেছি, এখন দেখা যাক। আমাদের জাসপ্রিত বুমরাহ বা মোহাম্মদ শামির মতো পেসার নেই কিন্তু যারা আছে তাদের নিয়েই আমরা সাফল্য পেয়েছি। ভবিষ্যতে আমরা আরও পেসার পাব। একসময় ভারতেরও এই সমস্যা ছিল। কিন্তু তারা উন্নতি করেছে। আমরাও পারব।
বাংলাদেশ দলের অনেক সিনিয়র ব্যাটসম্যান ৬০-৭০ রানের ইনিংস পেয়েও তা সেঞ্চুরিতে রূপ দিতে পারে না। তাদের জন্য আপনার কী বার্তা থাকবে?
বাশার : হ্যাঁ, আমি এটার সঙ্গে একমত। কিন্তু এটাও ঠিক যে টেস্টে সব ম্যাচেই ক্রিকেটাররা সেঞ্চুরি করতে পারে না। তবে ভারতের সঙ্গে ভালো করতে চাইলে ব্যাটসম্যানদের প্রতি আমার মেসেজ থাকবে যে যারাই পঞ্চাশের ওপরে উঠবে তারা যেন দেখে খেলে এবং বড় ইনিংস খেলে।